আরবে নারীকর্মীঃ শ্রমের আড়ালে যৌন সন্ত্রাস

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৩১, ২০১৯ ১২:৫৮ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা শুরু করতে চাই।

গত ০৮ জুলাই তারিখে দৈনিক যুগান্তর বলছে যে, ‘সৌদি আরবের রিয়াদ প্রবাসী গৃহকর্মী বিলকিস বেগমের (৩৩) লাশ পাওয়া গেছে মরুভূমিতে। রিয়াদের নিকটবর্তী পাহাড়ি এলাকার মরুভূমিতে তার লাশ পাওয়া যায়’।

ডেইলি স্টার জানাচ্ছে, এ বছরের ২০ জানুয়ারি তারিখে এক রাতেই অন্তত ১২৮ জন নারী গৃহকর্মী শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছেন। 

বিবিসি বাংলা এই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক প্রতিবেদনে বলছে, বাবা এবং ছেলের উপর্যুপরি ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভধারণ করেন এক নারী গৃহকর্মী। কোলে এক কন্যাশিশু নিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। একই প্রতিবেদনে উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হচ্ছে গত বছর ১৩শ'র বেশি নারী শ্রমিক পালিয়ে দেশে চলে এসেছেন। যাদের মধ্যে অন্তত ৫ জন ধর্ষণের কারণে গর্ভবতী ছিলেন। কিন্তু এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে কেননা বেশিরভাগই এই তথ্য চেপে রাখেন।

 

ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের পরিসংখ্যান মতে ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত  ৩ হাজার ৭৯৩ জন নারী শ্রমিক প্রবাসে মৃত্যুবরণ করেছেন। যার মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছেন সৌদি আরব এবং আরব দেশগুলোতে। এই চিত্র শুধুমাত্র সৌদি আরবে নয়, আরব অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোতেও একই পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার মত দেশ আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে নির্যাতনের অভিযোগে।

এই ঘটনাগুলোর পেছনের কারণ কী? সমস্ত আরব অঞ্চলের সাম্প্রতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বিপুল তেল এবং খনিজ সম্পদ আবিষ্কারের ফলে বর্বর বেদুইন অধ্যুষিত আরব দেশগুলোর অর্থনীতির যে উল্লম্ফন ঘটেছে, তার ফলে দুনিয়াজুড়ে বিশেষত দরিদ্র মুসলিম দেশগুলোতে ছড়ি ঘোরানোর যে সুযোগ বেদুইনরা পেয়েছে সেটা তারা হাতছাড়া করতে চায় না। গত শতকের ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশ থেকে বহু শ্রমিক আরবে গিয়েছে। এদেশের শ্রমিকের রক্ত-ঘামের উপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের চাকচিক্যময় আরব। বিনিময়ে কী পেয়েছে? শ্রমিক হিসেবে প্রাপ্য সম্মানী বা সম্মান তো দূরে থাক নুন্যতম মানবিক মর্যাদাও পায় নি।

অত্যাচারিত-নির্যাতিত পুরুষ শ্রমিকেরা তবুও মুখ বুজে সয়েছে কখনো সাহসের অভাবে কখনো ‘নবীর দেশের মানুষ’ বলে। কিন্তু মুসলমানের দেশে মুসলমান নারীদের যখন দিনের পর দিন নির্যাতন করা হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে তখন নবীর দেশের কথা মনে থাকে না। এখানে বাঙালির মনস্তত্ত্ব বোঝা কঠিন। আজ এমন নির্যাতন যদি ইউরোপ-আমেরিকায় হতো, তাহলে কি আমাদের মর্দে মুজাহিদগণ চুপ করে বসে থাকতেন? আরব দেশ বলেই, মুসলমানের দেশ বলেই আজ তাদের চোখে ছানি পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব কিংবা অন্যান্য আরব দেশে বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী পাঠানো স্রেফ তাদেরকে ধর্ষণের দিকে ঠেলে দেয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। যে দেশ তার নিজের দেশের নারীদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় না, নিজের দেশের নারীদের বস্তায় পুরে ঘরে বন্দি করে রাখে তারা অন্য দেশের নারী কর্মীর প্রতি কেমন আচরণ করবে সেটা আন্দাজ করা কঠিন নয়। ভালো অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছে এমন কোন নারী কর্মীর উদাহরণ পাওয়া কঠিন।

দেশে দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে হেরে গিয়ে বিদেশে গিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতনের শিকার হয়ে এদেশের নারী শ্রমিকরা অন্তত দুটো বিষয় প্রমাণ করেছেন। এক, সরকার উন্নয়ন, পার ক্যাপিটা আয়ের যে ফাঁপা বেলুন আমাদের সামনে ঝুলিয়েছে তার অসারত্ব উন্মোচন। দুই, আরব দেশগুলোর তেল বেচা অর্থনীতির ঝুটাফাটা খেয়েপরে নিজেদের আখের গোছানো। তাতে দেশের সাধারণ শ্রমিকরা রসাতলে যাক তাতে আমাদের সরকার এবং আমলাতন্ত্রের কিছু আসে যায় না। বাংলাদেশে প্রতি বছর সালাফিবাদ, উগ্র মৌলবাদ প্রচারে প্রসারে সৌদি সরকার যে পরিমাণ পয়সা খরচ করে তাতে ভাগ বসাতে চাইলে তো এসব নারী শ্রমিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করা যায় না। প্রতিবাদ করতে হলে যে সততা থাকতে হয় সেটা আমাদের সরকারের নেই।

সুতরাং আরব দেশগুলোয় বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের আশুমুক্তি ঘটবে বলে মনে হচ্ছে না।


  • ২৩০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ঘুণপোকা

এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা