ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

মোল্লাতন্ত্রের প্রথম এবং প্রধান শিকার হয় নারীরাই

নাসরিন সটুদে নামের একজন ইরানিয়ান আইনজীবী এবং মানবাধিকার কর্মীকে সাতটা অভিযোগে ৩৮ বছরের জেল এবং ১৪৮ ঘা বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিয়েছে ইরানের আদালত।

নাসরিন কী ভয়াবহ অপরাধ করেছে, সেটা বলি আগে।

ইরানের মেয়েদের পাবলিক প্লেসে হিজাব পরা বাধ্যতামূলক। কেউ না পরলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে পারে। এই রকম আইনি অভিযোগে আক্রান্ত নারীদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন নাসরিন। শুধু তাই নয়, যে কোনো ধরনের মানবাধিকার লংঘিত হলেই নাসরিনের উপস্থিতি সেখানে ছিলো অবশ্যম্ভাবী।

তাঁকে দমাতে ২০১০ সালে একবার গ্রেফতার করা হয়। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গ করছেন এই অপরাধে ছয় বছরের জেল হয়ে যায় তাঁর। বছর তিনেক পরে মুক্ত হন তিনি। মুক্ত হয়ে ইরান থেকে পালিয়ে না গিয়ে আবারও নির্যাতিত মানুষদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান তিনি।

এর ফলশ্রুতিতে ২০১৮ সালে আবারও গ্রেফতার হন তিনি। কারাদণ্ড হয় তাঁর। আর এখন আরো কিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেই কারাদণ্ড আটত্রিশ বছরে গিয়ে পৌঁছেছে, সাথে যোগ হয়েছে বেত্রদণ্ড।

আমি নাসরিনের এই খবরটা পড়ার পরেই বাংলাদেশের কথা মনে হলো। বাংলাদেশও ইরানের পথেই হাটছে। এখনো ইরান হয়নি, তবে সেই পথে চলেছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইরানও আজকের ইরান ছিলো না সব সময়ে। সত্তর দশকে এটা একটা আধুনিক রাষ্ট্র ছিলো, মেয়েরা আধুনিক পোশাক পরে স্কুলে যেতো, কলেজে যেতো, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতো, সাইকেল চালাতো, অফিস আদালতে কাজ করতো। কাউকে তখন হিজাব না পরার জন্য জেলে যেতে হতো না। আফগানিস্তানও একই ধরনের আধুনিক একটা রাষ্ট্র ছিলো। ষাট বা সত্তরের দশকের ছবি দেখলেই সেটা বোঝা যায়।

আশির দশক থেকে ধীরে ধীরে এই দুটো রাষ্ট্র দখল করে নিয়েছে মোল্লারা। বাংলাদেশেও সেই একই প্রক্রিয়া চলছে। খুব শীঘ্রই ওদের স্তরে পৌঁছে যাবো আমরা। পৌঁছে গেলেই সবচেয়ে বড় বিপদে পড়বে আমাদের মেয়েরা। কারণ, মোল্লাতন্ত্রের প্রথম এবং প্রধান শিকার হয় নারীরাই।

আমার ভয়ের জায়গাটা আরেক ক্ষেত্রে। ইরানের এমন দুর্দশাগ্রস্ত সময়েও নাসরিনের মতো সাহসী একজন নারী আছে নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। বাংলাদেশের মেয়েরাতো কাউকেই পাশে পাবে না। বরং হিজাব না পরার জন্য সেই মেয়েকে গালমন্দ করতে দাঁড়িয়ে যাবে অন্যসব নারীরাও।

স্রোতের অনুকূলে ভাসতে আমরা বাঙালিরা বড় ওস্তাদ, বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস কারো আছে বলে মনে হয় না।

708 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।