ফারজানা কাজী

সমাজ কর্মী

তিন তালাক ও কিছু কথা

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মুসলমানদের তিন তালাক প্রথাকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে এই বছরের ২২ আগস্ট।

পর পর তিনবার তালাক উচ্চারণ করে অথবা চিঠি লিখে, সামাজিক মাধ্যম বা ফোনে তিনবার তালাক উচ্চারণ করে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হয়, তার বিরুদ্ধে ৫ জন মুসলিম নারী সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করেছিলেন। তারই প্রেক্ষিতে এক সাংবিধানিক বেঞ্চ এই রায় দিয়েছে।

বাংলাদেশে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইনে সংস্কার করেছিলো আইয়ুব খান সরকার। তৎতালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানে শরীয়াহ্ আইনের সংস্কার হয়েছিলো। তখন বলা হয়েছিলো, মুখে-মুখে তিন তালাকের কোনো আইনগত বৈধতা থাকবে না। মূলত নারী অধিকার কর্মীদের আন্দোলনেই এটি হয়েছিলো। স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ তাদের বিবাহ বিচ্ছেদের ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু তিন মাসের মধ্যে তারা যদি মত পরিবর্তন করে ফেলেন তাহলে সে তালাক কার্যকরী হবে না। তিন মাসের মধ্যে যদি তারা মত না বদলায় তাহলে তিনমাস পরে সে তালাক কার্যকরী হবে।

আইয়ুব খান সরকার তালাকের ক্ষেত্রে যে সংস্কার এনেছিলো সেটি এখনো বাংলাদেশে চালু আছে।

সেই সময়ে সম্পত্তি আইনেরও সংস্কার হয়েছিলো। ইসলামিক শরিয়াহ আইনে আছে- যদি পিতা বেঁচে থাকতে কোনো বিবাহিত ছেলে স্ত্রী এবং সন্তান রেখে মারা যায় তবে ঐ পিতার মৃত্যুর তার সম্পত্তির অংশ তার মৃত ছেলের সন্তানেরা পাবে না। কিন্তু ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধান সংশোধন করে মৃত ব্যক্তির সম্পদে বিবাহিত মৃত পুত্রের ওয়ারিশরা অংশ পাবে- এই বিধান সংযুক্ত করা হয়।

শরিয়াহ আইন এক আজব আইন! যে সন্তানের পিতা নেই, তারই তো সম্পদের প্রয়োজন বেশি। তাকে কেনো বঞ্চিত করার আইন থাকবে? দাস বনানোর জন্যে কি?

নারীর জন্যে শরিয়াহ আইন আরো নির্মম এবং নিষ্ঠুর। শরীয়ায় বিয়ে হচ্ছে পুরুষাধিপত্যের চুক্তি। বলা ভালো নারীবলী। শরীয়াহ বিয়েতে স্ত্রী হয়ে ওঠে পুরুষের চুক্তিবদ্ধ দাসী; সে নিজেকে সমর্পণ করে একটি পুরুষের খেয়াল খুশির কাছে। স্ত্রী স্বামীকে দেবে যৌনতৃপ্তি ও বৈধ সন্তান, কিন্তু স্বামী যখন ইচ্ছে মনের খেয়ালে শুধু তিনবার ‘তালাক’ বলে ছেড়ে দিতে পারবে তাকে। ইসলামি আইনে বিয়ে এমন একটি চুক্তি যেখানে একজনকে দেয়া হয় অশেষ অধিকার এবং আরেকজনের প্রায় সমস্ত অধিকার বাতিল হয় সামান্য কিছু অর্থিক সুবিধার বিনিময়ে। পুরুষ ওই চুক্তি বাতিল করতে পারে স্বেচ্ছাচারিতার সাথে।

অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে নারী জীবন কাটায় তালাকের খড়গের নিচে। মধ্যপ্রাচ্যে তালাক একটি সাধারণ ঘটনা, সেখানে সম্পদশালীরা নিয়মিত পুরানো স্ত্রী তালাক দিয়ে তরুণী/বালিকা বিয়ে করে বেহেশতের স্বাদ গ্রহণ করে।

এখন আমার প্রশ্ন- পাকিস্তান আমলে যদি তিন তালাক আইন সংস্কার না হতো, তাহলে কি বাংলাদেশ শরিয়াহ্ আইনের সংস্কার করতো? শুনেছি স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে আইয়ুব খানের সংশোধিত আইন বাতিলের কথা উঠেছিলো। কিন্তু নারী নেত্রীদের আন্দোলনে হোক, বা যে কারণেই হোক সেটি হয়ে ওঠেনি। আমার ধারণা বাংলাদেশের কোনো সরকারই আল্লাহর আইন বাতিলের সাহস করতো না তেঁতুল হুজুরদের খুশি করার জন্যে। এখনো হয়তো এদেশের নারীরা তিন তালাকের খড়গের নিচে বসবাস করতো। পুরুষ তার মর্জি মতো যে কোনো সময় শুধু তিনবার তালাক উচ্চারণ করে ছেড়ে দিতো স্ত্রীকে।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।