আলহাজ্ব মুফতি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ

অনলাইন একটিভিস্ট।

চৈতি, মুনিয়া এবং ধনীদের আল্লাহপাক

চৈতি চন্দ্রিকা মারা গেছে অনেকদিন হয়েছে। তাঁকে নিয়ে সাংবাদিকদের কাগজে দু’কলম লেখার জায়গা ছিলো না। চৈতির ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা জানিয়েছে, চৈতি বাঁচতে চেয়েছিলো। আসলে সবাই বাঁচতে চায়। এমনকি ধর্ষণের শিকার হয়ে অপমান থেকে বাঁচতে যে মেয়েরা আত্মহত্যা করে তাঁরাও বাঁচতে চেয়েছে। যে মাদ্রাসার ছাত্রটি রাতের পর রাত তার শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষিত হয়, দিনের পর দিন শিক্ষক কর্তৃক পিটুনির শিকার হয়ে অবশেষে নিজেকে শেষ করে দেয়- অর্থাৎ নিজেকে জিহাদি বানিয়ে ফেলে- সেও বাঁচতে চেয়েছিলো। সে জিহাদি হতে চায়নি। সে চেয়েছিলো মানুষ হতে, কিন্তু সমাজপতিরা মানুষ চায় না। তাঁরা মানুষের বদলে ‘হুজুর’ চায়। নালিতাবাড়ির নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া জোনাকি আক্তার (১৫) আত্মহত্যা করে তার মা-বাবাকে শোকাভিভূত করতে চায়নি, কিন্তু সে এটা করেছে। মরে গিয়ে কি জোনাকি আক্তার বেঁচে গেছে? অনেক সাংবাদিক তো তাইই বলে। একবার ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর সমাজ কর্তৃক কথার ধর্ষণের শিকার বারবার হওয়ার চাইতে নিজেকে মেরে ফেলাকেই জোনাকি যথাযুক্ত মনে করেছে। যদিও এটি ভুল সিদ্ধান্ত, কিন্তু এমন ভুল সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা এবং মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলেরা বারবারই নিচ্ছে। স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা আত্মহত্যা করছে আর মাদ্রাসার ছাত্ররা ‘নারীবিদ্বেষী জিহাদি’ হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণের শিকার মেয়েটি হত্যা করছে নিজের দেহকে আর (মাদ্রাসায়) ধর্ষণের শিকার ছেলে হত্যা করছে তাঁর মানবিক বোধকে। 

মাদ্রাসার ছাত্রটি যাকে সমাজের ভদ্রলোকেদের বেহেশতে পাঠানো আর তাদের চরিত্রের সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য ‘নির্মাণ’ করা হয়েছে সেও চায়নি তার মানবতার বোধকে খুন করে জিহাদি হতে, কিন্তু সে হয়েছে। কারণ, এটিই তার কাছে সমাজের সবার চাহিদা। আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিপ্রবণ দেশে একটি মেয়ে যখন ধর্ষণের শিকার হয় তখন সেটি কেবল একটি ধর্ষণ না, সেটি হাজারবার ধর্ষণের দুয়ার কেবলমাত্র। অর্থাৎ, একজন বা একাধিক পুরুষ ধর্ষণের মাধ্যমে কেবল ধর্ষণের বিসমিল্লাহ করে, এরপর সমাজের পাঁচ ওয়াক্তের মুসুল্লি এবং শুক্রবারের জুম্মার নামাজের মুসুল্লি কর্তৃক মেয়েটি ‘কথার ধর্ষণের’ শিকার হয় বারবার। শরীরের ধর্ষণ শরীরকে ক্ষত করে আর কথার ধর্ষণ ক্ষতবিক্ষত করে মনকে। আমাদের সাংবাদিকেরা কোনো ধর্ষণ নিয়ে কখনোবা নিউজ করেন, কখনোবা নিশ্চুপ থাকেন। নিউজ করা বা নিশ্চুপ থাকাটা অনেক ক্ষেত্রেই টাকা, টিআরপি এবং দলাদলির উপর নির্ভর করে।   

চৈতি, যে বাঁচতে চেয়েছিলো কোনো এক বা একাধিক ঘাতকের হাত থেকে, সে মরে গেছে। সাংবাদিকেরা জানে, যারা অনলাইনে হইচই করবে তাঁরাও দুদিন পর থেমে যাবে। ইস্যুপ্রবণ আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ইস্যু তৈরি হয়, পুরনো ইস্যু তখন টিস্যুর তলে চাপা পড়ে যায়। বিশিষ্ট নাগরিক মারা গেলে সংবাদপত্রে নিউজ হয়, শোকগাঁথা ছাপা হয়, অন্য বিশিষ্টজনেদের তাঁকে নিয়ে করা মন্তব্য তুলে ধরা হয়। কিন্তু দেশের মধ্যে হাজারো মানুষ যারা প্রাণের ভয়ে ছদ্মনামে লেখেন, খুব ভালো লেখেন এরপর কোনো কারণে মারা যান তাঁকে নিয়ে লেখা হয় না। একজন মানুষ, একজন নাগরিক কেনো লুকিয়ে লুকিয়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লিখলেন, কেনো জীবদ্দশায় তার নামটি জানা গেলো না তা নিয়ে ওনাদের হেলদোল নেই। কেনো সন্ত্রাস ও জিহাদের বিরুদ্ধে লিখলে ব্যক্তির জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়, কেনো ব্যক্তিকে হয় জঙ্গির হাতে খুন নয়তো পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতে হয় সে প্রশ্ন ওঠে না। সবারই মরার ভয় আছে, হুর-গেলমানের লোভ আছে, আর আছে মোল্লাদের ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়ার। 

সাংবাদিকেরা এই সমাজেরই অংশ, এখানকার আলোবাতাসেই তাঁরা বেড়ে উঠেছেন। সুতরাং যে অনুভূতি এদেশের পাঁচ ওয়াক্তের মুসুল্লির সে অনুভূতি সাংবাদিকেরও। আর তাই, তুরস্ক বা জার্মানি থেকে বিয়ের টানে কোনো নারী বাংলাদেশে এলে সেটি আমাদের সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়, কিন্তু আরেকটি বাঁচতে চাওয়া মেয়ের রহস্যজনক মৃত্যু হলে তাতে সংবাদপত্রের তেমন যায় আসে না। ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকার এক কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। মৃত্যুর আগে মুনিয়া তাঁর বোন তানিয়াকে বলেছে “আমাকে বাঁচাও আপু!’’। তার সেই বাঁচতে চাওয়ার আকুতি ভাইরাল হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় হইচই হয়, কিন্তু তাতে কি, সাংবাদিকেরা যে দমে গেছে!  আমাদের দেশের পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়, মামলা নিতে এবং তদন্ত করতে টাকা চায় এবং টাকা খেয়েও কাজ করে না সেটি তো আমরা জানি। কিন্তু সাংবাদিকও কি এমন অনেক বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকেন না যা নিয়ে উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া? সাংবাদিকেরও কি অনেক নিউজ করা বা না করাটা ‘বন্ধুত্বের খাতিরে’ বা ‘পয়সার জোরে’ কিংবা ‘চাপে পড়ে’ প্রভাবিত হয় না? এখন তো আবার খোলামেলাই ধন্যবাদ দেয়াদেয়ি হয়- নিউজ করেছেন বলে সাংবাদিককে ট্যাগ করেই খুশিতে ডগমগ ব্যক্তি পোস্ট করেন। এর একটি ভালো দিকও আছে - আমরা জানতে পারি কোন সাংবাদিকের সাথে কার কেমন গভীর দোস্তি আছে! 

মুসুল্লিপাড়ায় যেমন হুজুগ আছে তেমনি সাংবাদিকপাড়ায়ও হুজুগ আছে বলে আমি অনুমান করছি। মুসুল্লিপাড়ায় যদি রটে যায় অমুক লোক তাঁর পীর বা ধর্মবই নিয়ে কুকথা বলেছে তাহলে আর রক্ষে নেই- যাচাই বাছাই ছাড়াই হাজার হাজার পঙ্গপাল, থুক্কু মুসুল্লির পাল রাস্তায় নামে। ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই বলে চেঁচাতে থাকে ওরা। কে কুকথা বলেছে, কি ধরণের কুকথা বলেছে, আদৌ সেটি কুকথা কিনা কিংবা সেই কুকথা আসলে মুসুল্লির ধর্মবইতেই লেখা আছে কিনা তা ভাবার টাইম কই মুসুল্লির? সাংবাদিকদের মধ্যে যখন সংবাদ-হুজুগ শুরু হয় তখনও এমন ঘটনার দেখা মেলে। আগুনে দগ্ধ হয়ে মানুষ মরেছে তাতে কি, সাংবাদিকের সাধের ধর্মবই তো অক্ষত আছে! এক সাংবাদিক এমন ধর্মবই অক্ষত থাকার হুজুগ বা গুজব তুললেই চলে, অধিকাংশই এরপর তাঁর অনুগামী হয়। ধর্মবই অক্ষত অবস্থায় থাকার রিপোর্ট লেখা সাংবাদিক তাঁর নিজের হাতে দেয়াশলাই নিয়ে পরখ করেও দেখে না যে, তাঁর ধর্মবইয়ে আগুন ধরালে তাতে আগুন লাগে কিনা। আসলে সত্যটা সাংবাদিক জানে। ধর্মবইয়ে আগুন দিলে যে সেটি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে তাও সাংবাদিক জানে। 

একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখেছিলাম এক ব্যক্তি অধ্যাপক জাফর ইকবালের একটি কটুক্তির সূত্র ধরে তাঁকে কুলাঙ্গার বলে ফাঁসি চেয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিচ্ছে। সাংবাদিক যখন জিজ্ঞেস করলেন, অধ্যাপক জাফর ইকবাল কি বলেছেন কটুক্তিটা? তখনও সে জ্বালাময়ী স্টাইলে “উনি আমার নেতাকে” বলেই আমতা আমতা করে “আসলে বিষয় জানি না” বলে থেমে গেল!‌ যার ফাঁসি চাইছে, তার ফাঁসি কেনো চাইছে তাও বলতে পারে না হুজুগে বাঙ্গালি। হুজুগ এমনই- ওটা কেবল কেউ প্রচার করে, কেউ বিশ্বাস করে আর কেউবা হুজুগ দিয়েই রাজনীতি করে। হুজুরের সাথে আবার হুজুগের দারুণ মিল। আমি হুজুগ এবং হুজুরকে একটি পাখির দুটি ডানা মনে করি। পাখিটি হচ্ছে মডারেট মুসলিম, আর দুটি ডানা হচ্ছে হুজুর এবং হুজুগ। পাখির (মডারেট মুসলিমের) যখন ইচ্ছে হয় একটি ডানা দিয়ে অন্য ডানাটি চুলকে দেয়। 

কত মানুষ অকালে ঝরে যায়, কত আবেগের মৃত্যু হয়, কত মেধার অপচয় হয়! কিন্তু কে রাখে এর খবর? যখনই কিছু ঘটে তখনই ক্ষমতাবানেরা চায় জাতি ঐ ঘটা বা ঘটিতব্য বিষয় নিয়ে পড়ে থাকুক। এর মধ্যে হয়তো কেউ খুন হয়েছে, হয়তো কেউ আত্মহত্যা করেছে, হয়তো দেশে দশটা স্কুল বন্ধ হয়ে শিশু নির্যাতন কেন্দ্র (মাদ্রাসা) হয়েছে। একজন মানুষ অকালে কেনো মরলেন, বা কেন মৃত্যুকে বেছে নিলেন তা নিয়ে পত্রিকায় লেখা হতে পারতো। মানুষটির ভেতরে কি ধরণের হাহাকার ছিলো তা আমরা জানতে পারতাম। আর একটি প্রাণও যেন অকালে ঝরে না যায় সেজন্য কি করণীয় তা আমরা ভাবতে পারতাম। কিন্তু তা হয় কই? অক্ষয় কুমার কত টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনলেন, উরফি জাভেদ কি পোশাক পরে ‘উত্তাপ ছড়ালেন’ তাই নিয়েই তো উত্তাল নেটপাড়া। সাংবাদিকও উত্তাল এসব নিয়ে। অথচ অনেক বেশি জরুরি ছিলো এটি জানা যে, কেনো চৈতির মৃত্যু হলো। কেনো মুনিয়াকে হত্যা বা তাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার বিচার হলো না। অনেক বেশি জরুরি ছিলো এটি জানা যে, কেনো কবি সৌরভ মাহমুদ মরতে বাধ্য হলেন। অনেক বেশি জরুরি ছিলো এটি জানা যে, কেনো মামুন আবদুল্লাহ অকালে মারা গেলেন। 

অনেকগুলি মসজিদ-মাদ্রাসার নির্মাণকারী তথা গরিব শিশুদের মাদ্রাসার জেলখানায় বন্দি করা শিল্পপতি বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর নাকি ১১ হাজার এতিমকে খাইয়েছে। আহা কি মহানুভবতা! এটা নিয়ে ঢাকা টাইমস নামের একটি পত্রিকায় নিউজ করা হয়েছে, আনভীরের মহানুভবতা তুলে ধরা হয়েছে। পত্রিকাটিতে এতিম হিসেবে মাদ্রাসার শিশুদের দেখানো হয়েছে। এতিম হিসেবে তাদেরই দেখানো হয়েছে যাদের মধ্য হতে তৈরি হবে আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ, মুফতি ইব্রাহিম, মামুনুল হক ও মুফতি হান্নানের মতো হুজুররা। অথচ ঐ এতিমদের অধিকার ছিলো আনভীরের ছেলেমেয়েদের সাথে স্কুল ও কলেজে পড়ার। ঐ এতিম শিশুদেরও অধিকার ছিলো আনভীরের ছেলেমেয়েদের মতোই হুজুর না হয়ে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার। নিজের সন্তানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে অন্যের শিশুদের জন্য মাদ্রাসা নির্মাণ করে সেই শিশুদের একবেলা বিরিয়ানি খাইয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন মুনিয়ার খুনি আনভীর। কে প্রতিবাদ করবে এই অবিচারের? কে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে নতুন মুনিয়াদের এবং নতুন মাদ্রাসার ছাত্রদের? 

যে ব্যক্তিটি ১১ হাজার এতিমকে খাইয়েছে তার বিরুদ্ধে খুন ও ধর্ষণের অভিযোগ আছে, তার এবং তার বাপের বিরুদ্ধে ভুমিদস্যুতা ও ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ আছে। কিন্তু তার সঙ্গে আবার ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহরও বেশ খায়খাতির আছে। অবশ্য ইসলামের আল্লাহর সাথে পয়সাওয়ালা লোকগুলোর খায়খাতির একটু বেশিই থাকে। বাংলাদেশের সরকারি অফিসারবা যেমন গরিবকে পোছে না ইসলামের আল্লাহও তেমনই গরিবকে পোছে না। আর তাই, ইসলামের আল্লাহর গরিব বান্দারা অপরাধ করলে জেলখানায় যায় আর ধনী বান্দারা অপরাধ করলে ওমরাহ করতে যায়। খুন-ধর্ষণ থেকে টাকার জোরে অব্যাহতি পাওয়ার পর টাকাওয়ালা আনভীর আল্লাহর দেশে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। আল্লাহকে কিছুটা ঘুষটুষও দিয়েছেন। সৌদি আরবের আল্লাহ হয়তো জনপ্রিয়তা অর্জন করার জন্য আল্লাহর সেলস এজেন্ট মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের একবেলা বিরিয়ানি খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছে আনভীরকে। 

ইসলামের আল্লাহকে ‘আকবর আল্লাহ’ তথা বড় আল্লাহ বলা হয়। তা বটে, নইলে দুনিয়া জুড়ে ইসলামের আল্লাহর নামে আকবর বলে চিল্লানি দিলেই সবাই কেনো ভয় পায়? আপনি প্লেনে, বাসে, ট্রেনে যেখানেই থাকুন না কেনো ইসলামের আল্লাহর নামে একটু ‘আকবর’ যোগ করে একটা চিৎকার দিন, দেখবেন মুহুর্তের মধ্যে স্থান খালি! আমি একবার লোকাল ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছিলাম। আমার সাথে ছিলেন এক বন্ধু। ট্রেনে প্রচন্ড ভিড়। বন্ধু আমাকে বললেন, ট্রেনটা ফাঁকা করা যায় কিভাবে বলুন তো? আমি বললাম, বেশি কিছু না, শুধু একবার আল্লাহু আকবর বলে চিৎকার করতে হবে। মুহূর্তেই ট্রেন ফাঁকা তো হবেই, এমনকি যাত্রীরা কাপড়-চোপড়, ব্যাগ মোবাইল রেখেই পড়িমড়ি ছুট দেবে। 

উত্তর কোরিয়ার কারাগারে ১৫ মাস বন্দি ছিলেন আমেরিকার ২২ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অটো ওয়ার্মবিয়ার। এই বন্দিকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৫ মাস ধরে তাকে খাওয়া-পরা দিয়েছে উত্তর কোরিয়ার সরকার। আহা, কিম জং উন কত মহৎপ্রাণ একজন মানুষ! ১৫ মাস ধরে এতিম অটো ওয়ার্মবিয়ারকে তিনি খাইয়েছেন! যদিও মহৎপ্রাণ কিম জং উন স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে অটো ওয়ার্মবিয়ারকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন ঠিক যেমনিভাবে ‘কোরান পয়জনিংয়ের’ মাধ্যমে আমাদের দেশের ধনীরা গরিবদের ছেলেদের মনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ভাগ্যবান অটো ওয়ার্মবিয়ার শারিরীকভাবে মরে গেছেন, কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের ‘চাইল্ড প্রিজন সেলে’ (মাদ্রাসায়) যারা বন্দি হয় তাঁরা বড় দুর্ভাগা। তাঁরা শারীরিকভাবে মরে না, মরে মানসিকভাবে। এই মানসিক হত্যাকাণ্ড শারীরিক হত্যাকাণ্ডের চেয়েও অনেক বেশি নির্মম। মাদ্রাসার বন্দিরা কারাগারে বন্দি থাকে এবং ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ওরা পুঁজিপতিদের জন্য কাজ করে। ওরা পুঁজিপতিদের জন্য ‘মুনিয়ার’ ব্যবস্থা করে দেয়। পুঁজিপতিরা মুনিয়াদের মেরে ফেললে মাদ্রাসার ঐ বন্দিরা মানুষের দৃষ্টি সেদিক থেকে ঘুরিয়ে দেয় ওয়াজের মধ্যে ইহুদি-নাসারার ষড়যন্ত্রের কথা বলার মাধ্যমে। এভাবেই পুঁজিপতিরা জেলখানা (মাদ্রাসা) সৃষ্টি করা ও জেলখানার শিশুদের মাঝেমাঝে বিরিয়ানি খাওয়ানোর ‘বহুত ফায়দা’ হাসিল করেন।

১১ হাজার শিশুকে বিনাদোষে হাজতে (মাদ্রাসায়) বন্দি রেখে তাদেরকে বছরে কয়েকবার বিরিয়ানি খাওয়ালে মানুষ ও মানবজাতির কি কি সেবা হয় বলুন? ১১ হাজার না, কেবল ১১ জন মাদ্রাসার কারাগারে বন্দি থাকা শিশুকে উদ্ধার করে স্কুলে পাঠানোটাই কি মানবিক কাজ ছিলো না? সেটা কি ওরা করে? বাংলাদেশের ৬৭ টি সাধারণ কারাগারে বন্দি আছে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ। তাদেরকেও তো খাওয়া-পরা দিচ্ছে সরকার। আসুন এইসব বন্দিদের সরকার খাওয়া-পরা দিচ্ছে বলে সরকারের মহানুভবতার কীর্তন করি - আহা কি মহৎপ্রাণ আমাদের মন্ত্রীপ্রধান!

কিম জং উনের সরকার সাধারণতঃ প্রাপ্তবয়স্কদের গ্রেপ্তার করে (হ্যা, শিশু নির্যাতনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে) কিন্তু বসুন্ধরার এমডি ও তার মতো বিত্তবানেরা? ওরা যে শিশুদের টার্গেট করে! ওরা যে শিশুদের জন্য মাদ্রাসা বানিয়ে সেখানে তাদের শৈশব ও কৈশোরকে খুন করে! কে করবে এই খুনের বিচার? ‘অন্তরে মেরে বিরিয়ানি দান’ করলে কী লাভ তাতে?

897 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।