নারীবাদী সাহিত্যতত্ব: লুপ্ত অতলান্তিক ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ - ০২

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৯ ১০:৪০ PM | বিভাগ : সাহিত্য


(প্রথম পর্বের পর) ভার্জিনিয়ার প্রশ্নগুলোকে আরো ব্যাপক, বিশিদ ও গভীর করে ছড়িয়ে দিলেন তাঁরা। মেরী এলম্যানের Thinking About Women (1903), টিল্লি ওলসেনের `Breaking the Silence (1972),’ প্যাট্রিসিয়া মেয়ার স্প্যাকসের `The Female Imagination (1977),’ এলেন মোয়ের্সের `Literary Women (1946),’ এলেন শোওয়াল্টারের

`A Literature of Their Own: British Women Novelists From Bronte to Lessing (1977),’ জাতীয় গ্রন্থসমূহে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলো নারীলেখকদের লেখা সম্পর্কে সমালোচকদের ঔদাসীন্য ও বিরূপতা প্রসঙ্গে। নারীলেখকদের প্রতি সমাজের সার্বিক “ট্যাবুগ্রন্থ” প্রত্যাশা সম্পর্কে। উপরোক্ত লেখকরা অবশ্য কমবেশি সবাই অ্যাংলো মার্কিনী (ব্রিটিশ ও মার্কিনী) স্কুলের অনুসারী। সত্তরের দশকের শেষ ও আশির শুরু হতে এঁদের সাথে “বিরোধাত্মকভাবে” যোগ দিলেন ‘নিউ ফ্রেঞ্চ ফেমিনিজম’ বা ফরাসী নারীবাদী স্কুলটির অনুসারী ও অনুরাগীগণ। ‘বিরোধাত্মক’ শব্দটি এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হল একারণে যে লক্ষ্য এক হলেও গবেষণাকৌশল ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে এ দুই স্কুলের ফারাক বিস্তর। সরাক্ষণই ঝগড়া লেগে আছে। অ্যালিস জর্ডাইন এ দু’স্কুলের মতবিরোধ নিম্নলিখিত উপায়ে সংক্ষিপ্তসার করেন:

অ্যাংলো-মার্কিনী

নিউ ফ্রেঞ্চ ফেমিনিজম

১। মানবতাবাদ ও গবেষণামূলক পদ্ধতি, নৃতত্ব, সমাজতত্ব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান তাত্বিক ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।

১। ল্যাকোনীয় মনো-বিশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়া (Psycho Analytic Process), রঁলা বার্থ ঘোষিত টেক্সট কেন্দ্রিকতা, ভাষাতত্ব (Linguistic) ও প্রতীকবাদ এই স্কুলের তাত্বিকভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

২। এ্যাংলো-মার্কিনী স্কুল দ্ব্যর্থহীনভাবে বিশ্বাস করে কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া সাহিত্যিক নারী-ঐতিহ্যের গুপ্তসম্পদে। শোওয়াল্টারের ভাষায় যা সমুদ্রোত্থিত আটলান্টিসের লুপ্ত মহাদেশ।

২। ফ্রেঞ্চ নারীবাদীরা সাহিত্যের ইতিহাস খোঁড়াখুঁড়ির বদলে নারীর অবচেতন সত্ত্বাকে সাহসিকতার সাথে আলোয় নিয়ে আসতে চেয়েছেন।

৩। নারীর প্রতি সামাজিক শোষণ এর প্রধান আলোচ্য এবং নারীর সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন এ স্কুলের অভিষ্ট লক্ষ্য।

৩। নারীর যৌন অবদমন এ স্কুলের প্রধান আলোচ্য এবং নারীর যৌনপুলক (Jouissance) অর্জন এ স্কুলের অভিষ্ট লক্ষ্য। ভিভিয়ান ফরেষ্টার ও এলেইন মার্কসের ভাষ্যে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর অপর নাম যেনো অবদমন। নারীর নিজস্ব ভাষা কোনটি? সোশানা ফেলম্যান প্রশ্ন করেন। প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচারের ভাষা কাঠিন্য কি পুরুষ-প্রভাবের লক্ষণ নয়? স্পিভাক এ সূত্রে তৃতীয় বিশ্বের নারীদের প্রশ্নটিও তুলেছেন। ফ্রেঞ্চ স্কুল তাই বারম আর নারীর যৌনতৃপ্তি ও সে সংশ্লিষ্ট পুরুষবাদী রাজনীতির উপর আলো ফেলে। সিনেমায় এই Jouissance অর্জনের প্রশ্নটি তুলেছেন অপর্না সেন। ‘পরমা’ ছবির এই ভয়াবহ মন্তাজটির কথা কেনো যে বাঘা বাঘা চিত্র-সমালোচকরা উল্লেখ করেন না, বোঝা দায়। ঐ যেখানে পরামা মাঝে মাঝেই স্বপ্নে দেখে তার সাদা থান পরা ও কদম ছাঁট চুল বিধবা কিন্তু যুবতী পিসীকে। যুবতী পিসীর অস্ফুট আর্তনাদের সাথে ক্যামেরায় ভেসে উঠছে বিস্তীর্ণ গাঁদা ফুলের প্রান্তর...! এ স্বপ্ন দু’বার দেখছে পরমা। রাহুলের সাথে প্রণয় সম্পর্ক স্থাপনের পূর্বে। গাঁদা ফুলের স্বপ্ন দৃশ্যের কয়েকটি শট পরেই রাহুল ও পরমা এক অবরুদ্ধ, অন্ধকার ঘরে। অন্ধকার ঘরের জানালা খুলছে রাহুল। আসলে সে খুলছে পরমার দীর্ঘদিনের অবদমনের পৃথিবী। ডানা ঝাপটে উড়ে গেল কয়েকটি পায়রা। এক টুকরো আলো। এই শটটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিধবা পিসীর আর্তমুখ ও গাঁদা ফুলের প্রান্তর পরমা আবার স্বপ্নে দ্যাখে রাহুলের সাথে তার সম্পর্ক সমাজে জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর। এখানে বিধবা পিসীর আর্তি প্রাচ্য নারীর অকল্পনীয় যৌন অবদমনের ঈঙ্গিত- এই যৌন অবদমন উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তেছে পরমার কাঁধেও। স্পিভাকের তত্ব এভাবেই মূর্ত হয়ে উঠল সেলুলয়েডে। গাঁদা ফুলের প্রান্তর এখানে অভিষ্ট “Jouissance.”

৪। এ্যাংলো-মার্কিনী স্কুলের প্রধান স্থপতিদের মাঝে রয়েছেন: মেরী এলম্যান, টিল্লি ওলসেন, প্যাট্রিসিয়া মেয়ার স্প্যাকস, এলেন মোয়ের্স, এলেন শোওয়াল্টার প্রমুখ।

. জুলিয়া ক্রিস্তেভাঁ, জুলিয়েট মিশেল, হেলেন সিস্কু প্রমুখ ফরাসী স্কুলের স্থপতি।

অবশ্য এ দুই স্কুলের মাঝেও রয়েছে আরো হাজারটি স্কুল যেমন, কৃষ্ণাঙ্গঁ নারীদের ÒWomen Talk Collectively” (অ্যাংলো মার্কিনী স্কুলের অন্তর্গত), সমকামী সাহিত্যতত্ব (উভয় স্কুলেই এ শাখাটি অন্তর্ভূক্ত), আন্তর্জাতিকতাবাদ (ফ্রেঞ্চ স্কুলের অন্তর্গত ও গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের নির্দেশনায় পরিচালিত) মার্ক্সিষ্ট-ফেমিনিষ্ট স্কুল (আলথুসার, লুকাচ, টরিলয়ম প্রবর্তিত), বক্তব্যে ফ্রেঞ্চ স্কুলের সাথে দারুণ মিল রয়েছে), যারা মাঝে মাঝেই পরস্পরের সীমারেখা উল্লম্ফন করে যায় এবং এ ওর বক্তব্যকে প্রভাবিত করে। যা হোক, নারীবাদীদের এ হাজার মত ও পথের চর্চার মধ্যে থেকে যে কতিপয় জায়মান প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ বারম্বার ঘুরে ফিরে আসে সংক্ষেপে তাদের আমরা ৪টি প্রধান শিরোনামায় বিন্যস্ত করতে পারি:

প্রথমত, সাহিত্যে নারী ঐতিহ্যের সন্ধান (Finding a Female Tradition) বা আদি মাতা (Foremothers) অন্বেষণ।

দ্বিতীয়ত, নারীরচিত সাহিত্যের আঙ্গিঁক-আলোচনা ও কালপর্বায়ন।

তৃতীয়ত, সাহিত্যে “নারীসত্বা” বা মেয়েদের “আমিত্বের” সংজ্ঞায়ন (Defining Feminist Writing or Feminine)

চতুর্থত, সমকামী, কৃষ্ণাঙ্গঁ ও তৃতীয় বিশ্বের নারী সাহিত্যের বিশাল জগৎ উন্মোচন।

 

সাহিত্যে নারী ঐতিহ্যের সন্ধান ও আদিমাতা অন্বেষণ

মিশেল ব্যারেট তাঁর ÒIndroduction to Virginia Woolf: Women and Writing” গ্রন্থে বলেছেন যে, নারী লেখকদের প্রধান কর্তব্য হলো সাহিত্যে ‘আমরা (we)’-কে সংজ্ঞাযিত করা এবং নারীর নিজস্ব নন্দন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু, এই নারী ঐতিহ্যের সন্ধান বা আদিমাতাদের সনাক্ত করার জন্য মেয়েরা যেন গায়ের জোর না খাটায়। অনেক নারীবাদীই যেমন ড্রাইডেনের পরিবর্তে আফ্রা বেন, হেনরি জেমসের স্থলে এডিথ হোয়ার্টন এমনকি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়র্থের স্থানে ডরোথি ওয়র্ডসওয়র্থ কে পাঠের প্রস্তাব করেছেন। একটি “ওয়্যার এ্যান্ড পীসের” প্রতিতুলনা খোঁজার চেষ্টায় তাঁরা বহু মাঝারি গোছের রচনাকর্মকেও ‘অসাধারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে বনি জিমারম্যান, অড্রেন রিচ ও এলিস ওয়ার্কার নারী সাহিত্যিকদের নিজস্ব ঐতিহ্য, স্বকীয় নাম ও নামিক ইতিহাস এবং পূর্বমাতাদের সন্ধানে ব্রতী হয়েছেন। আর এ দায়িত্ব পালনে তাঁরা প্রশ্ন করেছেন প্রচলিত যাবতীয সাহিত্যিক মূল্যবোধ এবং নারীবাদী আন্দোলনের ভিতর ও বাহির, উভয়দিক হতেই বর্ণবাদী ও বিপরীতকামী মূল্যবোধগুলোকে সনাক্ত করেছেন। বস্তুতঃ শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবিত্ত মহিলারা নারীবাদের চর্চা ও মেয়েদের কথা লিখতে যেয়েও ছদ্মবেশী পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোর বিভ্রান্ত চর্চা করেছেন। যেমন, তাদের লেখায় নারীর যে ইমেজটি সবচেয়ে বেশি প্রভাস হয়েছে তা’ ANGEL IN THE HOUSE (গৃহলক্ষী) বা বিশ্বস্ত স্ত্রী, শৌর্যবান নাইটের জন্য প্রতীক্ষারত ও কাব্য-পিপাসু, ভঙ্গুর ও সুন্দরী কুমারীর চিত্র। বলা বাহুল্য, এর প্রতিটি ইমেজই পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেয়া ইমেজ। পাশাপাশি কৃষ্ণাঙ্গ অথবা সমকামী লেখিকারা তাদের বর্ণবাদবিরোধী বা সমকামী আন্দোলনের মাধ্যমে বস্তুত: সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। সমকামী লেখকারা (লেখক শব্দটি ব্যবহার করা হলো) ‘সমকামিতা’-কে নিছক শারীরিক তৃপ্তির মাধ্যম, ‘বিকল্প জীবন ব্যবস্থা’ কিম্বা সংখ্যালঘু কোনো গোষ্ঠীর চাহিদা হিসেবে দেখেন না বরং প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক সুক্ত, যা নারীর জন্য পুরুষকেই একমাত্র কাম্য ও আরাধ্য বলে মনে করে, সেই সুক্তকেই প্রত্যাখান করে নিঃসীম অবহেলায়। সমকামী নারীরা মহান সাফোর উত্তরসুরী, যে সাফো ‘প্লাটোনিক লাভে’-র দাম্ভিক পুরুষালি অহম ও ‘মননশীলতা’-কে যোগ্য জবাব দিয়েছিলেন।

যা হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। সাহিত্যে নারী ঐতিহ্যের সন্ধান কিভাবে সম্ভব? কারা আমাদের আদিমাতা? কিভাবে খুঁজে পাব তাদের? (চলমান)

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন


  • ৩৮১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট