প্রকৃত ধর্ষক হচ্ছে পিতৃতন্ত্র

বুধবার, জানুয়ারী ৮, ২০২০ ২:৫৫ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


বাংলাদেশের পত্রিকার পাতা উল্টালে এক বা একাধিক ধর্ষণের ঘটনার উল্লেখ থাকবে না, এটা হতেই পারে না। কিছুদিন পরপরই কোনো না কোনো ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে আলোড়িত হয়ে পড়ে আমাদের সমাজ। এখন যেমন হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর ধর্ষণের শিকার হবার কারণে। এই সমস্ত ঘটনার পরে বিচার চাওয়া হয়, মানব বন্ধন করা হয়, প্রতিবাদ মিছিল কিংবা মিটিং করা হয়। তারপর সবকিছু শান্ত হয়ে আসে। কিছুদিন পরেই আবার অশান্ত হয়ে ওঠে নতুন কোনো ধর্ষণের ঘটনায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশটা এমন এমন ধর্ষণপ্রবল কেনো? কেনো দুই লিঙ্গের মধ্যে একটা এমন আক্রমণাত্মক, আর অন্যটা তার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত? ধর্ষণের ভয় মনের মাঝে নিয়ে প্রতিমুহুর্তে চলতে হয় নারীকে। রাত তো বাদই দিলাম, দিনের আলোও নিরাপদ নয় তার জন্য। তার গতিবিধি সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় প্রবল ভয়ে। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকারটুকু পর্যন্ত তার নেই। হিংস্র পশুর কারণে এরকম নিরন্তর ভয়ে একমাত্র বনের নিরীহ পশু-পাখিরাই বসবাস করে। আমাদের সমাজে হিংস্র পশু নেই, সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে একদল হিংস্র মানুষ। আর এদের ভয়ে নারী সর্বদা আতঙ্কিত, জড়োসড় এবং পাখির মতো খাঁচাবন্দি। নিরন্তর ধর্ষণ ভীতির মধ্যে বসবাস করতে হয় বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটা নারীকেই। বাইরে বের হতে গেলে তাকে নানা-কিছু ভাবতে হয়, অপরিচিত জায়গায় যেতে গেলে পরিচিত কোনো পুরুষের পাহারার প্রয়োজন হয়। তাতেও যে নারীরা নিরাপত্তা পায়, তা নয়। বাবা-ভাই বা স্বামীর সামনে কিংবা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েও নারীকে ধর্ষণের নজির বাংলাদেশের সমাজে রয়েছে।

ধর্ষণ আসলে কমবেশি সব সমাজেই বিদ্যমান। এর নষ্ট জন্ম সেই অনাদিকালে। যার রূপ আমরা দেখি পৌরানিক কাহিনির মধ্যেও। গ্রিক পুরান থেকে শুরু করে ভারতীয় পুরান, সব জায়গাতেই ধর্ষক দেবতাদের জয় জয়কার। পরাশর, জিউস, এরা সব একেকজন ধর্ষণে পটু দেবতা। আজকের দিনে এই ধর্ষক দেবতাদের জায়গা নিয়ে নিয়েছে বীরপুঙ্গক পুরুষেরা। আমেরিকা বলেন, ইউরোপ বলেন, কিংবা আমাদের বাংলাদেশ বলেন, কোথাও নারী মুক্তি পাচ্ছে না ধর্ষণের হাত থেকে। তবে, এর মাঝেও কোনো কোনো সমাজ আছে, যেখানে ধর্ষণের মাত্রা কম। কোনো কোনো সমাজ আছে যেখানে ধর্ষণের পরিমাণ প্রবল। বাংলাদেশ এই দ্বিতীয় গোত্রের মাঝে পড়ে। ধর্ষণের মাত্রার এই কম-বেশি হওয়াটা নির্ভর করে সংস্কৃতির উপর। কোনো কোনো সমাজের সংস্কৃতি ধর্ষণকে নিরুৎসাহিত করে, আবার কিছু কিছু সমাজের সংস্কৃতি একে অনুপ্রাণিত করে, উৎসাহিত করে। হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘ধর্ষণ’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘পশ্চিম সুমাত্রা প্রায় ধর্ষণমুক্ত; সেখানে ধর্ষণকারী নিজেকে ছোটো করে, ছোটো করে তার আত্মীয়পরিজনকে। সেখানে সবাই পরিহাস করে তার পৌরুষকে; তার ভাগ্যে জোটে পীড়ন, কখনো মৃত্যু; অনেক সময় সে নির্বাসিত হয় গ্রাম থেকে, সেখানে সে আর ফিরে আসতে পারে না। কিছু সমাজ ধর্ষণপ্রবণ, যেমন বাঙলাদেশ।’

বাংলাদেশেও যে ধর্ষককে ভালো চোখে দেখা হয়, তা নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে ধর্ষকের সাথে সাথে ধর্ষিতাকেও সেই অপরাধ করার উস্কানিদাতা হিসাবে অনেক সময় চিহ্নিত করা হয়। ধর্ষণের জন্য কখনো দায়ী করা হয় তার পোশাককে, কখনো বা দায়ী করা হয় তার চালচলনকে, কখনো বা দায়ী করা হয় তার অসময়ে ঘরের বাইরে আসাকে। বিচার-সালিশ বসলে, ধর্ষকের সাথে সাথে ধর্ষিতারও বিচার হয়ে যায় প্রায়শই। বিচার পাবার পরিবর্তে তাকেও শাস্তি মাথা পেতে নিতে হয় ধর্ষকের মতোই। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, কখনো কখনো সেই শাস্তি ধর্ষকের শাস্তির চেয়েও পরিমাণে বেশি হয়ে যায়। ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে দেওয়া তো গ্রাম্য সালিশের একটা বহুল প্রচলিত নিয়মই বলা চলে। ধর্ষিতা নারীকে আর কেউ বিয়ে করতে আসবে না, ফলে তাকে বাঁচানোর জন্য গ্রাম্য সালিশের বিচারকেরা এই রকম অদ্ভুত রায় দিয়ে থাকে।

পুরুষ কেনো নারীকে ধর্ষণ করে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন পণ্ডিত ব্যক্তিরা বহু আগে থেকেই। সামাজিক বিজ্ঞানের বহু শাখার বহু বিদগ্ধ ব্যক্তি এ নিয়ে নানা গবেষণা করেছেন এবং শেষমেষ এটাই বলেছেন যে, ধর্ষণের জন্য একক কোনো কারণ দায়ী নয়, বরং অনেকগুলো কারণ একত্রিত হয়েই ধর্ষণের মতো নোংরা অপরাধটা সংঘটিত হয়ে থাকে।

এর মধ্যে নারীবাদী লেখকরা ধর্ষণের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ধর্ষণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা থেকে উদ্ভুত। সুজান ব্রাউনমিলার ধর্ষণের স্বরূপ দেখাতে গিয়ে দাবি করেন যে প্রকৃত ধর্ষণকারী কোনো ব্যক্তি নয়, প্রকৃত ধর্ষক হচ্ছে পিতৃতন্ত্র। তাঁর মতে ধর্ষণ পিতৃতন্ত্রের জন্যে দরকার; কেননা ধর্ষণ পিতৃতন্ত্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ নয়, ধর্ষণ পিতৃতন্ত্রকে বিপন্ন করে না; বরং কাজ করে পিতৃতন্ত্রের সেনাবাহিনীর মতো। পিতৃতন্ত্র ‘পৌরুষ’কে দেখে যে মুগ্ধ চোখে, আর পোষণ করে যে নারীবিদ্বেষ, তাতে গ’ড়ে ওঠে গণমনস্তত্ত্ব, যা উৎসাহিত করে ধর্ষককে। পুরুষের মধ্যে কেউ কেউ ধর্ষকের কাজ করে, সবাই করে না; তবে সব পুরুষই সম্ভাব্য ধর্ষণকারী।

নারীবাদীদের এই বক্তব্য অনুযায়ী ধর্ষণ হচ্ছে কিছু সুনির্দিষ্ট সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি, যা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উৎসাহ প্রদান করে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতাত্ত্বিক পেগি রীভস স্যানডে তাঁর ‘দ্য সোশিও কালচারাল কন্টেক্স অব রেপঃ এ ক্রস কালচারাল স্টাডি’ গবেষণাগ্রন্থে এই দৃষ্টিভঙ্গির একটা পরীক্ষা চালান। পেগি ১৫৬টা ট্রাইবাল সমাজের উপর গবেষণা চালান এবং আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করেন যে, এ সমাজগুলোতে ধর্ষণ নেই, বা থাকলেও তা একেবারেই সামান্য, বিরলই বলা চলে। পেগির মতে ধর্ষণমুক্ত সমাজগুলো যে সমাজগুলোতে ধর্ষণ রয়েছে তার থেকে পুরোপুরিই আলাদা ধরনের। যে সমাজগুলোতে ধর্ষণ বিদ্যমান, সেগুলো মূলত পুরুষ আধিপত্যবাদী সমাজ এবং চরম বিশৃঙ্খলাময় সন্ত্রাস-সমৃদ্ধ সমাজ। অন্যদিকে ধর্ষণমুক্ত সমাজগুলোতে নারী-পুরুষের সমতা অনেক বেশি এবং নারী এবং তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি অধিক শ্রদ্ধা বিরাজমান সেখানে। পেগি এই উপসংহারে পৌঁছান যে, পুরুষ প্রকৃতিগতভাবেই আক্রমণাত্মক, কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু কিছু সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য পুরুষের এই আক্রমণাত্মক রূপকে আরো বিকশিত হতে অনুপ্রেরণা জোগায়।

ভার্জিনিয়ার কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'জন গবেষক, ডায়ানা স্কালি এবং জোসেফ ম্যারোলাও পেগি এবং অন্য নারীবাদীদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা দুজন ধর্ষণের দায়ে কারাবন্দি বেশ কয়েকজন অপরাধীর সাক্ষাৎকার নেন। তাঁরা দেখেন যে, এই আসামীদের অনেকেই ধর্ষণকে ফলপ্রসু এবং বেশ লাভজনক কাজ বলে মনে করে। তা্রা বিশ্বাস করে না যে তাদের এই কাজের জন্য শাস্তি পাওয়াটা উচিৎ। কেউ কেউ একজন নির্দিষ্ট নারীকে শাস্তি দেবার জন্য বা বলা যায় এর মাধ্যমে সব নারীকে শিক্ষা দেবার জন্য ধর্ষণ করেছে। অন্যেরা মনে করে যে, ধর্ষণ হচ্ছে তাদের অধিকার। এই অস্ত্র ব্যবহার করে তারা সুখ এবং আনন্দ পেয়েছে। ডায়ানা এবং জোসেফের বক্তব্য হচ্ছে যে, এই লোকগুলো কিন্তু মানসিকভাবে অসুস্থ নয়, যদিও তাদের কথা শুনে সেরকমটাই মনে হতে পারে। এরা আসলে নারীর প্রতি সমাজের যে বৈষম্য এবং বিদ্বেষ, সেটাকেই শুধু চরমভাবে ব্যক্ত করেছে তাদের কথার মাধ্যমে।

আমাদের সমাজটা কোন পর্যায়ে আছে, এর সাংস্কৃতিক স্বরূপটা কী, নারী-পুরুষের সমতাটা কেমন, নারীর প্রতি সমাজে পুরুষের বিদ্বেষের মাত্রার পরিমানটা কী, এগুলোকে বিশ্লেষণ করেই ধর্ষণের মতো চরম একটা বিকৃত অপরাধের সমাধান খুঁজতে হবে আমাদের সবাইকে। তা না হলে ইয়াসমিন, তনু, পুজা কিংবা হালের এই নাম না জানা ছাত্রীটি, এরা প্রতিদিন ধর্ষিতা হবে, আর আমরা ফেসবুকে শুধু অন্তহীন আহাজারি আর মাটিতে কপাল চাপড়ানো মাতম করে যাবো।


  • ১৫৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা