সৈয়দা সুমাইয়া ইরা

চাকুরীজিবি, নারীবাদী।

সিভিল সমাজে নারীর অবস্থান ও মহিলা পরিষদের আন্দোলন

সিভিল সমাজ বলতে সাধারণভাবে প্রাপ্ত বয়স্ক, শিক্ষিত, সুস্থ এবং সচেতন নাগরিক বোঝায়।  বলা বাহুল্য নারী এবং পুরুষ উভয়েই সিভিল সমাজের সদস্য। সিভিল সমাজ হলো এমন একটি জনগোষ্ঠী যে জনগোষ্ঠী নিঃশঙ্কোচে গনতান্ত্রিক পরিবেশে বসবাস করতে পারে।

বাংলাদেশেও এ কথাটি যথার্থ সত্য। কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশের মতোন বাংলাদেশের নারীর অবস্থান প্রান্তিক পর্যায়ে এবং পুরুষের চেয়ে অধস্তন।

সভ্যতার প্রারম্ভে পুরুষ ও নারী উভয়ের অবস্থান প্রায় সমরূপ ছিলো। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নারীই অধিক মর্যাদাবান ছিলেন। কেননা, পরিবারের অধিকাংশ দায়িত্ব বহন করতো নারীরা। খাদ্য সংগ্রহের দায়িত্ব প্রধানত  ছিলো নারীদের। কৃষি ও পশুপালন যুগেও এ মর্যাদা  কিছুটা রয়ে যায়। প্রত্নতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেন,  ভারববর্ষে আর্যরা আসার পূর্বে প্রাচীন দ্রাবিড় ও অস্ট্রোলিয় ভাষার মানুষদের সমাজে নারীপ্রধান ছিলো। আর্যরা এসে সৃষ্টি করলো বৈদিক সভ্যতা ও সংস্কৃতি, বৈদিক যুগে আর্যদের প্রধান দুটি জীবিকা ছিলো কৃষিকাজ ও পশুপালন। বৈদিক যুগের শুরুতে কিছুটা নারীর সম্মান থাকে জায়া বা মা হিসেবে। এই সময় সমাজের মালিকানার উপর ভিত্তি করে সামাজিক অসাম্য দেখা গেলো। দ্রাবিড়যুগে যেই সমাজ ছিলো ঐক্যবদ্ধ, সেই সমাজ হয়ে উঠল বৈষমপূর্ণ। কিছু কিছু গোষ্ঠী ধনী হয়ে উঠলো পাশাপাশি দেখা দিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর। চাষের জমি ও পশুর মালিকানার দাবি নিয়ে বিশেষ সুবিধাবাদী সম্প্রদায়ের সূচনা হলো। বৈদিক আর্য সমাজে কৃতদাস প্রথারও আভির্ভাব ঘটলো। যুদ্ধবন্দিদের শ্রম সহজে ও বিনা পারিশ্রমিকে পাওয়ার জন্য প্রথমে যুদ্ধবন্দিরাই দাস হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু ক্রমেই ধনীর ঘরে সমাজের গরিব মানুষ ক্রীতদাস হিসেবে গণ্য হতে থাকে।  দানা ফসল গুড়ো করার জন্য প্রথমে নারী ক্রীতদাস নিয়োগের খবর পাওয়া যায় অথর্ববেদে। ক্রীতদাস প্রথার আস্তিত্বসম্পন্ন আর্য সমাজকে অপরিণত পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাই বলা যায়।

এতোকাল উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর যে ক্ষমতা ও অধিকার ছিলো তা পুরুষ দখল করে। উল্লেখ্য, সম্মানজনক অধিকার থেকে সরিয়ে বিবাহ প্রথার মধ্য দিয়ে নারীকেও পরিবারের দাস হতে হলো। এবং নারীর দাস শ্রমের উপর গড়ে উঠল বাঙালি পরিবার প্রথা। শুধু বাঙালি নারীর জীবনেই এমনটা ঘটেনি, মানব জাতির মধ্যে নারীই প্রথম দাসত্বের শৃঙ্খল পরেছে এটা পৃথিবীর সকল সমাজেই প্রমাণিত হয়েছে।  ইতিহাসে দাস প্রথারও আগে নারীর দাসত্ব শুরু হয়েছে সেটাও সমাজতাত্ত্বিকরা প্রমাণ করেছেন।

নারীদেরকে বিশেষত পাশ্চাত্যে তাদের অধস্তনতার বিপক্ষে প্রথম প্রতিবাদী হতে দেখা যায়। এভাবে নারী আন্দোলন গড়ে উঠে। আন্দোলনের ধারাকে বিশ্লেষণ করলে তিনটি নারীবাদি মতবদ পাওয়া যায়, লিবারেল ফেলিনিজম, সোসালিষ্ট ফেমিনিজম ও র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিজ। গোটা ইউরোপ এবং আমেরিকা সমাজ প্রথম লিবারেল ফেমিনিজম দ্বারা প্রভাবিত হয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সোসালিষ্ট ফেমিনিজমের প্রাধান্য ছিলো। আর ৭০ দশকে র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিজম মতবাদ প্রচার হবার পর ইউরোপসহ আমেরিকায় এই মতটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। 
 
তবে আমাদের দেশে নারী মুক্তি আন্দোলন প্রধানত কোনো বিপ্লবী মতবাদ দ্বারা পরিচালিত হয়নি। নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরোধা রাজা রামমোহন রায়,  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর   মানবতাবোধ দ্বারা পরিচালিত  হয়ে নারীদের সামাজিক অন্যায় অত্যাচার থেকে শৃঙ্খল মুক্ত করতে চেয়েছেন। তবে বাঙালি মুসলিম  সমাজে নারীমুক্তির প্রথম পথ তৈরি করেন বেগম রোকেয়া। বেগম রোকেয়াই প্রথম বলেছিলেন, "কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্ন, বস্ত্র উপার্জন করুক।"
 
বেগম রোকেয়ার সময় আর আমাদের সময় আর বর্তমান সময়ের মধ্যে অনেক তফাত। বাংলাদেশের নারীরা আজ সমাজের প্রায় প্রত্যেকটি কর্মক্ষেত্রে নিজেদের উপস্থিত করেছেন৷ তারপরও দেখা যায় রাজনৈতি, অর্থনৈতিক, আইনগত এবং সামাজিক অনেক বিষয়েই নারী পশ্চাদপদ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতন অনুন্নত দেশে,  যে দেশে শতকরা ৮৩ ভাগ জনতা দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে সেই দেশের নারী দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতম।
 
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের  দশমাস সময়ের মাঝে সংবিধান রচিত হয়। সংবিধান রচিত হবার সময়ে নারী সমাজের পক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীর আর্থ -সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ১৬ দফা দাবি তৎকালীন সরকারের নিকট পেশ করে। এ সকল দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সংবিধানে নারীর স্বার্থে কিছু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধারা সংযোজন করা হয়। যাকে সিভিল সমাজে নারী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র কর্তৃক কিছুসংখ্যক দাবি মেনে নেয়ার এক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
 
কিন্তু দেখা যায় যে এই অধিকারগুলো বেশির ভাগই কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। সম অধিকারের যথার্থ ব্যাখ্যা সংবিধানে দেয়া হয়নি। ফলে,  অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর স্বার্থবিরোধী  পূর্ব প্রচলিত আইনগুলো বাতিল অথবা সংস্কার হয়নি।  এ ছাড়া নারী সমাজের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের মনোভাব, অথবা রাষ্ট্রের একজন নাগরিক এবং সমাজের একজন মানুষ হিসেবে নারীকে অধিকার দেয়ার যে দৃষ্টিভঙি সেটা আমাদের দেশে অনুপস্থিত থাকায় সংবিধানের এই ধারা গুলো বাস্তবে অর্থহীন হয়েছে।  অন্যদিকে অর্থহীন  এবং ম্লান হয়ে পড়েছে  সিভিল সমাজের একটি অংশ হিসেবে রাষ্ট্রের মূল ধারায় নারীর সম্পৃক্ততা।

907 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।