ফারিসা মাহমুদ

লেখক, আর্টিস্ট

কুমিরের গল্প আর কতো?

এক ছেলে পরিক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলো কুমিরের রচনা শিখে। কুমির এমন এক প্রানী যে জলেও থাকে স্থলেও থাকে, মাটিতে গর্ত করে ডিম পারে। একটা লম্বা লেজ আছে, গোল গোল দুইটা চোখ, চারটা পা এবং গা ভর্তি কাটা কাটায়। ইত্যাদি।

সেই ছেলে জীবনে আর কোন রচনাই শিখে নাই। ওই এক রচনাতেই শিক্ষা জীবন পার করে দিয়েছে। যেমন, হয়তো তার পরিক্ষায় রচনা এসেছে "আমাদের দেশের মনোরম প্রকৃতিক দৃশ্য বর্ননা করো"।

তো সেই ছাত্র লিখেছে, আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতি মনোরম। এখানে প্রকৃতি সবুজে ঘেরা। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। মাঠে গরু, ছাগল চড়ে বেড়ায়। মাঠের পাশে নদী। নদীর পারে শুয়ে কুমির রোদ পোহায়। কুমিরের গায়ে কাটা কাটা...

ধরেন, ষড় ঋতু রচনা আসলো। আমাদের দেশে ছয়টি ঋতু। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ হেমন্ত, শীত, বসন্ত। গ্রীষ্মকালে নদীর জল কমে যায়, অনেক গরম থাকে, অল্প নদীর কাদা জলে কুমির গড়াগড়ি করে। কুমিরের গায়ে কাটাকাটা...

যে প্রসঙ্গেই সে জীবনে রচনা লিখেছে, কুমির আর কুমিরের গায়ে কাটাকাটা থেকে সে বের হতে পারে নাই। ওর মাথায় এরচে বেশী আর ধরেই নাই। এই গল্প কেনো বলছি? আমাদের মাথায়ও একটা রচনাই গেঁথে আছে, "পরকিয়া"। 

যাই ঘটুক, ভেবে দেখেন আমাদের দেশে যতো ঘটনাই ঘটুক যে কোনো ঘটনা, দূর্ঘটনা খুন হোক, ডাকাতি হোক, দূর্নীতি হোক কারন একটাই পরকীয়া। ঘটনার মূল "কাটা কাটা" মানে পরকীয়া। এবং পরকীয়া কিন্তু একজন করে না। বিষয়টা ঘটার জন্যে নারী এবং পুরুষ দু'জনই লাগে। কিন্তু কাটাকাটা। নারী নরক'কা দুয়ার। সর্ব দোষ নারীর।

যাবতীয় খুনখারাবি, কোপাকুপি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ধর্ষন লুটপাটের কেস হালকা করার সহজতর উপায় হলো ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো এক নারীর চরিত্রে দোষ চাপিয়ে দেয়া৷ পরকীয়া হলে তো সোনায় সোহাগা, এটা পাবলিক সবচেয়ে বেশি খায় ৷ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগেও নারীর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে৷ যেমন ঘন ঘন ভূমিকম্প হয় কেনো, কারণ নারীরা অবাধে ঘুরাফেরা করে৷ দেশে গরম কমে না কেনো, কারণ মেয়েদের কাপড় ঠিক নাই।

আমার মনে আছে এরশাদ পতনের পরে যখন বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসলেন সেই বছর ভয়াবহ ঘুর্নিঝড় হয়েছিলো চট্টগ্রামে। আমাদের বাসার পাশে মসজিদে শুক্রবারে মাইকে খুতবা দিচ্ছিলো, মৌলানা বলছেন, নারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে তাই আল্লাহর গজব পরছে।

সেই বাবা আদমের আমল থেকে এখন পর্যন্ত এমন অনেক ঘটনার উদাহরণ দেয়া যাবে যেখানে অহেতুকভাবে নারীকে টেনে এনেছে। তারমানে সেই আদিকাল থেকেই আমাদের মাথায় "কাটা কাটা" ঢুকে বসে আছে। আমরা কাটা কাটা ছাড়া ভাবতে পারি না।

দিনের আলোয়, খোলা রাস্তায় মানুষ খুনের মত একটা ঘটনা হলো। নির্দ্বিধায় কুপিয়ে একজন মানুষকে মারা সম্ভব হলো। যেনো দেশে আইন-কানুন, মানুষ কিছুই নাই। অবলীলায় খুন করা যায়। এইটা কিছুই না। আমরা খুজে বের করি "পরকিয়া"।

খুনের পিছনে যদি মেয়েটার দায় থাকেও যদি পরকিয়াও থাকে তবু সূর্যের আলোয় ছেলেটাকে যারা কুপিয়েছে তারাই খুনী। সেটাই সত্যি। এদের দোষ মাফ হয় না। কাটা কাটা থেকে বের হয়ে আসবেন কবে আপনারা কে জানে!

549 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।