মাতৃতান্ত্রিক মিথ

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৩১, ২০১৯ ১:১৩ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


সিনথিয়া এলার তাঁর “দ্য মিথ অব ম্যাট্রিয়ার্কাল প্রিহিস্ট্রি” বইতে একটা টি-শার্টের ছবি ছেপেছেন। নারীবাদী পত্রিকা ‘দ্য ইসুজ’ এর একটা সংখ্যা ঘাটতে গিয়ে তিনি এই টি-শার্টের বিজ্ঞাপন দেখতে পান। সেই টি শার্টে লেখা ছিলো, ‘আই সারভাইভড ফাইভ থাউজ্যান্ড ইয়ার্স অব প্যাট্রিয়ার্কাল হায়ারয়ার্কিস’।

পিতৃতন্ত্রের সূত্রপাত হয়েছে পাঁচ হাজার বছর আগে, তার আগ পর্যন্ত সমাজ ছিলো মাতৃতান্ত্রিক, এই ধরনের একটা ধারণা নারীবাদীদের মধ্যে চালু হয়ে গিয়েছিলো। সিন্থিয়া যেমন বলেছেন, “আমি ১৯৭২ সালে নিউ ইয়র্কে একটা লেকচার এটেন্ড করেছিলাম। সেখানে বেশ কয়েকবার এই পাঁচ হাজার বছর সংখ্যাটা উল্লেখ করা হয়। আমি এই সংখ্যাটা আশির দশকের শেষের দিকে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতেও শুনেছি। আমি নারীবাদী স্পিরিচুয়াল মুভমেন্ট নিয়ে গবেষণা করছিলাম। সেখানে এই পাঁচ হাজার বছরটাকেই ধরা হয় পিতৃতন্ত্রের আগমণের সময় হিসাবে।”

প্রাগৈতিহাসিক যুগে, অর্থাৎ যখন লিখন পদ্ধতি চালু হয়নি, সেই সময় সমাজ মাতৃতান্ত্রিক ছিলো, সেখানে মেয়েরা কর্তৃত্ব করতো, সোনালি সময় ছিলো তখন তাদের, এই ধারণাটা পুরোপুরিই মিথ, শক্ত কোনো নৃতাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তির উপর গড়ে ওঠেনি। এই ভ্রান্ত ধারণার সূত্রপাত করেছিল ক্লাসিক্যাল সমাজবিজ্ঞানীরা উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে। শুরুতে ব্যাকোফেনের Mother Right এবং মর্গানের Ancient Society এবং পরে রবার্ট ম্যালিনোস্কির Argonauts Of The Western Pacific কাজের উপর ভিত্তি করে নারীবাদীরা এই রূপকথার জন্ম দেয় যে সমাজে নারীরা একসময় প্রভুত্ব করতো। মর্গানের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েও এঙ্গেলসও একই ধরনের ধারণা পোষণ করতেন। হ্যা, অনেক সমাজেই নারী প্রধান ছিল, নারী দেবী ছিল, কিন্তু সার্বিকভাবে নারী পুরুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতা ভোগ করতে পারে নি কখনোই। ওই সমাজগুলোকেই আগে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বলে কল্পনা করে নিয়েছিল নারীবাদীরা। এখন মাতৃতান্ত্রিক এর বদলে এগুলোকে মাতৃকেন্দ্রিক (Matristic) সমাজ বলা হচ্ছে।

পঞ্চাশের দশকে মারিয়া গিম্বুটাস নিওলিথিক ইউরোপে মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। ওর উপর ভিত্তি করেই সেকেণ্ড ওয়েভ ফেমিনিস্টরা বেশ কিছুদিন ধরে এই আইডিয়াকে টেনেটুনে সম্প্রসারণ করেছিলেন। কিন্তু, নিওলিথিক সময়ের মাতৃতান্ত্রিক সমাজের সোনালি যুগকে বাতিল করে দেন স্টিভেন গোল্ডবার্গ তাঁর The Inevitability of Patriarchy এবং Why Men Rule গ্রন্থে।

মানব ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই নারীরা পুরুষদের উপরে কর্তৃত্ব করতে পারেনি। অন্তত কৃষি নির্ভর এবং শিল্প নির্ভর সভ্যতায়তো একেবারে নয়। কৃষির সূত্রপাত ঘটেছে এখন থেকে দশ হাজার বছর আগে। সেই সময়েই ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণার উদ্ভব হয়। পেশীশক্তির জোরেই হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক, সমাজে তখন থেকে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে পুরুষেরা। নোহা হারারি তাঁর বই, “স্যাপিয়েন্সঃ এ ব্রিভ হিস্ট্রি অব হিউম্যানকাইন্ড”-এ লিখেছেন, “Patriarchy has been the norm in almost all agricultural and industrial societies.”

তিনি মিশরের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, “কয়েক শতক ধরে মিশর অসংখ্যবার আসিরিয়ান, পারসিয়ান, মেসিডোনিয়ান, রোমান, আরব, মেমলুকস, টার্কস এবং বৃটিশদের দ্বারা পদানত হয়েছে। কিন্তু, এর সমাজ ব্যবস্থা সব সময়েই পিতৃতান্ত্রিক হিসাবে থেকেছে।” শুধু মিশর একা নয়, সব কটি মহাদেশেই হাজার হাজার বছর ধরে পিতৃতন্ত্র চলে এসেছে। অথচ, এই মহাদেশগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটা হাজার হাজার বছর ধরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলো। এ’রকম বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার পরেও কোথাও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বিকশিত হয়নি।

কৃষির আবিষ্কারের আগে যে সমাজ ছিলো, সেটা ছিলো শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ। সেই সমাজে শিকারে যেতো পুরুষ, আর সংগ্রাহকের ভূমিকা পালন করতো মূলত নারীরা। এই সমাজেও আধিপত্য ছিলো পুরুষদের। যদিও কৃষি সমাজের মতো অসমতা অতোটা প্রকট ছিলো না। কারণ, ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনো ধারণা এই সমাজে ছিলো না। কৃষিভিত্তিক সমাজে এসে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা বিকশিত হয়। কোনো কোনো পুরুষ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সম্পত্তি অর্জন করে ফেলে। এই সম্পত্তি অর্জন নারীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। পুরুষের অনুগত হওয়া ছাড়া তার আর কোনো গতি থাকে না। শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের চেয়ে অনেক বেশি বৈষ্যম্যের শিকার হয় নারী এখানে।

নারী পুরুষের সমতার, বা জেন্ডারগত সাম্যতার এই ব্যাপারটা কোনভাবেই প্রাকৃতিক নয়, এটা হচ্ছে সাংস্কৃতিক। মানুষের দ্বারা আরোপিত ব্যবস্থা। প্রকৃতিতে এরকম কোন ‘সমতা’
-র ব্যাপার-স্যাপার বা ধারণাই নেই। এটা এক ধরণের মিথ ছাড়া আর কিছু নয়। প্রকৃতিতে যা রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেস দেয়, সেটাই নিয়ম হিসাবে থাকে। নারী এবং পুরষের প্রজননগত পার্থক্যের কারণে আদিম সমাজেও নারীকে হার মানতে হয়েছে পুরুষের কাছে। কাজেই, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, এই মিথ্যা কল্পনার জগত থেকে বের হয়ে আসার দরকার আছে নারীদের ভবিষ্যত নির্মাণের স্বার্থে। প্রাগৈতিহাসিক কোনো সময়ে নয়, বাস্তবতা হচ্ছে, আধুনিক সমাজই নারীকে অনেক বেশি ‘লৈঙ্গিক সমতা’ দিয়েছে। প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ এর পিছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে।


  • ৩২৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা