শাপলা সপর্যিতা

কবি ও লেখক।

নারীর আলো নারীর অন্ধকার

ব্শ্বি নারী দিবস। আট মার্চের এই দিনে একটা কথা কেনো যে বারবার মনের ভেতর কান্নার শব্দ তুলে হারিয়ে যাচ্ছে কোনো এক নতুন ধারার বেদনাঘাতে কি করে বলি সে কথা। নারীর বেদনার ক্ষরণ আর বিষন্নতার কোনো সঙ্গী নেই। যার কারণ পুরুষ এবং কখনও নারীও। এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। ক্রমাগত রক্তাক্ত হতে হতেও মুখে প্রকাশের অধিকার পায় না, কখনও শিক্ষা সংস্কৃতি বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় কখনও আবার রুচির আর আভিজাত্যও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নারীর অত্যাচারিত হবার কথা প্রকাশের পথে। শুধু যে রাষ্ট্র আর সমাজ তাই নয়। সবের আড়ালে রয়েছে আরও এক নির্মম ক্লেদ প্রতি মুহূর্তে যা ক্ষত বিক্ষত করে নারীর হৃদয়, সামাজিক মর্যাদা আর কাজের পরিবেশ। বিচ্ছিন্ন করে তার আবহ। তোলপাড় করে তার পরিবার আর বসবাসের জীবন।

নারী শোষিত হবার প্রকারের শেষ নেই। নারী শোষিত হয় পরিবারে। নারী শোষিত হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের নীল নকশায়। নারী শোষিত হয় সন্তানের দ্বারা। নারী শোষিত হয় বন্ধু আত্মীয় আর পরিজন দ্বারাও। নারী শোষিত হয় স্বামী অথবা প্রেমিকের দ্বারাও। আমি শাসিত হয়েছি পরিবার দ্বারা। লিখতে পারবো না পরিবারের কোনো এক সদস্যের দীনতা যার দায় ভার বহন করে চলেছি জীবনভর। ঘরের বাইরে এসে দেখি দাঁড়িয়ে আছি একা। পায়ের নিচে মাটি শক্ত করেছি দিন রাতের পরিশ্রমে, সততায় ধ্যানে অধ্যাবসায়ে। অথচ অন্য আরও দু‘চারজন বিখ্যাত নামকরা জনপ্রিয় নারী লেখকের লেখাকে অস্বীকার করা হয়েছে, তাই এই অনামা অখ্যাত অজানা লেখক আমি লিখতে পারবো না কোনো বিশেষ পত্রিকায়। তাতেই আমাকে নিয়ে নোংরামির ইঙ্গিত করে নারীই। কোনো এক পত্রিকায় দীর্ঘদিন লেখার পর আমি অন্য আর কোনো পত্রিকায় লিখতে পারবো না, সম্পাদকের মানা। নারী সেতো লেখক নয় যেন সম্পাদকের সম্পত্তি। আমিতো তা নই। কেনো আমি লিখবো না আমার যেখানে ইচ্ছে?

কোনো সম্পাদকের নারী ঘটিত কেলেঙ্কারি রয়েছে প্রচুর, তাই লিখতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সেই কেলেঙ্কারীর দাগ গায়ে মেখে নিয়ে তবেই লিখতে হবে, আর এই দায়-দাগ চাপানোর দায়িত্ব নিয়েছেন অগ্রজ অনুজ সতীর্থ নারীরাই। সাথে পুরুষ আছে বৈকি। নারীর এইসব ক্লেদের পেছনে পুরুষের হাত বরাবরই প্রসারিত-উদার। কোথায় নারীর অধিকার আদায় হয়েছে? নারীর শোষিত হবার প্রকারভেদের অভাব নেই। কত কত যে ভিন্ন তার মাত্রা। এত ভেতরের নীরবের। এর বাইরেও, পুরুষের নারীর ওপর অত্যাচারের সীমা কখনও কখনও মারাত্মক অমানবিক কখনও যা পিশাচকেও ছাড়িয়ে যায়। তাই নুসরাত পুড়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে। ইয়াসমিন ধর্ষিত হয় পুলিশের দ্বারা। অর্নামিতো গ্যাংরেপের কবলে পড়েই মাত্র শুরু হওয়া জীবনটাই প্রেমিক আর তার বন্ধু দলের হাতে সঁপে দেয়। আর সেই যে সতেরো বছরের মেয়ে শবমেহেরের কথা হয়তো আজ আর কারো মনেই পড়ে না। নারীর কোমল মনের ভালোবাসাকে পুঁজি করে পুরুষ যারা শিক্ষিতজন-বন্ধু-মাতাতো-খালাতো-চাচাতো-ফুপাতো ভাই, স্কুলের শিক্ষক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েরও শিক্ষক-কবি-লেখক-কেরানি-পিয়ন-ঊর্ধতন কর্মকর্তা! কে নেই এই সারিতে। কিন্তু কেনো যে বিশ্বনারী দিবসের এই দিনে এসব কথাই আমার বেশি করে মনকে আলোড়িত করছে।

কিন্তু বিশ্বনারী দিবসের প্রেক্ষাপটটা আসলে ছিলো নারীর আর্থিক স্বচ্ছলতা আর কর্মঘন্টা নির্ধারণের উপর আলোকিত। তার অধিকার আদয়ের পথটা একেবারেই সরল ছিলো না। শুরু হয়েছিলো সেই ১৬৪৭ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের মার্গারেট ব্রেন্ট ম্যারিল্যান্ডের এসেম্বলিতে প্রবেশের দাবী করে বসলেন। সাথে সাথে পুরুষতন্ত্র তা নাকচ করে দিলো। সামনে এগিয়ে এলেন লা ব্যারে। ‘ইুকয়াল্টি অফ টু সেক্সেস, স্পিচ ফিজিকাল এন্ড মোরাল হোয়ার ইট ইজ সিন দ্য ইমপোর্টেন্স টু ডেমোলিশ ইটসেলফ্ প্রেজুডিস’ প্রবন্ধ টি লিখে সারা ফেললেন।

১৭৯১ সালে ফরাশী নাট্যকার ও বিপ্লবী অলিম্পে দ্য গ্রুস (Olymmw de Gouges) নারীকে অবলোকন করাতে চেয়েছিলেন প্রকৃতির সাম্রাজ্য মিথ্যা আর পক্ষপাতে দুষ্ট নয়। নিজেকে আবিস্কার করো। তারই ফলে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। ফাঁসিতে ঝুলবার আগ মুহূর্তে সেই অদম্য সাহসী বলেছিলেন, 'নারীর যদি ফাঁসিতে যাবার অধিকার থাকে তবে পার্লামেন্টে যাবার অধিকার থাকবে না কেনো?’

১৭৯২ সালে ইংল্যান্ডের লেখক দার্শনিক ওলস্টনক্রাফট ‘A Vindication of the Rights of Woman’ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন যে নারী কোনো যৌনজীব বা ভোগের সামগ্রী নয় ।যুক্তরাস্ট্রের এম গ্রিম কে (এঞ্জেলিনা ও সারা) এই দুই নিগ্রো বোন দাসপ্রথা বিলোপ ও নারীঅধিকারের জন্য আন্দোলন শুরু করেন্। ১৮৩৭ সালে আমেরিকায় প্রথম দাসপ্রথা বিরোধী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরই মাধ্যমে নারী প্রথমবারের মতো রাজনীতি করার সুযোগ পায়।

অন্যদিকে নিউইয়র্কে সেলাই কারখানায় চলতে থাকে অমানবিক নির্যাতন। নারী শ্রমিকদের কর্মঘন্টা একদিকে পনেরো ঘন্টা অপরদিকে তাদের ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিল, বিলম্বে উপস্থিতি এমনকি টয়লেটে বেশি সময় কাটানোর জন্যও মজুরী কেটে রাখা হয়্। ১৮৫৭ সালের আটই মার্চ প্রথম নিউইয়র্কের শ্রমিকরা কাজের সময় দশ ঘন্টা ও উপযুক্ত বেতনের দাবীতে পথে নামেন। এটাই প্রথম নারী আন্দোলন যাতে পুলিশ গুলি করে। এ বছরই জন্ম হয় ক্লারা জেটকিনের। ১৮৭৮ সালে ক্লারা সিবার ইন্সটিটিউট থেকে কৃতিত্বের সাথে পাশ করে শিক্ষকতার সনদপত্র পান। ফরাসী বিপ্লবের অবাধ স্বাধীনতা ও ভাতৃত্বের আদর্শে বিশ্বাসী জার্মানীর ক্লারা জেটকিন এলেন নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে। তার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, অগাস্ট বেবেল, কার্ল লাইভনেখত, রোজা লুক্সেমবার্গ, লেনিন সহ আরও বিশ্বনেতাদের। ১৮৬০ সালে নিউইয়র্কে নারীরা প্রথম দাবী আদায়ের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে সমর্থ হন। ১৯০৭ সালে কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক নারী সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় আর ক্লারা জেটকিন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯১০ সালে ক্লারা জেটকিন কোপেনহেগেনে আটই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দেন। তখন এটি সকলের মতামতের ফলে অনুমোদন পায়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আট মার্চকে দাপ্তরিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে ঘোষণা দেয়। এই ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পটভূমি আর তার সাফল্য গাথা।

যে অমূল্য জীবন নারীকে দিতে হয়েছে তার কাজের জায়গায় মানবিক মূল্যায়ণের জন্য তারও বেশি বোধ করি দিতে হয় বেঁচে থেকে প্রতি পদে পদে আজও। রাস্ট্রব্যবস্থায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বনারী দিবস দিয়েছে যোগ্যতা মূল্যায়ণের সুযোগ আর যন্ত্রের বাইরে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা, সঠিক মজুরী পাবার অধিকার। কিন্তু অন্তরে যে সুপ্ত একাকীত্ব নিভৃতে যে বন্ধুত্বের আবাস-যেখান থেকে আসবার কথা সব কাজের প্রেরণা-সৃষ্টির উন্মাদনা আর প্রাণপ্রাচূর্য সেখানে পুরুষ রাষ্ট্রযন্ত্র সমাজ খুব নীরবে গোপনে হরণ করছে নারীর যোগ্যতা আর মনুষ্যত্ব। নারী, জানেন কি তা? আজ বোধ হয় ঘুরে দাঁড়াবার সময় এলো। নারী দিবসের এই বিশিষ্ট আলোয় নারী কি পারবে নিজেকে এক সম্পূর্ণ মানুষ রূপে সম্মান করে সব দ্বিধা লোকলজ্জা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ করে উঠতে!

সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। আর অগ্রজ সব নারীযোদ্ধাদের জানাই সালাম।

492 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।