মেয়েদের চাকরি পুরুষদের কাছে এখনো বাহুল্যতা

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯ ৬:০০ PM | বিভাগ : আলোচিত


একটি দুর্ঘটনায় নারী পুরুষসহ অনেকেই নিহত হলো। শুনে একজন মন্তব্য করলো আহারে পুরুষ মরলে একটা পরিবারই ধ্বংস হয়ে যায়।

আর মেয়ে মরলে? না না আপনি ঠিক বুঝেন নাই কী বুঝাতে চেয়েছি। মেয়ে মরলেও পরিবার কষ্ট। মেয়ে মরলেও পরিবারের জন্য ক্ষতি তবে একজন উপার্জনক্ষম পুরুষ যার উপার্জনেই পরিবারের বাকিদের জীবন ধারণ চলে সে যদি চলে যায় তবে ভাবেন ঐ পরিবার কী বিপদেই না পড়ে!

বাবাহীন একটি পরিবারের ভার একটা মেয়ে একাই বহন করে যাচ্ছে বছরের পর বছর এবং সে আমৃত্যু তার পরিবারের সকল খরচ নিজের আয়েই মিটাবে এমনই তার ইচ্ছে।ঠিক এমন মেয়ের সামনেই মন্তব্যকারী উপরোক্ত কথা গুলো বলছেন।

আমি কিন্তু আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। হ্যাঁ জানি। এবং এটার জন্য আমি অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। কেনো প্রশংসাযোগ্য? আপনিও তো আপনার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী! তাতে কি আপনি প্রশংসাযোগ্য হয়ে গেলেন? আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র। আর আমারটা কি দায়িত্ব না? হ্যাঁ দায়িত্ব তবে এখন যদি আপনার বিয়ে হয়ে যায় তাহলে তো এই দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারবেন না। তখন আপনার ছোট ভাইকেই দায়িত্ব নিতে হবে। বিয়ে হয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ? দেখেন, এটাই তো নিয়ম। যখন বিয়ে হয়ে যাবে আপনার, চাইলেও পারবেন না বা করবেন না।

মেয়েরা করে না নাকি মেয়েদের করতে দেন না? এ কী বলছেন? করতে কেউ কি মানা করছে নাকি? আপনি করছেন এখন কারণ আপনার বাবা নাই। উপার্জন করার মতো কেউ নাই। এখন যদি আপনার বাবা ভাই সবাই থাকতো তাহলে কি আপনি দায়িত্ব নিতেন? ছোট ভাই বড় হলে তখন আপনার এই দায়িত্ব নেওয়া শেষ। বিয়ে করে যখন চলে যাবেন তখনও শেষ। ছোট ভাই বড় হবে সেও পরিবারের হাল ধরবে ঠিক আছে, কিন্তু আমি কেনো হাল ধরবো না তখন, বা ছেড়ে দিবো? কারণ আমি মেয়ে আর ও ছেলে তাই? ছেলেরাই পরিবারের হাল ধরে মেয়েরা পরিবার ফেলে চলে যায় তাই?

আজ যদি আমি ছোতো হতাম তখন কিন্তু কেউ বলতো না আমি বড়ো হয়ে হাল ধরব। কারণ আমি তো মেয়ে! বড় হয়ে বিয়েই করবো শুধু। আজ আমার ভাইটা বড়ো হলে সে যদি একই কাজ করতো যা এখন আমি করছি তখন কিন্তু তাঁকে কেউ বলতো না যে তোমার বিয়ে হয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ।

এই তর্কের কোনো শেষ নেই আসলে। তর্ক আসলে শেষ হবে মেয়েদের প্রমাণ দিয়ে। তুমি পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছো মানে নিশ্চয়ই পরিবারে কোনো পুরুষ নেই। অর্থাৎ আমরা পুরুষদের উপরই দায়িত্ব নেওয়ার ভার দিয়েছি। নারীকে সেই যোগ্য ভাবি না।

কারণ নারীর কাজও কিন্তু ঠিক করে দেওয়া। বিয়ে আর পরের ঘরে সংসার। জন্ম যেখানে হয়েছে সেটাই যে নারী পুরুষ উভয়ের পরিবার, উভয় যে পরিবারের কাছে দায়বদ্ধ সেটা মানতে চাই না।

এটা আমাদের সমাজের জন্য কুৎসিত সত্য। এখানে একজন আয় করে বাকিজন খায়। আর এই একজন অধিকাংশ সময়ই হয় পুরুষ। মাঝে সাঝে যদি এমন কাউকে পাওয়া যায় যে নারী এবং তার আয়েই পরিবার চলে সেখানেও কিন্তু ব্যাপারটা হতাশাজনক হয়। পরিবারে উপার্জনক্ষম কোনো ছেলে না থাকার আফসোস। ছেলের অভাবে মেয়ে পরিবারের ঘানি টানছে সেটা দেখে আফসোস।

সেক্ষেত্রে মেয়েদের বাহবা দেই না তাও না। দেই কিন্তু সেটা কারো প্রক্সি হিসেবেই দেই। ছেলে হওয়ার প্রক্সি। এই কাজ ছেলেদের। ছেলে না থাকায় মেয়ে এই কাজ করছে সেটার প্রক্সি।

আমরা ছেলে মেয়েদের শিশুকাল থেকেই এটাই শিক্ষা দেই, ছেলে ঘরের হাল ধরবে। বড়ো হয়ে বাবার ব্যবসা দেখবে। বড়ো চাকরি করবে, সংসারের আয় উন্নতি হবে। আর মেয়ের বেলায়? সে বড়ো হবে পরের বাড়ি যাবে সেখানে বাবা মার মুখ উজ্জ্বল করবে।

মেয়ে যদি বড়ো হয়ে চাকরি করেও বা তবু নিজ বাবা মার দায়িত্ব মেয়েরাও নিবে এটা ঠিকঠাক মতো শিক্ষা হয়ে উঠে না। বরং কোনো কারণে যদি মেয়ের আয়ে চলতে হয় সেটা মান-সম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ ছেলের আয়ে পরিবার চললে সম্মান বাড়ে! হুহু করে বাড়ে!

এখানে আমরা শেখাই এই বাড়ি মেয়েদের বাড়ি না। মেয়েদের বাড়ি অন্যেরটা। কেনো? যে পরিবারে সে জন্ম নিয়েছে সে পরিবারই কেনো তার নিজের পরিবার হবে না? আপন বাড়ি হবে না?

ছেলেদের যেমন নিজ পরিবারের প্রতি দায়িত্ব থাকবে মেয়েদেরও থাকবে। সেও যোগ্য হবে যোগ্যতা অনুযায়ী আয় করবে। সে আয় দিয়ে পরিবারের দায়িত্ব নিবে। কেনো সব সময় পুরুষের একার আয়েই সংসার চলবে? হাত পা তো দুজনেরই থাকে নাকি!

এখন খুব মোক্ষম একটা হাতিয়ার নিয়ে কেউ কেউ এগিয়ে আসবে আর বলবে, বিয়ে তো করবেই, আজীবন তো একা থাকবে না। সেখানে কি ছেলেরা ঘরজামাই হয়ে থাকবে? না রে ভাই। কেউ কাউকে ঘরজামাই করে রাখতেও চায় না। যদিও ঘরবউ হয়ে রাখতে সব পুরুষরাই কম বেশি চায়। সে আলাপ পড়ে।

বিয়ে করতে কারো মানা নেই। একা থাকতেও কেউ বলছে না। তবে দুটো পরিবারের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী স্বামী স্ত্রীর থাকা নির্ভর করা উচিত। মেয়ের পরিবারে দেখাশোনা করার কেউ নেই আর সেখানে মেয়ে সব সময় শ্বশুর বাড়ি থাকবে কারণ সেটা নাকি নিয়ম! তবে সেই নিয়মের পরিবর্তন হওয়া উচিৎ।

পরিবর্তন শিশুকালের শিক্ষাতেও আসা উচিৎ। ছেলে হোক বা মেয়ে দুজনই পরিবারের দেখাশোনা করবে। পরিবারের দায়িত্ব শুধুমাত্র ছেলেদের একার দায়িত্ব না। পরিবারে মেয়েরাও বড়ো হচ্ছে, যোগ্য হচ্ছে। এই যোগ্যতা শুধুমাত্র বিয়ে করার যোগ্যতা না হোক। দায়িত্ব ছেলে মেয়ে উভয়ের এই বোধ সবার আগে মেয়েদের মাথায়ও ঢুকতে হবে।

শুনতে খারাপ লাগলেও এমন অনেক মেয়েও আছে যারা নিজ পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার মতো সামাজিক আর্থিক যোগ্যতা থাকার পরও ভাইয়ের উপর অধিকাংশ দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চায়। কেনোনা তাদের মননেও এই শিক্ষা বিদ্যমান যে, ভাই’ই তো পরিবারের দায়িত্ব নেবে, সে কেনো? সে তো মেয়ে?

এই যে বাঁকা ভাবে অনেকেই বলে মেয়েদের আয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সৌখিনতা মাত্র, সেখানে মেয়েদেরই নিজ উদ্যোগে দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার দায় না নিলে এই সব বাঁকা মন্তব্য চলতেই থাকবে। যারা দায়িত্ব নিচ্ছে স্বেচ্ছায় তাদেরও শুনতে হবে, আপনার মত অনেকেই তো আয় করে কয়জনে বা দায়িত্ব নেয়?


  • ৪৫৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফারজানা নীলা

পেশায় একজন বেসরকারি কর্মকর্তা। ছোট গল্পকার এবং নারী বিষয়ে লিখেন। পাশাপাশি প্রাণী অধিকার নিয়েও কাজ করেন।

ফেসবুকে আমরা