অপর্ণা হাওলাদার

পোস্টডকটরাল ফেলো, ইউনিভারসিটি অফ রোড আইল্যান্ড, ইউএসএ।

নারী দিবসের ভাবনা: বয়োসন্ধি নিয়ে খোলামেলা কথা হোক

"যৌনতা" শব্দটা প্রথম কীভাবে দেখি/শুনি আজও স্পষ্টভাবে মনে আছে। বোধকরি ক্লাস ফোরের প্রথমদিকে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের পেছনে টিচার্স কলোনিতে থাকতাম। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো না কোনো ঝামেলা লেগে থাকতো প্রতিদিন। এর মধ্যেই একটা পলিটিক্যাল লিফলেট এসেছিলো মিছিল নিয়ে, যাতে লেখা ছিলো "মৌন মিছিল" হবে প্রতিবাদস্বরূপ। যে কোনো কাগজ দেখলেই পড়তে চাইতাম, সুতরাং এই কাগজ নিয়ে পড়তে গিয়ে ঘষাপাটা টাইপরাইটারের বানান ভুলে পড়ি "যৌন মিছিল"। বিশাল ধমক খেয়েছিলাম, তাই দিনক্ষণ মনে আছে। "মৌন" কে "যৌন" বলায় কি অপরাধ না বুঝতে পারলেও বুঝলাম যে, শব্দটা "খারাপ"। 

এই লেখাটা কিছুটা ব্রেইনস্ট্রর্মিং এর মতো। একটা খুবই কনজার্ভেটিভ সোসাইটিতে এভারেজের চেয়ে বেশি কনজার্ভেটিভ ফ্যামিলিতে বড় হওয়ার কারণে যৌনতাবোধের সাথে পরিচয় পিউবার্টির সাথে পরিচয়ের মতোই অপরিষ্কার ছিলো। এই অজ্ঞানতা সময় সুযোগে অস্বাভাবিক প্রবণতার জন্ম দিতে পারে। আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখি কিছু আলোকপাত করা যায় কিনা। 

বয়ঃসন্ধি নিয়ে কালানুক্রমিক লেখা কঠিন। শরীর গঠনে পরিবর্তন খেয়াল করেছি অন্যের চোখ দিয়ে- নিজের চোখে নয়। অনুভূতিতে পরিবর্তন? হয়তো ছিলো। যে একটি জিনিস দিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম শরীরের গঠনের পরিবর্তন, তা হোলো পুরুষ চাহনি। সে কিছু পারিবারিক আত্মীয়, কিছু রাস্তায় যে কেউ। সময়ের সাথে সাথে বাসায় বাড়তেই থাকা প্রটেক্টিভ ন্যাচারের প্রভাব তো আছেই। বরিশালে মামা'র বাড়িতে তেমন প্রাইভেসির সুযোগ ছিলো না। প্রতিবেশী এক ছেলে, বয়সে আমার চেয়ে বছর দশেকের বড়, তারই চোখ প্রথম অস্বাভাবিক কুৎসিত লাগতো। তার যে ব্যবহারে সমস্যা আছে, একথা বোধকরি আমার মা জানতেন। তাদের বাড়ির আশেপাশেও আমার যাওয়া নিষেধ ছিলো। সেই কাহিনী শুরু আমি স্কুলে ভর্তি হওয়ারও আগে থেকে, সুতরাং ধরছি আমার পোশাক এবং শরীর তাকে উজ্জীবিত করেনি, সে উজ্জীবিতই ছিলো। সে আসলে আমার সাথেই বেশ ভালো ব্যবহার করতো, পাড়ার অন্য আমার বয়সী মেয়েদের তুলনায়। অন্য মেয়েরা তাকে দেখলে মাঠে থেকে ঘরে ঢুকে যেতো। সে এমনকি তার বড় বোনের সামনেই পাড়ার বাচ্চা মেয়েদের ইংগিত করতো (যেটাকে আজকে যৌন ইংগিত বলে আইডেন্টিফাই করতে পারি, তখন পারতাম না), তার বোনরা এসব এপ্রিসিয়েটও করতো। কিন্তু অন্তত আমার শরীরে সে কোনোদিন হাত দেয়নি। 

শরীরের হাতের কদর্যতা উপলব্ধি করলাম এক দূর সম্পর্কের কাকার আঙ্গুলে। তখন ক্লাস ফোর/ফাইভ। এমনকি আমি একা থাকা সময়েও সে বাসায় আসতো। মায়ের সামনেও সে তার সেই আঙ্গুল আমার কাঁধ থেকে বেয়ে বেয়ে সারা পিঠে ছড়াতো। আঙ্গুলটায় কিছু ছিলো, তার নাম আমি জানতাম না, কিন্তু প্রথম থেকেই ঘৃণায় কুকরে থাকতাম। ঠিক করে কেনো তাকে পছন্দ করি না, বলতে পারিনি। লোকটা এসেছে বাসায়, আমাকেও জোর করে সামনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। 

প্রথম অস্বাভাবিক যে ঘটনা আজকেও অবিকল মনে আছে, সেটা হোলো সদরঘাটে। ক্লাস ফোরের পূজার ছুটির পর বরিশাল থেকে ঢাকায় আসছিলাম, সকালবেলা ঘাট থেকে আসার সময়। পেছনে থেকে কেউ বলে ওঠে, "বুকটা খালি কেনো? গামছা দিমু নাকি?"। আমি স্কার্ট, টপস, কোটি পরা ছিলাম। 

যৌন সহিংসতার সাথে আমাদের সমাজে মেয়েশিশুদের সবারই পরিচয় আছে, আমি কেবল কিছুটা বোঝার চেষ্টা করছি কবে আইডেন্টিফাই করা শুরু করলাম আমার শরীরে পরিবর্তন আসছে, এবং আমার আসলেই অন্যের নোংরা স্পর্শ ছাড়া আর কিছু মনে নেই। মায়ের সাথেই রিকসায় আসছিলাম, সন্ধ্যায় নিউ মার্কেটের সামনে- কেউ পাশ থেকে বুকে প্রচণ্ড একটা খামচি দেয়। চমকে নড়ে উঠলে মা জিজ্জেস করে, কি হয়েছে। উত্তরে, কিছু ভাবার আগেই বলে দেই, কিছু না। মিথ্যাগুলো দিনে দিনে খালি বেড়েই ওঠে। কাউকে কিছু জানানো হয় না। বাবা'র এক মামা, প্রায় আশি বছরের বুড়ো লোক, বাড়িতে এসে নোংরা নোংরা কথা বলে যায়। শরীরের বিভিন্ন জায়গা মোচড় দেয়। তার সামনে যেতে না চাইলে বকা খাই। কেনো যেতে চাই না, এই ব্যাখ্যা আমি দিতে পারি না। 

এরমধ্যেই মেনস্ট্রুয়েশনের সাথে পরিচয়ের কয়েক মাস পর, ক্লাস ফাইভে থাকতেই, সহপাঠীদের মধ্যে এক জ্ঞানী মেয়ে সবাইকে এক জ্ঞান বিতরণ শুরু করলো- দুইটা ওয়াটার বোতল দিয়ে দেখালো ইনটারকোর্স কি। খুবই বিশ্রী, অবৈজ্ঞানিক এবং অস্বাস্থ্যকর ইন্ট্রোডাকশন ছিলো এটা আমাদের সবারই। সেই মেয়েকে আলাদা দোষ দেওয়া যায় না, তারও ঐ বয়সে ওইভাবে এই কথা জানার কথা না। 

যৌনতার সাথে আরেকটি বিশ্রী সাক্ষাতের সূত্র ছিলো বাড়ির আত্মীয় মহল, বিশেষত বয়স্ক নারী সদস্যরা। আবার, বডিশেইমিং নিয়ে হয়তো আলাদা উপাখ্যান লেখা সম্ভব। আমি, এবং আমার পাশে যে মেয়েটি বসতো, আমরা দুইজনেই অনেকের চেয়ে লম্বা ছিলাম। অনেকের মতে, নারীসুলভ দেহকাঠামোও ছিলো না। ক্লাস ফাইভ থেকেই প্রচণ্ডভাবে তা নিয়ে বুলিয়িং দেখেছি। আমার থেকে অন্য মেয়েটি আরও বেশি বুলিয়িং এর শিকার হতো, অথচ আমার জীবনে দেখা সে অন্যতম একটি ভালো মানুষ। বডিশেমিং যারা করে, তারা কি জেনে বুঝে করে? কোনোদিন কেউ এইসবের জন্য ক্ষমা চেয়েছে পরে? 

তো, ক্লাস ফাইভে এই হাল্কা পাতলা জ্ঞান দিয়ে শুরু করার পর, আসলে পুরো ধীরে ধীরে পর্দা উন্মোচন করে এই ঢাউস ঢাউস উপন্যাস যেগুলো আমি গ্রোগ্রাসে দেশ থেকে এবং অন্যান্য বাড়ির তাক থেকে নিয়ে নিয়ে পড়তাম। যা পেয়েছি, তাই পড়েছি। "দেশ" এইক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখে; কিন্তু "দেশ" আবার কখনো ক্লাইম্যাক্সে যায় না। "দেশ" আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছে, এইদিকেও তার ভূমিকা অনন্য অস্বীকার করার উপায় নেই। 

সুতরাং, প্রশ্নটা সরল, বয়ঃসন্ধির সময়টা সভ্য দেশের মতো সেক্স এডুকেশন থাকলে আমাদের ক্ষতি কি? না থেকে, কি কি লাভ হচ্ছে? বাইরের দেশে আসার পর সেক্স এডুকেশন নিয়ে এদের স্কুলের পাঠ্যক্রম জানার পরে থেকে মনে হয়, আসলেই, আবহমান বাংলা সংস্কৃতি রক্ষার এই জঘন্য কয়েদখানা থেকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কবে মুক্তি পাবে! 

যৌনতাবোধের সাথে পরিপূরক এবং সমান্তরাল একটি বোধ, যার বিষয়ে আলোচনা বোধকরি, দরকার হলো বৈষম্যবোধ। লিঙ্গভেদের সামাজিকতা সম্পর্কে সচেতনতা কিংবা মোটাদাগে বলা যায়, আমার নারীবাদ সম্পর্কে প্রথম পাঠ। এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ আমার বেড়ে ওঠার সময়টা বোঝার জন্য, কিছু মর‍্যাল স্ট্যান্ড যা আজীবন থেকে রয়েছে সাথে, তার সূত্রের কাছে যাওয়ার জন্য। 

মামা -চাচা সবার দুই ছেলে। আমার মা'এর দুই মেয়ে। এ নিয়ে নিত্য চর্চা লেগেই থাকতো। পাড়াপ্রতিবেশী হেনস্থা করেই যেতেন। আমার বোনের জন্মের পর এই সার্কাসের ভব্যতাবোধ লোপ পায়। শিশুরা, আমরা যতটা ধারণা করি, তার চেয়ে অনেক বেশি আত্মসম্মানবোধের অধিকারী। এই তীক্ষ্ম হীন মন্তব্যের মধ্যে বড় হওয়ার কারণে আমি যে "মেয়ে" এবং কোনোভাবে "মেয়ে"রা যে "ছেলে”দের চেয়ে অনেক নিচের, তা জেনে গিয়েছিলাম। আমাদের পরিবারে অন্তত ঐ জেনারেশনে সব পুরুষই আলফা মেইল, পার্থক্যটা পরিষ্কার না থাকার কারণ ছিলো না। 

স্বীকার করতে হয়, অনেক দিকেই প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক ধারণায় বন্দী হলেও আমার মা একটি কাজ কখনো করেননি- সেটা হলো চেহারা নিয়ে, গায়ের রঙ নিয়ে খোটা দেওয়া। এটা অন্যরা দিয়েছে। নিজের ভাই না থাকায় পারিবারিক ইনভেস্টমেন্ট ডিসিশন নিয়ে কথা বলতে পারি না। যে মূল ব্যাপারটা ক্লাস ফোর-ফাইভ থেকেই চোখে পড়তো সেটা হোলো অতিরিক্ত বাধা দেওয়া যে কোনো কাজে। আমার পূজার মণ্ডপে যাওয়ার অনুমতি ছিলো না। সবাই যখন মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতো, আমি বাসায় বসে থাকতাম। 

স্বাভাবিক সচেতনতা এই কথাগুলোকে আলাদা করতে পারতো। কিন্তু কোনো মেন্টরিং ছাড়া এই ধারণাগুলো ফর্ম পাওয়া সম্ভব ছিলো না। সেইসময়, বোধকরি ক্লাস সেভেনে, হাতে পাই তসলিমা নাসরীনের "নির্বাচিত প্রবন্ধ"। এটাই আমার প্রথম একটা বই পড়া, যা আমার মতোই এক্সপেরিয়েন্সে, কথাগুলো সাজিয়ে বলছে, একটা সূত্রে গাঁথছে। আমার বেড়ে ওঠার সময়টাতে, বেশ আগে থেকেই ডিগনিটি বোধ তৈরি করতে, নাসরীনের ভূমিকা অনেক। আর "সাতকাহন" এর দীপাবলিকে আমি বহুকাল ধরে বহুবার পড়েছি। অপর্ণা সেন অভিনীত কিছু চলচ্চিত্র, পারমিতার একদিন বা শ্বেতপাথরের থালা ও ভাবায় আমাকে। এইসব বইয়ের কল্যাণে আমি খুব ছোটো বয়স থেকে প্রশ্ন করতে শিখি। প্রশ্ন করলেই "বেয়াদব" বলা হয় এই সমাজে, সুতরাং আমি প্রশ্ন না করেও মেনে না নেওয়ার সহজ নীতিতে চলে যাই। 

এখন, সদ্য পঁয়ত্রিশ পেরিয়েছি, দেশের বাইরেও আছি অনেকদিন - তাই খোলস ছেড়ে বের হওয়ার তাগিদটা টের পাচ্ছি। আমাদের শিশুদের সুস্থ সুন্দর স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য যৌনতা সম্বন্ধে, লিঙ্গ বৈষম্য সম্বন্ধে জ্ঞানচর্চা নিত্যদিনের জীবনের অংশ করা আজ সময়ের দাবি। এই দাবিটা তোলার দায়িত্ব আমাদের। 

লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া প্রতিটা মানুষের জন্য শ্রদ্ধা।

725 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।