একটা ভালো মেয়ে খুঁজুন

বুধবার, মার্চ ২০, ২০১৯ ৫:২৪ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


ভাই, একটা ভালো মেয়ে দেখবেন তো ছেলেটার জন্য!
 
হ্যা, আজ ভালো মেয়ে খুঁজতে এসেছি। ভালো মেয়ের ক্যাটাগরিগুলো কী কী জানেন তো?
 
বিয়ের বাজারে একটা ভালো মেয়ে খুঁজতে নামলেও আসলে ভালো মেয়ের ক্যাটাগরিতে প্রথম শর্ত আসে "সুন্দরী" মেয়ে। মেয়ে যতই যোগ্য হোক, যতই ভালো হোক, সুন্দর হওয়া সেখানে আবশ্যক।
 
 
সুন্দর খুজতে গেলে প্রথমেই আসে গায়ের রঙ! গায়ের রঙ হতে হবে শুভ্র। শুভ্র মানে এখানে সুন্দর অর্থাৎ বিয়ের বাজারে যাকে বলে "ভালো মেয়ে।" কালো মেয়েগুলো বিয়ের বাজারে বড়ই বেমানান। সে যতই যোগ্য হোক, ভালো হোক, ভালোর ক্যাটাগরিতে আমি বা আপনি তাকে কখনই ফেলতে পারবো না।
 
কি ভাবছেন? আপনি কখনই সাদা কালো নিয়ে মাথা ঘামান না! আমার প্রশ্ন, আসলেই কি? যদি তাই হয় তাহলে আপনি এ সমাজের যোগ্য নন। আমাদের সমাজে একটা কালো মেয়ে এতটাই অবাঞ্ছিত যে কালো মেয়ের জন্মের সাথে সাথে মা বাবারা তাদের নিয়ে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। একটা কালো মেয়ে মানে একটা দুঃসহ বোঝা! একটা কালো মেয়ের প্রথম পরিচয় "মেয়েটা কালো"! হোক ভালো বা মন্দ, কালো তো কালোই।
 
যে সমাজে মেয়েদের জন্মই নাকি হয় বাবার বাড়ির মেহমান হয়ে বা পরের বাড়ির আমানত হয়ে, সে সমাজে মেয়েদের বাবা মায়ের প্রথম লক্ষ্যই থাকে মেয়েকে বিয়ের বাজারের জন্য যোগ্য করে তোলা। কোরবানির হাটে যেমন মোটা তাজা টকটকে রঙের পশুগুলোর দর ভালো হয়, বিয়ের বাজারে তেমন ছিপছাপ দেহের টকটকে রঙের মেয়েগুলোর চাহিদা ভালো হয়। তাই কৃষ্ণবর্ণের মেয়েগুলোর বাবা মায়েরা খুব বিচলিত হয়ে থাকেন তাদের মেয়ের বাজার দর নিয়ে। শুনতে একটু খারাপ শুনালেও এটাই বাস্তব।
 
কি বিচ্ছিরি একটা রেওয়াজ আমরা সমাজে টিকিয়ে রেখেছি, "পাত্রী দেখা"! কি অদ্ভুতভাবে পাত্রপক্ষের সামনে একটা মেয়েকে বসানো হয়! এটা সেটা জিজ্ঞেস করা হয়! পছন্দের তারতম্য অনুযায়ী সালামীর অংক নির্ধারণ করে মেয়েটার হাতে গুজে দেয়া হয়! আর মেয়েদের বাবা মাগুলোও কি অদ্ভুতভাবে এ রেওয়াজটা চালিয়ে যাচ্ছেন! উনাদের রুচিবোধে  দেখে মাঝে মাঝে নিজের উপরই ঘৃণা হয়। নিজের সন্তানকে এভাবে উপস্থাপন করা, হেয় করা, অপমান করা, কিভাবে সম্ভব! কিভাবে পারে এ বাবা মাগুলা! শুধু বিয়ের বাজারে যোগ্য করার জন্য বা কোনমতে টিকে যাওয়ার জন্যই কি তারা তাদের কন্যাসন্তানটিকে লালন পালন করে বড় করে? এই বাজারে টেকার জন্যই কি সব?
 
ভালো ভাবে পড়ানো, এটা সেটা শেখানো, ২০ বছরের ডি.পি.এস, এইগুলাই যেন মেয়ের বাবা মায়ের জন্য নির্ধারিত কর্ম। আর মেয়ে যদি হয় কালো, তো বাবা মায়ের জন্য আরও একটা এক্সট্রা টেনশন।
 
বিয়ের বাজারের যোগ্য করে তুলতে কালো মেয়েদের বাবা মায়েরা কিছুটা বাড়তি প্রেশারেই থাকেন। দেহের রঙের ছায়ায় এই কালো মেয়েগুলোর গুণ, তাদের যোগ্যতা, তাদের মেধা কখনও কখনও বাবা মায়েরই দৃষ্টিগোচর হয় না! আর দশ জনের মত বাবা মায়েরাও সমাজ রক্ষায় ব্যস্ত।
 
সমাজের এই দশজনের লিস্টে আমিও আছি, আপনিও আছেন। সমাজের পচে যাওয়া নিয়মগুলো রক্ষা করতে করতে আমারা নিজেরাও অনেকটা পচে গিয়েছি। সমাজের ঘুনে ধরা স্ট্যান্টার্ড ফলো করতে গিয়ে আমরা আমাদের মানবিক স্ট্যান্ডার্ড থেকে অনেকটা নিচে নেমে গিয়েছি। সমাজের তৈরি অবাঞ্ছিত স্ট্যাটাস বজায় রাখতে গিয়ে আমরা আমাদের জীবনবোধ থেকেই যেন অনেকটা দূরে যাচ্ছি।
 
আমরা ভুলে যাচ্ছি, মেয়ে মানেই মেহমান না। মেয়েটাও সন্তান! মেয়েটাও মানুষ, একটা পরিপূর্ণ মানুষ! তার মেধা আছে, যোগ্যতা আছে, নিজস্ব স্বকীয়তা আছে, কিছু চাহিদা আছে, সে চাহিদা পূরণ করার প্রয়াস আছে!
 
বাবা মায়েদের কাছে অনুরোধ, সন্তানকে শুধু সন্তান ভাবুন। কৃষ্ণ হোক বা শুভ্র, আপনার মেয়েটার দেহের রঙের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তার চেষ্টাটা দেখুন। তার মেধার মুল্যায়ণ করুন৷ বিয়ের বাজারের জন্য না, পচে যাওয়া সমাজে টিকে থাকার জন্য যোগ্য করে তুলুন। একটা "ভালো" মেয়ে কেমন হয় সেটা সমাজের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী না ভেবে নিজে ভাবুন। আর ছেলের বিয়ের জন্যও "ভালো" মেয়ে খুজুন! 

  • ৪৩৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফারজানা হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একই বিভাগে এম.ফিল গবেষনায় রত।

ফেসবুকে আমরা