ইজ্জত হারানো নারী সমাজের ইজ্জতের জন্য হুমকি স্বরূপ

সোমবার, জুলাই ৬, ২০২০ ৫:২৬ AM | বিভাগ : আলোচিত


কোলকাতার একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করে তিনজন অল্পবয়সী মেয়ে। ব্যস্ত জীবন থেকে পালিয়ে একদিন অবকাশে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। সেই অবকাশ হবে সমুদ্রতটে। বালুকাবেলায় হাটবে তারা, গলা খুলে গান গাইবে, দুচোখ ভরে সাগর দেখবে, প্রাণভরে সমুদ্রস্নান করবে। এর জন্য গোপালপুরের দিকে রওনা দেয় তারা। মেয়েগুলোর জন্য এই ভ্রমণটা হবার কথা ছিলো জীবনের শ্রেষ্ঠতম আনন্দের একটা মুহুর্ত। তার বদলে হয়ে ওঠে ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্নের। এদের মধ্যে একজন, যার নাম ঊর্মিলা, তার জীবনটা ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ এক ঊর্মিমালায় পরিণত হয় এই ভ্রমণে যাবার পর থেকে।

সাগরে স্নান করে শুদ্ধ আনন্দে ভাসার কথা ছিলো ঊর্মিলার। তার বদলে এই সাগরের পানিতেই চারজন বখাটে তরুণের দ্বারা ধর্ষিত হয় সে। সৈকত থেকে ধরে মুখে টেপ লাগিয়ে সাগরের পানিতে চুবিয়ে ধর্ষণ করে তারা তাকে। ক্ষত-বিক্ষত ঊর্মিলার রক্ত মিশে যায় সাগরের পানিতে। তার যন্ত্রণাকাতর চিৎকার আটকে পড়ে মুখে লাগানো টেপে। ঘটনাটা ঘটে প্রকাশ্য দিবালোকে। চার বখাটে ধর্ষণটা এমনভাবে করেছিলো যে আশেপাশে স্নানরত আরো লোকজন থাকার পরেও কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। ধর্ষণ শেষে মৃতপ্রায় ঊর্মিলাকে বালুকাবেলায় ফেলে রেখে চার ধর্ষক সরে পড়ে। হাসপাতালে দীর্ঘ আটাশ ঘণ্টা পরে জ্ঞান ফেরে তার।

এই এক ঘটনায় পালটে যায় ঊর্মিলার পরিচিত জীবন। সে হয়ে ওঠে পত্রিকার মুখরোচক খবর। রগরগে ভাষায় সেখানে বর্ণনা করা হয় তার ধর্ষণের ঘটনা। নিস্তরঙ্গ এক জীবন থেকে অশান্ত এবং ঘূর্ণিময় এক ঊর্মিমালার মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খেতে থাকে ঊর্মিলা। সমাজের ভদ্রতার মুখোশ খসে পড়তে থাকে তার সামনে একে একে। আত্মীয়স্বজনেরা বিব্রত এবং লজ্জিত হয় তার কলঙ্কের কাহিনি শুনে। যে স্কুলে চাকরি করতো ঊর্মিলা, তারাও পদক্ষেপ নেয় তাকে চাকরীচ্যুত করার। বড় বড় আদর্শের বুলি কপচানো তার তথাকথিত প্রগতিশীল প্রেমিকও তাকে ছেড়ে চলে যায়। অথচ এই বিপর্যস্ত সময়ে ঊর্মিলার তাকেই পাশে দরকার ছিলো সবচেয়ে বেশি। তাকে শুধু একা নয়, তার বাবাও হেনস্থা হতে থাকে প্রতি পদে পদে। তার মেয়ে কেমন আছে এই প্রশ্নের আড়ালে চলতে থাকে লালসাপূর্ণ কদর্য সব ইঙ্গিত। এই সমস্ত অশালীন ইঙ্গিতময় প্রশ্নের উত্তর যাতে না দেওয়া লাগে মুখে, সেকারণে ভদ্রলোক তাঁর টেবিলে বড় বড় করে লিখে রাখতে বাধ্য হন যে তাঁর ধর্ষণের শিকার কন্যা ভালো আছে।

একটা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে সমাজ তাকে কোন চোখে দেখে, সেটা ঊর্মিলার বাবা খুব ভালো করেই জানতেন। এ কারণে তিনি শুরুতে মামলা করার ব্যাপারে অনীহা দেখিয়েছিলেন। তিনি জানতেন মামলা করার পরে ঊর্মিলার জীবন কতোখানি বিষিয়ে দেবে এই সমাজ। গোপালপুর থানার অফিসার ইন-চার্জ গোবিন্দবাবু তার মতামত পরিবর্তন করতে বাধ্য করেন। ট্রেনে যখন ঊর্মিলারা আসছিলো গোপালপুরে, সাধারণ পোশাকে তখন তিনিও ছিলেন সেই কামরায়। ঊর্মিলার চার ধর্ষকও একই ট্রেনের পাশের কামরায় ছিলো। মদ্যপ চার তরুণ এই মেয়েদের উত্যক্ত করা শুরু করলে তিনি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সেই সময়। ট্রেনের মধ্যে ঊর্মিলাদের বাঁচাতে পারলেও, তাঁর নিজের এলাকাতে তিনি তাকে রক্ষা করতে পারেননি।

পুলিশ অফিসার গোবিন্দ ঠ্যাঙারে গোবিন্দ নামে পরিচিত। বন্দি আসামীদের অপ্রচলিত এবং আইন-বহির্ভূতভাবে অত্যাচার করে স্বীকৃতি আদায়ের কুখ্যাতি তার রয়েছে। এজন্য বহুবার শো-কজ হয়েছে তার নামে, অনেক বার সাসপেন্ড হয়েছেন তিনি। নানা জায়গাতেও বদলিও করা হয়েছে তাঁকে আইন ভঙ্গ করে নিজের হাতে আইন তুলে নেবার জন্য।

ঊর্মিলার ধর্ষণের ক্লু-বিহীন কেসের সমাধানে এগিয়ে আসেন ঠ্যাঙারে গোবিন্দ। একগুঁয়ে ভাবে লেগে থেকে অপ্রচলিত উপায়ে ধর্ষকদের সনাক্ত করে ফেলেন তিনি। শুধু সনাক্ত করাই নয়, এরা যখন গোপালপুর থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলো, তাদেরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন তিনি।

ঘটনা গড়ায় আদালতে। ধর্ষণের চেয়েও মারাত্মক বিভীষিকা এখানে অপেক্ষা করে ছিলো ঊর্মিলার জন্য। আমাদের আদালতগুলো যে প্রক্রিয়ার ধর্ষণের মামলা চালায়, সেটা ধর্ষণের শিকার নারীকে আরো অসংখ্যবার ধর্ষণের শিকার হবার তীব্র বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা এবং চরম অপমানের মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে যায়। বিপক্ষ উকিলের নোংরা সব প্রশ্নবাণ, কুৎসিত ইঙ্গিত, অসংখ্য উৎসুক পুরুষ দর্শক, মিডিয়া কভারেজ, এগুলো ধর্ষণের শিকার নারীকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেবার জন্য যথেষ্ট। ঊর্মিলার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। সেই সাথে এই কেসও দুর্বল হয়ে পড়ে পুলিশ অফিসার ঠ্যাঙারে গোবিন্দের অতীত রেকর্ডের কারণে। ফরেনসিক রিপোর্টের কারণে শেষ রক্ষা হয় কোনো ক্রমে। তা না হলে ধর্ষকদের বের হয়ে যাওয়াটা ছিলো সময়ের ব্যাপার মাত্র। আদালতে ধর্ষকদের দশ বছরের শাস্তি হয়, যেটা উচ্চ আদালতে আপিল যোগ্য।

যে কাহিনি এতোক্ষণ বললাম, সেটা তপন সিংহ পরিচালিত চলচ্চিত্র 'আদালত ও একটি মেয়ে'-র। চলচ্চিত্রটা মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৮২ সালে। সে বছর সেরা চলচ্চিত্রের মর্যাদা পায় এটি। এতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তনুজা, মনোজ মিত্র, দেবীকা মুখার্জী এবং নির্মল কুমার। ১৯৮২ সালের হলেও এই চলচ্চিত্রের প্রাসঙ্গিকতা এখনো কমেনি এক বিন্দুও। কারণ, ধর্ষণ নিয়ে আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, আমাদের সমাজের যে মানসিকতা, সেটার পরিবর্তন হয়নি সামান্যতমও আজো। রয়ে গেছে সেই এই ধরনের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা, যেখানে ধর্ষণের শিকার যে, তাকেই আমরা দোষী সাব্যস্ত করে তার জীবনটাকে তছনছ করে দিতে উদ্যত হই।

আমাদের দেশে একটা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হবার পর থেকে আদালত পর্যন্ত যাওয়া, সেখানে লড়াই করাটা যে কতোখানি কঠিন একটা কাজ, সেটা এই চলচ্চিত্রটা দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'দহন' ছবিতেও এর কিছুটা চিত্র উঠে এসেছে।

ধর্ষণের ফলাফল বড়ো ভয়াবহ এবং ভয়ংকর হয় নারীদের জন্য। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ধর্ষিত হওয়াটা নারীর কাছে মৃত্যুর চেয়েও মারাত্মক কিছু। ধর্ষিত হবার গভীর বেদনা এবং অনন্ত অপমানে অন্তহীন এক অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় একজন নারী। এই চরম তিক্ত অভিজ্ঞতা এক লহমায় তাকে ছুড়ে ফেলে দেয় তার পরিচিত সমাজের বৃত্তের একেবারে বাইরে। সে যেনো তার এই চিরচেনা সমাজের আর কেউ নয়। তার পরিবার আর তার পরিবার থাকে না। বাবা-মা, ভাই-বোন আত্মীয়স্বজন সবাই পর হয়ে যায় ধর্ষণের শিকার নারীর কাছে।

সমাজ আর কিছু বুঝুক বা না বুঝুক, নারীর ইজ্জত ঠিকই বোঝে। ধর্ষণের শিকার নারীটি তাদের চোখে ইজ্জত হারানো এক নারী। ইজ্জত হারানো নারী সমাজের ইজ্জতের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাকে দেখা হয় তখন ভিন্ন চোখে। সেটা অবশ্যই মমতা মাখানো কোনো চোখ নয়। তাকে দেখা হয় অশ্রদ্ধার চোখে। হীন দৃষ্টি লেগে থাকে সর্বক্ষণ তার শরীরে। সু-ব্যবহারটাও জোটে না তার কপালে, বিচার তো অনেক দূরের ব্যাপার। এ যেনো আরেক ধর্ষণ। ধর্ষিণের শিকার নারী মমতা পাবার পরিবর্তে, করুণা পাবার পরিবর্তে সমাজের হাতে বারবার ধর্ষণের শিকার হয়। একারণেই আমাদের সমাজে বহু ধর্ষণের শিকার নারী চেপে যায় তাদের ধর্ষণের কথা। যদি বা কখনো জানাজানি হয়ে যায়, খুব একটা সুখকর হয় না তা তার জন্য। বিচার পাবার পরিবর্তে যে পরিমাণ অপমান এবং নিগ্রহ তার জন্য বরাদ্দ থাকে, সেটাকে হজম করা সম্ভব হয় না সবার জন্য। ফলে, এর থেকে মুক্তির উপায় হিসাবে অনেক মেয়েই আত্মহত্যার মতো চরমপন্থা বেছে নিতেও বাধ্য হয়।

 


  • ৩০৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা