দ্যা ফার্স্ট সেক্স

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩, ২০১৯ ৭:২১ PM | বিভাগ : আলোচিত


সিমোন দা বোভোয়ার তাঁর ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ বইতে নারী কী, এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, ক্রমশ নারী হয়ে ওঠে। এই বইটা প্রকাশ হয়েছিলো ১৯৪৯ সালে। বোভোয়ার বিশ্বাস করতেন, নারী হচ্ছে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক শক্তিসমূহেরর সৃষ্টি। এ কারণে তিনি নারীকে দ্বিতীয় লিঙ্গ বলেছেন। প্রথম লিঙ্গ হচ্ছে পুরুষ।

বোভোয়ার যখন এই কথাগুলো লিখেছিলেন, সেই সময়টা এখন আর নেই। পাল্টে গেছে অনেক কিছুই। বৈজ্ঞানিক গবেষণাসমূহে দেখা যাচ্ছে, প্রাকৃতিকভাবেই নারী এবং পুরুষ মৌলিকভাবে আলাদা। সমাজ তাদেরকে নারী বা পুরুষে পরিণত করে না। লক্ষ লক্ষ বছর নারী এবং পুরুষ ভিন্ন ধরনের কাজ করেছে। যেগুলোর জন্য ভিন্ন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হয়েছে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে নারী এবং পুরুষের মস্তিষ্কে পার্থক্য তৈরি হয়ে গিয়েছে বিবর্তনের ফলশ্রুতিতে। সামাজিক শক্তিসমূহ নারীকে নারী করছে না, বরং একজন নারী জন্মই নিচ্ছে আসলে নারী হয়ে।

কৃষি ব্যবস্থা আবিষ্কারের আগে, শিকারি-সংগ্রাহক সময়ে অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে নারীর অবস্থান পুরুষের সমতুল্য না হলেও যথেষ্ট ভালো ছিলো। বৈষম্যটা এতো প্রকট ছিলো না। আফ্রিকার সাভানাতে পুরুষেরা শিকার করতো, আর নারী মূলত ফলমূল, শাক-সবজি সংগ্রাহকের কাজ করতো। এই কাজটাও খুব সহজ কোনো কাজ ছিলো না। এর জন্য বাচ্চা-কাচ্চাকে অন্যের কাছে রেখে তাদের দূর-দূরান্তেও যেতে হতো। এডওয়ার্ড ও উইলসন এই সময়ের পরিবারকে ডাবল-ইনকাম পরিবার বলে উল্লেখ করেছেন, যেখানে নারী এবং পুরুষ দুজনকে পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলো।

কৃষি বিপ্লবের পরে অর্থনীতিতে একক আধিপত্য এসে যায় পুরুষের হাতে। জমি পরিষ্কার করা, চাষ করা, সেখানে শস্য জন্মানো, সবকিছুই করে পুরুষ। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্যও দখলে এসে যায় তার। পুরুষ হয়ে ওঠে যোদ্ধা, পরিবারের কর্তা, সমাজের নিয়ন্ত্রক এবং রাষ্ট্রের প্রধান। নারী রুদ্ধ হয়ে যায় চার দেয়ালের মাঝে, অবনমিত হয় দ্বিতীয় লিঙ্গে।

শিল্প বিপ্লব এই অবস্থা থেকে মুক্তির সুযোগ এনে দেয় নারীকে। শিল্প বিপ্লবের ফলে যে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি হয়, সেটা নারীকে আবার নিয়ে আসে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে। কৃষি বিপ্লবের আগে যে অর্থনৈতিক মুক্তি তাদের ছিলো, সেটাই আবার ফিরে আসে এই নতুন সমাজ ব্যবস্থা। যতো দিন যাচ্ছে, শুধু পাশ্চাত্যে নয়, প্রাচ্য এবং অন্যান্য অনুন্নত অংশেও নারী এগিয়ে আসছে অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে।

বিবর্তনের দীর্ঘ পথচলায় নারী এবং পুরুষ যেহেতু ভিন্ন ধরনের কাজ করেছে এবং সেই কাজ করতে ভিন্ন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হয়েছে, সে কারণে তাদের মস্তিষ্কেও পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ভাষাগতভাবে নারী পুরুষের তুলনায় দক্ষ। অঙ্গ-ভঙ্গি, মুখের ভাবসহ নানা ধরনের অব্যক্ত চিহ্নগুলো নারীরা পুরুষের তুলনায় অনেক ভালোভাবে পড়তে পারে। নারীর আবেগগত স্পর্শকাতরতা, অন্যের প্রতি মায়ামমতা, স্বাদ, স্পর্শ, গন্ধ এবং শ্রবণশক্তি পুরুষের চেয়ে বেশি। একই সাথে অনেক বেশি বিষয় নিয়ে চিন্তা করা বা কাজ করার দক্ষতাও নারীর বেশি। যে কোনো সমস্যার সার্বিক দিক দেখতে পায় তারা, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাতেও পুরুষের চেয়ে তাদের দক্ষতা বেশি। নেটওয়ার্কিং, সহযোগিতা এবং দরকষাকষিতেও পারদর্শী তারা।

এর বিপরীতে পুরুষেরও ভিন্ন ধরনের দক্ষতা তৈরি হয়েছে। পারিপার্শ্বিক ভৌগলিক অবস্থা, ম্যাপ রিডিং এর পুরুষের দক্ষতা অপরিসীম। জটিল মেকানিক্যাল সমস্যার সমাধান পুরুষ নারীর চেয়ে অনেক ভালোভাবে করতে পারে। কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা, নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাতে পুরুষের কার্যকারিতা নারীর চেয়ে বেশি।

জরায়ুতে ভ্রূণ যখন জন্ম নেয়, তখন সেটা থাকে না পুরুষ, না নারী। ভ্রূণটা যদি ছেলে বাচ্চা হয়, তবে আট সপ্তাহের দিকে ওয়াই ক্রোমোজোম এক্টিভেটেড হয়। এর প্রভাবে সেক্স অর্গান জন্ম নিতে থাকে পুরুষ হরমোন তৈরি হতে থাকে, যেটা পুরুষাঙ্গ তৈরি করে। এটা পরবর্তীতে মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলে। ভ্রূণ পুরুষে পরিণত হয়।

অন্যদিকে ভ্রূণ যদি মেয়ে বাচ্চাতে পরিণত হবার দিকে এগোয়, তবে কোনো পুরুষ হরমোন এর উপরে কাজ করে না। বিনা বাধায় এটি নারীতে পরিণত হয়। এ কারণে বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, নারীই হচ্ছে মূলত ডিফল্ট প্লান। ওয়াই ক্রোমোজোম এটাকে চেঞ্জ না করলে সব ভ্রূণই নারী হয়েই জন্ম নিতো। হেলেন ফিশার এই তথ্যকে দেখেছেন তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে। তাঁর কাছে নারী হচ্ছে প্রাইমারি সেক্স, প্রথম লিঙ্গ। আর সে কারণে সিমোন দা বোভোয়ার যেখানে বই লিখেছেন ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ শিরোনামে, এর বিপরীতে গিয়ে তিনি তাঁর বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘দ্য ফার্স্ট সেক্স’।

হেলেন তাঁর বইতে দেখিয়েছেন বিবর্তন নারীর মস্তিষ্ককে ‘ওয়েব থিংকিং’ বা ‘সিন্থেসিস থিংকিং’ এর জন্য তৈরি করে দিয়েছে। নারীর বিপরীতে পুরুষের চিন্তাভাবনা হচ্ছে সরলরৈখিক বা সিঁড়ির ধাপের মতো। নারী-পুরুষের মস্তিষ্কের এই ভিন্ন ধরনের চিন্তার প্যাটার্ন আজকের যুগে এসে ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীর জন্য অনন্ত এক সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যই নয়, নারীর অন্য যে দক্ষতাগুলো আছে, তার অপেক্ষাকৃত ভালো ভাষিক দক্ষতা, রোগ-ব্যাধিতে যত্ন নেবার সক্ষমতা, সহনশীলতা, এগুলো মেডিসিন, শিক্ষা, যোগাযোগ, আইন, সরকার এবং পুলিশ ওয়ার্কে তাকে তার বিপরীতপক্ষ পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ্য করে তুলেছে। আধুনিক যুগে যে সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে, তার জন্য নারীর মস্তিষ্কের যে দক্ষতাগুলো ইনবিল্ট রয়েছে, সেগুলোই বেশি দরকার। ফলে, এই যুগ হচ্ছে নারীর জন্য এক অনন্ত সম্ভাবনার যুগ, পুরুষকে টপকে চলে যাবার যুগ।

হিমবাহ যেমন চলার পথে পালটে দিতে থাকে ভৌগলিক চিত্রকে, আজকের এই যুগে নারীরাও ধীরে ধীরে বিশ্বের সব ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক প্রথাসমূহকে পাল্টে দিচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন এক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থা। হেলেন ফিশারের ভাষায়, ‘টুমরো বিলংস টু উইমেন।’ আমি বা আপনি মানি আর না মানি, পছন্দ করি আর না করি, হেলেনের বক্তব্যই সত্যি হতে যাচ্ছে।। আসন্ন সময়টা, আগামী যুগটা হতে যাচ্ছে নারীদের যুগ, প্রথম লিঙ্গের যুগ।


  • ৩৪৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা