প্রিজনার অব তেহরানঃ মারিনা নিমাতের নির্মম উপাখ্যান - পর্ব ২

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৯, ২০১৭ ১২:২৫ PM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


ইরানের পাহলভি রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৫ সালে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রেজা শাহ পাহলভি। তিনি পারসিয়ান কসাক ব্রিগেডের বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ছিলেন। রেজা শাহ ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মিত্রবাহিনী তাঁকে গদিচ্যুত করে। রাজসিংহাসনে বসেন তাঁর ছেলে মোহাম্মদ রেজা শাহ।

ইরানের এই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র গণ আন্দোলন গড়ে উঠে সত্তর দশকের শেষের দিকে। এতে বামপন্থীরা যেমন ছিলো, ছিলো মধ্যপন্থীরা, একই সাথে ছিলো চরম দক্ষিণপন্থী ইসলামি মোল্লারাও। গণ আন্দোলনকে সামাল দিতে আমেরিকান মদদপুষ্ট শাহ একের পর এক প্রধানমন্ত্রী বদলাতে থাকেন। এর মাধ্যমে গণ আন্দোলনের ফলে তাঁর শাসন যেখানে যেখানে আলগা হয়ে গিয়েছে, সে জায়গাগুলো পুনরুদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালান তিনি। কিন্তু, তাঁর সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। রাজপথের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন আর্মি কার্ফ্যু জারি করে। তেহরানের প্রতিটা রাস্তার মোড়ে সৈন্য বোঝাই আর্মির গাড়ি মোতায়েন করা হয়। মারিনাদের স্কুলসহ সব স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়। আতংকের এক দেশে পরিণত হয় ইরান।

এতো কিছু করেও শাহের পতন ঠেকানো যাচ্ছিলো না। অলিতে-গলিতে শাহের বিরুদ্ধে মিছিল হতে থাকে। 'শাহ নিপাত যাক' শ্লোগান দিয়ে তরুণদের দল মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে গলার রগ ফুলিয়ে শ্লোগান দিতে থাকে। সরকারের এবং আর্মির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে ভয়ে। এদের পালিয়ে যাবার সাথে সাথে রাস্তাঘাটে আর্মির উপস্থিতিও কমে আসতে থাকে। শক্তি প্রয়োগ করে গণ আন্দোলনকে ঠেকাতে গিয়ে আন্দোলনকে আরো শক্তিবান করা হচ্ছে, এটা বুঝতে পেরেই হয়তো শাহ নিজেও শক্তি প্রয়োগের পথ থেকে সরে আসতে থাকেন। অবশেষে, ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখে তিনি বাধ্য হন ইরান থেকে নির্বাসিত হতে। জান বাঁচাতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন মিশরে। তাঁর আমলে যে সমস্ত লোকদের রাজনৈতিক কারণে রাজবন্দি করা হয়েছিলো তারা মুক্তি পায়।

শাহ ইরান থেকে নির্বাসিত হন, আর অন্যদিকে ফ্রান্সের নির্বাসিত জীবন শেষ করে বীরের বেশে দেশে ফিরে আসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনী। আর্মি তখন পর্যন্ত শাহের অনুগত। বিপ্লবীদের হাতে ইরানের পুরো নিয়ন্ত্রণ যায়নি। ট্যাংক, মিলিটারি ট্রাক তখনও টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে রাস্তায় রাস্তায়। চারিদিকে অনিশ্চিত এক থমথমে অবস্থা। সামরিক বাহিনী বেশিরভাগ শহরের দখল নিয়েছে, কার্ফ্যু জারি করে রেখেছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। গণ আন্দোলন তখনও চলছে। খোমেনি এই কার্ফ্যুকে উপেক্ষা করার নির্দেশ দেন জনগণকে। প্রতিদিন রাত নয়টায় ছাদে গিয়ে সবাইকে আধা ঘণ্টা ধরে আল্লাহ আকবর শ্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করার নির্দেশ দেন তিনি। বিপ্লবের প্রতি তারা যে অনুগত, শাহের পলায়নেও যে বিপ্লব থামেনি, সেটা প্রমাণ করাই হচ্ছে এর মূল উদ্দেশ্য। সামরিক বাহিনী আর শাহের অনুগত সামান্য কিছু লোক বাদে পুরো ইরান খোমেনির কথা মেনে চলতে থাকে নির্দ্বিধায়।

তীব্র আন্দোলনের মুখে ফেব্রুয়ারি মাসের দশ তারিখে আর্মি আত্মসমর্পণ করে আন্দোলনরত জনগণের কাছে। পরের দিন আন্দোলনরত সব পক্ষকে ডিঙিয়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনী মেহদী বাজারগানকে প্রধানমন্ত্রী করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন।

ইরানের রাস্তায় রাস্তায় সশস্ত্র রিভোলুশনারি গার্ড এবং ইসলামি কমিটির সদস্যদের দেখা যেতে থাকে। এরা সবাইকেই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে। ইরানের গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্য ছিলো, এই অভিযোগ দিয়ে শত শত লোককে গ্রেফতার করা হয়। এদের জেলে ভরে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কাউকে কাউকে হত্যাও করা হয় । শাহের অনুগত সরকারী লোকেরা, যারা দেশ ছেড়ে যেতে পারেনি, তাদের কচুকাটা করে ফেলা হয়।

বিপ্লবের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে সরাসরি যুক্ত না থাকার পরেও ইরানের এই বিপ্লব মারিনার পরিবারের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বিপ্লবের অল্প কিছুদিন পরেই ইরান নিজেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিবর্তন করে ফেলে। নাচ, গান-বাজনাসহ সমস্ত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে হারাম ঘোষণা করা হয়। মারিনার বাবা শিল্পকলা এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন। সাংস্কৃতিক সব কর্মকাণ্ডকে হারাম ঘোষণা করায় স্বাভাবিকভাবে চাকরি হারান তিনি মন্ত্রণালয়ের। এক আত্মীয়ের অফিসে কেরানির চাকরি নিতে বাধ্য হন তিনি। সংসার চালানোর জন্য প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয় তাঁকে। ভোরে বাড়ি থেকে বের হন, আর ফেরেন সেই অনেক রাতে।

বন্ধ স্কুল-কলেজ সমূহ নতুন করে চালু হয় আবার। মারিনাদের স্কুলও খোলে। তবে, আগের সেই স্কুল আর সেটা থাকে না। বদলে যায় তা সমূলে। আগের প্রজ্ঞাবান অধ্যক্ষের বদলে স্কুলে অধ্যক্ষ হিসাবে দেখা দেয় মাত্র উনিশ বছরের এক ধর্মান্ধ এবং হিজাবি তরুণী। নাম খানম মাহমুদী, ইসলামি রিভলুশনারি গার্ডের সদস্য সে। অধ্যক্ষ হিসাবে যে যোগ্যতা তার থাকার কথা ছিলো, তার কিছুই ছিলো না তার। পুরোপুরি রাজনৈতিক নিয়োগ এটা। আগের অধ্যক্ষ ভদ্রমহিলা রেজা শাহের শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এই অপরাধে তাঁকে হত্যা করা হয়।

শুধু অধ্যক্ষই নয়, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই স্কুল থেকে আগের সব শিক্ষকেরা বিতাড়িত হন। তাদের বদলে অনভিজ্ঞ সব তরুণীরা শিক্ষক হিসাবে আসা শুরু করে। এরা সবাই ইসলামি রিভোলুশনারি গার্ডের সদস্য, সবাই ধর্মান্ধ। স্কুলে হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। টাই পরা, পারফিউম এবং কোলন ব্যবহার করা, নেইল পালিশ করা এবং মেক আপ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। এগুলোকে শয়তানি কাজকর্ম বলে ঘোষণা করা হয়। যারা এগুলো করবে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। সকালে স্কুলে ঢোকার সময়ে অধ্যক্ষ খানম মাহমুদী এবং উপাধ্যক্ষ খানম খেইরখা স্কুল গেটে বালতি ভর্তি পানি এবং এক টুকরো কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। কোনো মেয়েকে মেক আপ করা অবস্থায় দেখতে পেলে তারা কাপড় দিয়ে তার মুখে সজোরে ঘষে দিতো, ঘষে ঘষে মেক আপকে তুলে দিতো তারা।

 


  • ৩৪২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা