নারী শরীর পণ্য হলে তাঁর মেধা, শ্রম, বুদ্ধিমত্তা পণ্য নয় কেনো?

বুধবার, জুলাই ১৭, ২০১৯ ৬:০৭ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


প্রশ্ন ১. ব্রাড পিট, জর্জ ক্লুনি, জনি ডেপ, ক্রিস হেমসওয়ার্থ, আলেকজান্ডার স্কার্সগার্ড, জ্যাসন মোমোয়া, ভিগগো মরটেনসন, উইলিয়াম লেভিরা যখন উদ্যম বুক, পিট, উরু প্রদর্শন করে ক্যামরার সামনে দাঁড়ায়, তখন কেনো আপনার তাদের শরীরকে "পণ্য" বা "প্রোডাক্ট" মনে হয় না?

প্রশ্ন ২. বিয়ন্সে, এমা ওয়াটসন, মেরিল স্ট্রিপ, এ্যালেসিয়া কেইস, ম্যাডোনা, রিহানা, এ্যালেন পেইজ, টোভ লো, ভিয়োলা ডেভিস, স্কারলেট জনসন, জ্যাসিকা ক্যাসটেইন, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, প্যাট্রিসিয়া, এমিলি ব্লান্টরা যখন বুক (স্তনের নিপল ঢাইকা), পিট, উরু খোলা রেখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়, তখন কেনো আপনার মনে হয় "এরা শরীরকে প্রোডাক্ট বানায়ে বেচতেছে"?

উপরিউক্ত প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর জানা খুব জরুরী আপনার। এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে শুধু সিমোন, মেরি ওউলস্টোনক্রাফট পড়লে হবে না। অড্রি লর্ড, এ্যালেস ওয়াকার, এ্যান্ড্রে রিটা ড্রোওকিন, ভ্যালেরি সোলেনাসও পাঠ করতে হবে। জর্জ মিলার, মিশেল পার্কসন, কামছি উইচম্যান, গিলান আর্মস্ট্রম, ক্যাটনিকা হেইন্সের চলচ্চিত্র পড়তে হবে। কোনো প্রচলিত বা সমাজ স্বীকৃত মতবাদ বা ইজম চর্চা করতে হইলে পড়াশোনা গভীরে যাইয়া না করলেও চলে কিন্তু " নারীবাদ" বা "ফেমিনিজমের" মতো ইজম চর্চা করতে হইলে প্রচুর পুথিগত বিদ্যার দরকার পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশের বই, চলচ্চিত্র, সমাজিক উপকরণে অভ্যস্ততার কারণে এই ৩০/৪০ বছরে আপনার মাথা খুব শক্তপোক্তভাবে লকড হইয়া গেছে। বুঝলেন তো? এতো সহজে আপনি ননজাজমেন্টাল হইতে পারবেন না।

কোনো নারী স্তনের নিপল ঢাইকা বুকের বাকি অংশ উন্মুক্ত করে অভিনয় করলে, আলোকচিত্র বানাইলে, বিজ্ঞাপন দিলে বা রাস্তায় হাটলে আমি নিশ্চিত এ বঙ্গের নারীবাদী নারীরা দৌঁড়াইয়া আইসা তারে ওড়না দিয়ে জড়ায়ে ধরবে আর কইবে, "পুরুষেরা আকর্ষিত হইতেছে। তোমার শরীর ঢাকো।" এমন পরিস্থিতিতে ধর্মগুরুরা ওই নারীকে কইবে, "বেশ্যা, তুই শরীর ঢাক। তোদের মতো নারীরা কিয়ামতের লক্ষণ।" এটা বাস্তবতা। আপনার কি এখনও মনে হয় এই দুই শ্রেণির মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে? দুইদলের চূড়ান্ত মতাদর্শ একই জায়গাতে আটকে আছে। তাদের লক্ষ্য এক, অভিন্ন - "নারী, শালীনতা তোমার পোশাক।"

অতি সূক্ষ্মতার সাথে দেখলে এই দুই পক্ষের মধ্যে একটা মাত্র পার্থক্য খুঁইজা পাইবেন। পার্থক্যটা হলো - বঙ্গীয় নারীবাদীরা (অল্পজন বাদে) নারীর শরীর হাঁটু পর্যন্ত উন্মুক্ত, সিল্ভলেস পোশাক এবং ক্লিভেজ বের করা পোশাক এ্যালাউ করেন। নারীর বহুপ্রেমও এরা এ্যালাউ করেন না। নারীর গালিগালাজও এ্যালাউড না "বঙ্গের নারীবাদে।" পোশাকের, যৌনতার, মুখের সবকিছুর সীমা কোন পর্যন্ত সেটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তারা। ওই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে আপনি "বাংলাদেশি নারীবাদী" হইতে পারবেন না। ধর্মগুরুরা নারীর শরীরের হাত, পা, মুখ উন্মুক রাখা বর্তমানে এ্যালাউ করেন। নারীর বিবাহপূর্ব একটা প্রেম এবং পরবর্তীতে তাকে বিয়ে করা, বিয়ের পর স্বামীই একমাত্র যৌনসঙ্গী অর্থাৎ নারীর যৌনতার সীমা নির্ধারিত। এই দুই দলের পার্থক্য একটাই -দুই দলের সীমাবদ্ধতার রেখাটা ভিন্ন। একদল তসলিমাদের বঙ্গ ছাড় করে, অন্যদল অভিজিৎদের দুনিয়া ছাড় করে।

কিন্তু খুব স্পষ্ট দুই দলের লক্ষ্য। একদল বলেন, অমুক তমুক ধর্ম দিয়েছে নারীর সর্বোচ্চ সম্মান। অন্যদল বলেন, নারীবাদ (বাংলাদেশি নারীবাদ) দিয়েছে নারীর সর্বোচ্চ স্বাধীনতা। আমি এই দুই দলের কোনো দলেই আমাকে ভিড়াতে চাইনি প্রথম থেকেই যখন আমি আমার রাজনৈতিক অবস্থানের ঘোষণা দিই বরং আই জাস্ট ওয়ানা বিট দোস টু পার্টিজ আপ। আমি চেয়েছিলাম, চাই এদের সঙ্গে ফাইট করতে, বন্ধুত্ব করতে নয় এবং আমি আমার স্থান থেকে সফল।

যাই হোক, মূল টপিকে ফিরে আসি। নারীর বুদ্ধিমত্তা, শ্রম, মেধা, শিল্পকে পণ্য বলা হয় না কিন্তু নারীর শরীরকে কেনো পণ্য বলা হয়? কেনো?

আপনি কি জানেন পুরুষেরা তাদের সৌন্দর্য চর্চা এবং সেক্সুয়ালি এট্রাক্টেট হওয়ার উদ্দেশ্যে কতো কসরত করেন? একটু গায়ের রঙ উজ্জ্বল করতে, ঠোঁট সিগারেটের দাগমুক্ত করতে, ঘামের গন্ধ দূর করতে, লিঙ্গ বড়, তরতাজা বানাইতে, অধিকক্ষণ ভ্যাজাইনাতে লিঙ্গ ধইরা রাখতে, হাত, বুকের পেশি সুদৃঢ় করতে, চুল পতিত হওয়ার হাত থাইকা রক্ষা পাইতে, ভুড়ি কমাইতে, ছয় প্যাকের শরীর বানাইতে, টাক মাথা ঢাকতে বহুকিছু করেন তারা। বহু শারীরিক কষ্ট করেন, অর্থ খরচ করেন জাস্ট টু বি অ্যাট্রাকটিভ টু উইম্যান। আপনি এসব জানেন না বা জানার চেষ্টাও করেন না কারণ আপনার কাছে পুরুষের শরীরটা নগণ্য, তুচ্ছ জিনিস। আপনার মস্তিষ্ক পুরুষ বলতে বুঝে বুদ্ধিমত্তা, মেধা, দৃঢ় স্বভাব সম্পন্ন এক প্রকার জীব। আপনার সামনে আইসা বা আপনার বেডরুমে আইসা জনি ডেপ শার্ট খুইলা শুইয়া থাকলেও আপনি তারে আপনার স্বর্ণ দিয়া বান্ধানো মুখ দিয়া কইবেন না, "ইউ লুক সো সেক্সি।" আপনি বরং এক হাত দূরে দাঁড়াতে তার অভিনয়, কণ্ঠস্বর, বুদ্ধি, মেধার প্রশংসা কইরা একটা অটোগ্রাফ চাইবেন।

অধিকিন্তু পুরুষেরা সমস্ত বুক, পিট, পেশিতে ফাউন্ডেশন, ওয়েল আর কনসিলারের মিশ্রণ লাগায়ে চকচক কইরা জাঙ্গিয়ার বিজ্ঞাপন দিলেও আপনি কইবেন না, "হি মেইক্স হিস বাডি এ্যা প্রোডাক্ট।" কিন্তু একজন নারী শুধুমাত্র সিল্ভলেস জামা পিন্দে হাতে সাবান নিয়ে দাঁড়াইলে আপনি কইবেন, "সি মেইকস হার বাডি এ্যা প্রোডাক্ট। সি ইজ এ্যা প্রোস্টিটিউট নাথিং ইলস।" আপনি এই কথা কইবেন কারণ আপনি একজন নারীর শরীরের পরতে পরতে যৌনতা দেখতে পান। নারীর হাত, পা, চুল থাইকা শুরু করে নারীর ক্লিভেজ সব জায়গাতে আপনার চোখ, অবদমিত মন শুধু "সেক্স" আর "সেক্স" খুঁইজা পায়।

বিষয়টা এমন -নারীর শরীর পৃথিবীর একমাত্র যৌনবস্তু। দেখেন, একজন নারী যখন বুদ্ধি, মেধা, শ্রম, যোগ্যতা, শারীরিক কসরত এইগুলা বেচতেছে তখন সে পণ্য নয় কিন্তু শারীরিক সৌন্দর্য বেচলেই সে পণ্য! যদিও শুধুমাত্র শারীরিক সৌন্দর্য বেচা যায় না, শরীরটা উপস্থাপনের জন্য আর্ট, মেধা, বুদ্ধি, শ্রম এইগুলাও সঙ্গে থাকা লাগে, থাকে। কিন্তু নারীর "শরীরের" কাছে নারীর মেধা, বুদ্ধি, শ্রম অন্যসকল গুণের কোনো পাত্তাই নাই কিংবা নারীর শরীরের মতো অতো আকর্ষণীয় না নারীর অন্যান্য যোগ্যতাসমূহ। নারীর শরীরই তার সর্বস্ব।

কিন্তু আমি এমন কইরা ভাবতে পারি না। আমার কাছে নারীর বুদ্ধি, মেধা, শরীর, শ্রম, অন্যান্য গুণাবলিকে একইভাবে দেখি। একটা পণ্য, অন্যটা গুণ - এভাবে ভাবি না আমি। এইসব (বুদ্ধি, মেধা, শরীর, শ্রম) শুধু নারীর না, যেকোনো পুরুষের নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ, পুঁজি। নারী পুরুষ যে কেউ চাইলেই তার উপরিউক্ত পুঁজি বা সম্পদকে যে কোনো পেশাগত, অপেশাগত কাজে ব্যবহার করতে পারেন। এটা তার ব্যক্তি স্বাধীনতা যেটার উপর হস্তক্ষেপ আমি করতে পারি না।


  • ৫৪৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফাহমিদা জামান ফ্লোরা

শিক্ষার্থী (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা