"সব দোষ মেয়েদের" এই ধারণা মানসিক বৈকল্য বৈ কিছু নয়

মঙ্গলবার, নভেম্বর ১২, ২০১৯ ৯:৫৮ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


ঠিক কবে থেকে শুনে শুনে বড় হয়েছি মনে নেই, কিন্তু এটা শুনতে হয়েছে বহুবার। হোক সেটা ঘরে বা বাইরে বা কাজে। যেকোনো খারাপ জিনিসের দায় বর্তায় মেয়ের উপর।

মেয়েটি বাইরে থেকে কাঁদতে কাঁদতে আসলো, জানা গেলো তাকে কিছু খারাপ ছেলে খারাপ কিছু বলেছে। তার মা তাকে বলছে, তুমি ওভাবে একা একা বাইরে গেলে তো ছেলেরা এমন করবেই। মানে মেয়েটার বাইরে যাওয়াই দোষ হয়ে গেলো।

ছেলে বাবা মা'র জন্য কিছু করে না। দোষ পড়লো বউয়ের ঘাড়ে। বউয়ের বোঝানো উচিৎ ছিলো ছেলেকে, নতুবা বউই ছেলের কান ভারী করেছে। সাধারণত ছেলেরা অবুঝ হয়! তাদের ঠিক বেঠিক বুঝানোর দায় মেয়েদের। তারা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দুধের শিশু!

অফিসের নাকি কীসের ঝামেলা চলছে মেয়েটির। ঠোঁট বাঁকিয়ে অনেকেই বলে, এই মেয়েদের কাজে নিলে যা হয় আরকি! ঘর সামলাবে না অফিস!

তা কথা ঠিক, ঘর আর অফিস কীভাবে মেয়েরা সামলায় সেটা ছেলেদের জানার কথা না। ছেলেরা অফিস শেষে ঘর সামলায় না। ঘরে গিয়ে রান্না করা খাবারটা ঠিকই পায়।

মেয়ে কেনো দেরি করে ঘরে ফিরছে দোষ কিন্তু মায়ের। মা'র জেনে নেওয়া উচিৎ ছিলো। ছেলে কেনো ড্রাগ এডিক্টেট, দোষ কিন্তু মায়ের। মা কেনো নজর দেয়নি। মেয়ে প্রেম করছে? মা জানে না! এ কেমন মা?

মেয়েটা ধর্ষণের শিকার হয়েছে? নিশ্চয়ই কোনো উল্টা পাল্টা কাপড় পরছিলো! শুধু শুধু ওকেই কেনো ধর্ষণ করতে যাবে যদি কিছুই না করে? ছবি বের হয়েছে মেয়েটির। ওমা কী খারাপ মেয়ে! ছি:! কিন্তু ছবিতে ছেলেও তো ছিল। তাতে কী? ছেলের সাথে মেয়ে থাকবে কেনো?

পরকীয়া করছে? নষ্টা মেয়ে। তা পরকীয়া তো সে একা করেনি। সাথে যে পুরুষটি ছিল তাকে যে তুলসীপাতা ভেবে নিলেন?

হ্যাঁ ভাইগণ, সব দোষ কিন্তু মেয়েদের। মেয়ে হয়ে জন্মানোই মেয়েদের আসল দোষ। কিন্তু মেয়ে না থাকলে যে আপনাদের জীবনই আসতো না সেটা কিন্তু আপনারা বেমালুম ভুলে যান।

আপনারা নিজেদের দিকে কোনোদিন তাকিয়েছেন? ভেবেছেন বাবা মা কেনো মেয়েদের ঘরের বাইরে গেলে চোর ডাকাতের ভয়ের চেয়ে ছেলেদের বেশি ভয় পায়?

আপনাদের যে ভয় পায় তাতেই আপনারা অনেক গর্ব অনুভব করেন। সামনে লেজধারী প্রাণী হওয়ার গর্ব!

অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে আমাদের বরাবরই ভালো লাগে। সেটা যদি হয় নারী তাহলে তো কথাই নেই। দোষটা চাপাই কারণ ভাবি সে তো দুর্বল। দুমড়ে মুচড়ে গেলে দেখে তৃপ্তি পাওয়া যায়। কীসের এতো দেমাগ! হোক না তার অসাধারণ ডিগ্রি অর্জনের ক্ষমতা আছে, হোক না সে বাইরে এবং বাসায় দুই জায়গায় সমান দক্ষতার দাবি রাখে। দক্ষতা অর্জনের জন্য যে মেধা লাগে সেটা শুধু পুরুষদের একান্ত অধিকারভুক্ত থাকবে সেটাই নিয়ম বানিয়েছিলেন আপনারা। কিন্তু আফসোস পারেননি টিকিয়ে রাখতে।

যোগ্যতার অভাব নেই। প্রমাণ পেয়ে আপনারা তাদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে রঙ মাখতে খুব উস্তাদ। যখনই যোগ্যতা দিয়ে হেরে যান আপনাদের একটা কঠিন অস্ত্র থাকে, ব্যক্তিগত বিষয় টেনে আনা। টেনে আনতে আনতে নিজেরাই যে কতো নিচে নেমে যান, মানুষের পর্যায়েই যে আর থাকেন না সেটাও ভুলে যান।

যোগ্যতা দিয়ে প্রোমোশন পেলেন না, কোন নারী পেলো। তাৎক্ষণিক রায় দিয়ে দিবেন বসের সাথে কিছু আছে। সে ঘর বাহির দুটোই সামলায় সমান ভাবে। রায় আসবে, আরে জামাই তো ঘরের সব কাজ করে দেয়। সে স্বনামধন্য অভিনেত্রী, কিন্তু ডিভোর্সি, রায় দিবেন, আরে এদের সংসার টিকে নাকি!

অথচ প্রমোশন তো ছেলেরাও পায় তাদের জন্য তো রায় দেন না যে বসের সাথে কিছু আছে। ছেলে বৌয়ের সাথে ঘরের কাজে সমান সহযোগিতা করলে তাঁকে সাধুবাদ না দিয়ে কটু কথা কেনো বলা হয়? ঘরে তো স্বামী স্ত্রী দুইজনই থাকে নাকি। আর ডিভোর্স শুধু একা মেয়ের তো হয় না। ছেলেরও তো হয়। নাকি এদেশে মেয়ে মেয়ের বিয়ে হয়!

সকল খারাপের জন্য মেয়েদের গায়ে কালিমা দেই কারণ আমাদের সমাজের পুরুষ হচ্ছে সর্বসেরা। এই ধারণা আজকের নয়। যুগের পর যুগ এই ধারণা বহাল তবিয়তে বিরাজমান। ছেলেদের দ্বারা দোষ হলেও সেটা মেয়েদের কারণেই হয়। কারণ মেয়েরা অবুঝ, নির্বোধ, অযোগ্য! এরাই এমন কিছু করে যেখানে ছেলেদের ভুল হতে বাধ্য। নিজেদের এত সুপিরিয়র ভাবা সম্ভবত ছেলেদের মানসিক সমস্যা। জন্ম জন্মাতরে এই রোগ আপনারা বহন করে আসছেন। বোধের অভাবে এই রোগ থেকে মুক্তিও পাচ্ছেন না।


  • ৩৩৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফারজানা নীলা

পেশায় একজন বেসরকারি কর্মকর্তা। ছোট গল্পকার এবং নারী বিষয়ে লিখেন। পাশাপাশি প্রাণী অধিকার নিয়েও কাজ করেন।

ফেসবুকে আমরা