বাঙালি নারীবাদের মক্কা কতো দূর

মঙ্গলবার, মার্চ ১০, ২০২০ ৩:১৩ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


নারী দিবস আসন্ন হলেই, বাঙালি নারীবাদের 'মক্কা' কতো দূর -এই প্রশ্নটা আমার মনে আসে। এই পথটির দূরত্ব পরিমাপ করা দুরূহ কাজ বটে। তবে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত থেকে অনুমান করা যেতে পারে।

দৃশ্যপট- জাপান
ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে পশ্চিমাদের সমুদ্রাভিযান পূর্ণতা লাভ করে বিশ্বের আনাচকানাচে বাস করা সকল জাতি-গোষ্ঠীকেই বৈশ্বিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিলো। একদল জাপানি নারী এই বিরল সুযোগটির সদ্ব্যবহার করে, ইউরোপিয় আলোকনপ্রসূত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, দেশের আপামর নারীদের সমর্থন নিয়ে নিজেদের দেশে নজিরবিহীন, বিহ্বলকারী একটি নারীবাদী আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন যা পুরো দেশটাকেই ঝাঁকুনি পর ঝাঁকুনিতে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলো। সমাজে প্রতিষ্ঠিত, 'পুরুষ শ্রেষ্ঠ' ভাবনাটির ত্রাহি ত্রাহি দশা হলো। নাগরিকপ্রেমী রাষ্ট্র সরকার ভাবলেন, 'মোক্ষম সুযোগ'! রাষ্ট্র সরকার তাৎক্ষণিক সুযোগটির সদ্ব্যাবহার করলেন; সকল রাষ্ট্রীয় কানুনে নারী-পুরুষের সমতার বিধান করলেন।

এর প্রভাব পড়লো সমাজ এবং পরিবারের উপর। সমাজ নিজ সদস্যদের লিঙ্গ পরিচয় গ্রাহ্য করাকে অশোভন বলে মনে করলো। পরিবারের পিতামতাও নিজে সন্তানদের মধ্যে কে ছেলে আর কে মেয়ে তা ভুলে গেল। প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল ব্যপ্তি আন্দোলনটির পত্তনকারীরা সফল হলেন; যদিও নিজেদেরকে ব্যক্তিজীবনের সুখ-সাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে হয়েছিলো।

এখন প্রশ্ন হলো, প্রাপ্য আদায়ের জন্য এই পাগল মেয়েগুলোকে কেনো ব্যক্তিজীবন বিসর্জন দেবার মতো নির্মম হতে হয়েছিলো? এর উত্তর পেতে হলে, আন্দোলনপূর্ব সমাজ ব্যবস্থাটি নারীদের জন্য কতোখানি অসহনীয় ছিলো তা জানা দরকার।

এখন থেকে আট শত বছর আগে জাপান সম্রাট একটি কবি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। সারা দেশ থেকে সম্মেলনে আহূত অভ্যাগত কবির সংখ্যা ছিলো ছয় হাজার। বিস্ময়কর যে যেখানে আগত কবিদের মধ্যে অর্ধেকই ছিলেন নারী! Haiku, Tanka, Senriyu ইত্যাদি জাপানী ধ্রুপদী কবিতাগুলো কঠিন রীতিনীতির শৃঙ্খলে বাঁধা। ভাষার উপর ঈশ্বরতুল্য সক্ষমতা অর্জন না করলে এসব রচনা করা অসম্ভব। এই উচ্চমার্গীয় সাহিত্যকর্মটিতে সেকালেও নারীদের দখল ছিলো অর্ধেক! সেই সম্মেলন অনুষ্ঠানটির বেশ কিছু অংকিত চিত্রও উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলোর পটুয়ারা ছিলেন সবাই নারী! চারুকলায় তাদের দখল একচেটিয়া!

আজ থেকে এক হাজার বছর আগে পৃথিবীর সকল বড় জনপদগুলো মধ্যযুগে প্রবেশ করলেও জাপানে তখনও চলমান ছিল প্রাচীনযুগ। জেনে চমৎকৃত হবেন- সেই প্রাচীনযুগের জাপানি ধ্রুপদী সাহিত্যের যেগুলো চিরায়ত অংশ এবং চিরন্তন প্রতিনিধি সেগুলোর রচয়িতাদের সকলেই নারী! এই সাহিত্যগুলো গদ্যে লিখিত উপন্যাস, যেখানে পৃথিবীর বাকি অংশের প্রাচীন-মধ্যযুগীয় সাহিত্যের মত ঈশ্বর, অবতার, দেবতা, অলৌকিকতা, পৌরুষের জয় জয়কার এসবের বালাই নেই। আছে জনমানুষের কথা, সংসার জীবনের টানাপোড়েনের কথা, প্রেম নিবেদন-প্রত্যাখ্যানের কথা, রাজনীতির কথা; আছে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে মানব চরিত্রের বিশ্লেষণ, সামাজিক দ্বন্দ-কলহের মীমাংসা, প্রকৃতির সাথে মানুষের বোঝাপড়া, নিসর্গপ্রীতি ইত্যাদি। পড়লে বিংশ শতকের ইউরোপীয় আধুনিক উপন্যাস বলে ভুল হতে পারে। উচ্চতর শিক্ষা ছাড়াও প্রকৃতি, সমাজ, পরিবার, ব্যক্তি- এসব বিষয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সেই নারী লেখকদের দীর্ঘকালের পর্যবেক্ষণ না থাকলে এমন সৃষ্টি সম্ভব নয়। আরও চমৎকৃত হবার বিষয়টি হলো, এসব নারীদের কেউই কারও বোন, স্ত্রী বা মা বলে পরিচিত ছিলেন না, ছিলেন না কোনো মঠবাসী সন্ন্যাসিনী কিংবা রাজপৃষ্ঠপোষকতায় ধন্য বিলাসিনী; ছিলেন, স্বকীয়তায় দীপ্তিমান একজন ব্যক্তি মাত্র।

এতোটুকুতে বোঝা গেলো, আন্দোলনপূর্বকালে, এমনকি প্রাচীনকালেও জাপানি নারীরা অন্তঃপুরবাসিনী ছিলেন কিন্তু অবরোধবাসিনী ছিলেন না। নারীসুলভ কোমলতা ছিলো কিন্তু অন্তঃপুরসুলভ আড়ষ্টতা তাদের ছিলো না। স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য কিতাবি শিক্ষাকে তারা প্রয়োজনীয় করতেন না, কিন্তু করতে চাইলে বাঁধাপ্রাপ্ত হতেন না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে সুবিধাটি জাপানের নারীরা সর্বদাই পেয়ে এসেছেন, সেটি হলো- ধর্মীয় অনুশাসনের দ্বারা তাদেরকে কখনোই শৃঙ্খলিত হতে হয়নি। বাল্যবিবাহ, সতীত্ব, বৈধব্য- এসব অনাচারসহ অন্যান্য নারীসম্পৃক্ত সামাজিক হিংস্রতার মুখোমুখিও তাদেরকে হতে হয়নি।

মোটকথা, কমপক্ষে খৃষ্টীয় দশম শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ পর্যন্ত জাপানি নারীদেরকে পুরুষতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়নি; 'গৃহিনী' পরিচিতি বহন করেও অন্তঃপুরে অন্তরীণ থাকতে হয়নি। তারা আকাশ দেখতেন, তারা পূর্ণিমা উপভোগ করতেন, তারা সাগরের হাওয়া গায়ে মাখতেন, তারা পথ হারিয়ে আবার পর্বতের কোলে নিজেদেরকে ফিরে পেতেন। তাদের পরিনত ব্যক্তিত্ব, তাদের সামাজিক মর্যাদার যে চিত্রটি আমারা দেখতে পাই, তা সমকালীন পাশ্চাত্যেও অকল্পনীয় ছিল।

হাজার বছর ধরে এতোখানি সুবিধাজনক সামাজিক পরিস্থিতিতে থেকেও, জীবন বাজি ধরা একটি প্রতিবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে জাপানি নারীদেরকে ন্যায্য পাওনাটুকু বুঝে নিতে সময় লেগেছে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর। অভীষ্ট লক্ষ্যটি ভেদ করার প্রত্যয়ে ঝাঁকুনির উদ্দীপনায় নিজেকে অর্পণ করতে গিয়ে ব্যক্তিজীবনের সুখ-সাচ্ছন্দ্য-স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে, 'অসামাজিক' বলে নিন্দিত হতে হয়েছে হাজার হাজার নারীর।

সেই তুলনায় বাঙালি নারীবাদকে টপকাতে হবে আরও অসংখ্য বাঁধা! আচার-অনাচারের বাঁধা, কথিত মূল্যবোধের বাঁধা, ধর্মীয় অনুশাসনের বাঁধা, পুরুষতান্ত্রিক স্বার্থের বাঁধা, অথর্ব কোমড় ভাঙা রাষ্ট্রটির বাঁধা, বাঙালি জাতিসুলভ আড়ষ্টতার বাঁধা! আরও কতো কী!

'মক্কা' যত দূরেই হোক, এই সকল বাঁধা পেরিয়ে বাঙালি নারীবাদীরা নারীবাদকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেবেন -এই আশীর্বাদ রইলো।


  • ৪৫৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

হাসানুর রহমান

জাপান প্রবাসী।