যে অনুভূতি এতো ঠুনকো তার টিকে থাকার দরকার নাই

মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২, ২০১৯ ১:৪৮ AM | বিভাগ : আলোচিত


ভোলার ঘটনা ইতোমধ্যেই আপনারা সবাই জেনে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আল্লাহ ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে ‌বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক ব্যক্তির বিচারের দাবিতে ঈদগাহ মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেছিলো 'তৌহিদী জনতা'। এ সমাবেশের জন্য পুলিশ অনুমতি দেওয়ার আগেই তারা মাইকিং করে। পরে সমাবেশের জন্য পুলিশ অনুমতি না দিলেও সকাল থেকে থেকে লোকজন মাঠে জড়ো হতে থাকে। মিছিল করতে না পেরে সেখানেই অবস্থান শুরু করে তারা। উত্তেজনা থেকে এক পর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ গুলি ছুড়লে চারজন তৌহিদী’ জনতা নিহত হয়। পুলিশ দাবি করেছে, উত্তেজিত লোকজন পুলিশের ওপর হামলা করলে তারা গুলি করতে বাধ্য হয়। পুলিশের দাবি যে সঠিক, সেটা এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা একমত হতে বাধ্য হবেন। 'তৌহিদী জনতা' যে ভয়ংকর রুদ্র রোষ দেখিয়েছে, সহিংস আচরণ করেছে এবং ভয়ংকর তাণ্ডব ঘটিয়েছে, সেটা দেখলে ভয়ে আতঙ্কে হিম হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

মজার বিষয় হচ্ছে, বিপ্লব চন্দ্র শুভ নিজে তার ফেসবুকে কিছুই লেখেনি। তার আইডি হ্যাক হয়েছিলো এবং সেই আইডি থেকে ইনবক্সে নবী এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে কটুক্তি করা হয়। এক হ্যাক আইডির বক্তব্যেই তৌহিদি জনতার ধর্মানুভূতি এমনই আহত হয়েছিলো যে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করে বিপ্লব শুভ-র বিচার দাবি করে। যার পরিণতি চারটে তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছে অকালে।

বিপ্লব শুভ-র আইডি হ্যাক হয়েছে কিনা, কিংবা হয়নি, এ নিয়ে আমি ডিফেন্ড করতে যাবো না। ধরা যাক, তার আইডি হ্যাক হয়নি। বিপ্লব শুভ নিজেই এগুলো লিখেছে। তারপরেও কি ‘তৌহিদী’ জনতা এই কাজটা করতে পারে? এর স্পষ্ট উত্তর হচ্ছে, না, পারে না। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো ধর্মকে রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে পৃথক করে রেখেছে। ধর্ম একটা বায়বীয় জিনিস। কোন জিনিসে কার অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হবে, সেটা বলা মুশকিল। ফলে, সেখানে আঘাত এলেই তারা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মানুষের বিচার আচার করা শুরু করে, তবে, মধ্যযুগের ইউরোপের সেই বর্বর ইনকুইজিশন প্রথা ফিরে আসবে আবার।

যে কোনো অজুহাতে যে কাউকে শাস্তি দিয়ে ফেলবে ‘তৌহিদী’ জনতা। এটা খুবই আশংকার এবং আতংকের একটা বিষয়। সভ্য একটা রাষ্ট্র ধর্মানুভূতির মতো বায়বীয় একটা অনুভূতিকে গুরুত্ব দেবার কথা না। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, আমরা এটা দিতে শুরু করেছি। দিতে শুরু করেছি বলে এখন কথায় কথায় ‘তৌহিদী’ জনতা জেগে উঠছে। ফেসবুকের সামান্য সব ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশে তীব্রভাবে আহত হচ্ছে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি। আর, আর জেরে নানা ধরনের তান্ডব চালাচ্ছে তারা। এর আগেও রসরাজ নামের একজন লোকের ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

আমি আগেই বলেছি, ধর্মানুভূতি একটা বায়বীয় জিনিস। পৃথিবীতে অসংখ্য ধর্ম আছে, সেই সব ধর্মে আবার নানা ধরনের গোত্র, উপগোত্র রয়েছে। কার কোনটাতে আঘাত লাগছে, এটা বলা মুশকিল। একজন খাঁটি মুসলমানের মন্দির দেখে অনুভুতি আহত হতে পারে, একইভাবে একজন গোঁড়া হিন্দুর মসজিদের আজান শুনলেও গায়ে এলার্জি তৈরি হতে পারে। যে জিনিস সুনির্দিষ্ট না, আঘাতের পরিমাপ করার জন্য সুস্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট কোনো পরিমাপক নেই, সেটাতে আঘাত লেগেছে এই অজুহাতে কাউকে ভয়-ভীতি দেখানো, কিংবা শাস্তির ব্যবস্থা করাটা যৌক্তিক কোনো কাজ নয়। হুমায়ুন আজাদ তাঁর ধর্মানুভূতর উপকথা প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “ধর্মানুভূতিতে যে আঘাত লেগেছে, তা যে আহত হয়েছে, তা বোঝার ও পরিমাপ করার কোনো উপায় নেই। অযৌক্তিক ব্যাপারকে যুক্তির সাহায্যে পরিমাপ করা যায় না। বিভিন্ন সমাজ ও রাষ্ট্র এখন যেভাবে চলছে, তাতে প্রতিটি ধার্মিকের ধর্মানুভূতি প্রতিমুহূর্তেই আহত হ’তে পারে, এবং হচ্ছে । “

মানুষ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটা প্রাণী। তাঁর অসংখ্য অনুভূতি রয়েছে। সেগুলোতে প্রতিমুহুর্তে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। কিন্তু, কখনোই শুনবেন না, সেগুলো আহত হবার অভিযোগে কেউ অন্যের ক্ষতি করতে কিংবা শাস্তি বিধান করতে মাঠে নেমে এসেছে। যতো সমস্যা হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে এই একটা অনুভূতি। হাটতে, চলতে, ফিরতে, সবকিছুতেই আঘাত লাগে এর। সেই আঘাতে ব্যথা পায় সে। ব্যথা কোঁ কোঁ করে সে, রাগে ফুঁসে ওঠে। সেই কবে কোন কালে দাউদ হায়দার এক কবিতা লিখেছিলো, সে বুকে ভীষন আঘাত পেয়ে গিয়েছিলো। সেই আঘাত এখনো সারেনি তার। তসলিমা নাসরিন এক উপন্যাস লিখেছিলো, অনুভূতি মিয়া একেবারে মহা আহত হয়ে পড়ছিলো। আরিফ নামের একটা ছেলে একটা কার্টুন এঁকেছিলো, সেটা দেখে সে একেবারে সটান শয্যাশায়ী হয়ে পড়লো। এই যে আমি এই লেখাটি লিখছি আমি নিশ্চিত এতেও অনেকের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগবে।

যে অনুভূতি এতো ঠুনকো, টোকা লাগলেই শুয়ে পড়তে চায়, তার কি টিকে থাকার আদৌ কোনো দরকার আছে? যে অনুভূতিতে এতো সামান্যতেই আঘাত লাগে তাকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়াটাই কি যুক্তি সঙ্গত নয়? তা না আজগুবি এই মহা নাজুক অনুভূতিকে আশ্রয় এবং প্রশ্রয় দেবার জন্য রাষ্ট্র এবং সমাজ উঠে পড়ে লেগেছে। আর তার সুযোগ নিয়েই এই অনুভূতির ধারকেরাও প্রতি পদে পদে তাদের অনুভুতিতে আঘাত লাগছে, অনুভূতিতে আঘাত লাগছে বলে হইচই করে হুটহাট নালিশ জানাচ্ছে, অন্যদের উপর আক্রমণ করছে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে মানুষের বাক-স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে, একদিন মন খুলে কথা বলতেও ভয় পাবে মানুষ, লেখাতো অনেক দূরের কথা। হুমায়ুন আজাদ যেমন লিখেছেন, “ধর্মানুভূতি কোনো নীরিহ ব্যাপার নয়, তা বেশ উগ্র; এবং এর শিকার অসৎ কপট দুর্নীতিপরায়ণ মানুষেরা নয়, এর শিকার সৎ ও জ্ঞানীরা; এর শিকার হচ্ছে জ্ঞান। জ্ঞানের সাথে ধর্মের বিরোধ চলছে কয়েক সহস্রক ধ’রে, উৎপীড়িত হ’তে হ’তে জয়ী হচ্ছে জ্ঞান, বদলে দিচ্ছে পৃথিবীকে; তবু আজো পৗরাণিক বিশ্বাসগুলো আধিপত্য করছে, পীড়ন ক’রে চলছে জ্ঞানকে। ধর্মানুভূতির আধিপত্যের জন্যে কোনো গুণ বা যুক্তির দরকার পড়ে না, প্রথা ও পুরোনো বই যোগায় তার শক্তি, আর ওই শক্তিকে সে প্রয়োগ করতে পারে নিরঙ্কুশভাবে।”

একটা সুস্থ, সুন্দর, ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রগতিশীল দেশ গড়ার পিছনে এগুলো মারাত্মকভাবে অন্তরায়। মানুষকে নিরন্তর ভীতির মধ্যে রেখে আর যাই হোক, সামনের দিকে এগোনো যায় না, আলোর পথে হাটা যায় না, অন্ধকারকে দূর করা যায় না। বরং চারপাশের অন্ধকার ধেয়ে আসে সুযোগ পেয়ে, গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকে জমাট বাঁধা অন্ধকার। আজকের বাংলাদেশ সেই অন্ধকারের দিকেই হাটছে চোখ বন্ধ করে একগুঁয়ের মতো।


  • ২২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা