ফারিসা মাহমুদ

লেখক, আর্টিস্ট

নারীবাদী পুরুষ বিদ্বেষী নয়

নারীবাদ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অনেক সচেতন, শিক্ষিত নারীই প্রথমে বলেন, আমি কিন্তু নারীবাদী না। কেnO আপনি নারীর শ্রমের স্বীকৃতি চান না? নিশ্চয়ই চাই। আপনি আপনার অধিকার চান না? চাই। আপনি আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে চান না? চাইবো না কেনো? আপনি কি বিশ্বাস করেন আপনার মেধা এবং শক্তি পুরুষের চেয়ে কম? না তা কেনো হবে! তাহলে আপনি কেনো বলছেন আপনি নারীবাদী না?

দেখেন, আল্লাহ তালাই নারীকে সৃষ্টি করেছেন পুরুষের জন্যে। এজন্যেই নারী মা হয়, নারীর শারীরিক গঠনই এমন যে পুরুষ যা করতে পারে নারী তা পারে না। উল্টো করে ভাবুন তো- নারী ছাড়া পুরুষ ও তো বাবা হতে পারবে না। আর কে বলেছে কেবল মাত্র নারী শারীরিক গঠনের জন্যে পুরুষের সমান কাজ করতে পারবে না? এমন একটা পেশা কি আছে বর্তমানে যেটা নারীরা করছে না?- নেই, কিন্তু আমি নারীবাদী নই।

যদি নারী নিজেই ভাবে, সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে, সে কাজে পুরুষের সমান দক্ষ, না তাহলে সে নিজেকে কেনো নারীবাদী নয় বলে দাবী করে? নারীবাদী বলতে কেনো সংকোচিত হয়? বেশিরভাগ সময়েই নারীবাদ নিয়ে কথা উঠলে যে অভিযোগটা আসে সেটা এরকম- এতো কিছু বুঝি না! নারীবাদীরা খুব উগ্র হয়, এরা বিড়ি সিগারেট খায়, এদের কথাবার্তা অশ্লীল, এরা নাস্তিক। এরা ভন্ড। ভন্ড বলছেন কেনো, প্রশ্ন করলে উত্তরটা বিষয়কে এড়িয়ে ব্যক্তি আক্রমণের দিকে চলে যায়। ভণ্ড কারণ এরা নিজেদের নারীবাদী বলে কিন্তু পুরুষ ছাড়া  থাকতে পারে না। দিনভর পুরুষকে গালিগালাজ করে রাতে আবার ঠিক পুরুষের সাথেই যেয়ে শোবে। আলোচনাটা এভাবেই কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত আচরণের সাথে মিলিয়ে মূল বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। আমরা তখন ভুলে যাই, পুরুষ যখন কাজটি অবলীলায় করছে- তখন তাকে আমরা এভাবে দেখছি না। আমরা নারীকে দেখতে চাইছি, এই সমাজ নারীকে যেভাবে আটকে রাখতে চায় সেই ঘেরাটোপের মধ্যে। এটা হলো সেই দৃষ্টিভঙ্গি যা পুরুষতন্ত্র নারীদের ভেতর বুনে দিয়েছে। নারীবাদ এখানেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।

খুব সহজ কথায় নারীবাদ কি? বিংশ শতাব্দীতে উদ্ভূত একটি দর্শন যা নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়। নারীকে পুরষের অধীন করে দেখার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দিয়ে অধিকারের ক্ষেত্রে নারীর সমতা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। নারীবাদ সমাজে নারীর সমতা অর্জন, বিশেষ করে পুরুষের সমান অধিকার আদায়ের যৌক্তিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। নারীবাদ দাবী করে: নারী- নারী বলেই যে দূর্বল, এটা পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেয়া ধারণা। হাজার বছর ধরে নারীকে শিখিয়েছে, প্রকৃতিই তোমাকে দূর্বল করে তৈরি করেছে। তুমি তোমার সিদ্ধান্ত নিতে পারো না, তোমার সিদ্ধান্ত নেবে পুরুষ। সেই তোমার অধিপতি। রাষ্ট্রে, সমাজে এমনকি ঘরেও। তার সিদ্ধান্তই তোমার সিদ্ধান্ত।

বিজ্ঞান বলে এটা ভুল। ইতিহাসও বলে, এটা ভুল। মানব সভ্যতার শুরুতে নারী পুরুষের এই বৈষম্য ছিলো না। আদিকাল থেকেই খেয়াল করবেন নারী বিশেষ কয়েকটা দিন এবং গর্ভাবস্থা ছাড়া সব সময়েই পুরুষের সমান পরিশ্রমই করেছে। মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার ইতিহাসের একটা বড়ো ধাপ হচ্ছে শিকারী যুগ থেকে কৃষি যুগে পা রাখা। এই কৃষি নারীর আবিষ্কার। শুধুমাত্র একজন মানুষই দুবার নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানী মাদাম কুরি। একজন নারী। উদাহরণ দিতে গেলে শেষ হবে না। সভ্যতার প্রতিটি নিদর্শনে নারীর ভূমিকা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কিন্তু আমাদের কাছে- তবু নারী দুর্বল, নারী আধা মানুষ, নারী হীরা জহরৎ... কারণ আমাদের এভাবে ভাবতে শেখানো হয়েছে।

একদিন সকাল বেলায় আমি বাসে করে বাংলা মটর যাচ্ছিলাম। তখন অফিস যাওয়ার সময়। আমার পাশে একজন সহযাত্রী স্নান সেরে পরিপাটি হয়ে অফিসে যাচ্ছেন। মেয়েটা আমারই বয়সী । সে বলছিলো, আপা পুরুষ চাকরী করলে হয় সিংহ আর মেয়েরা চাকরী করলে হয় চোর। সে কেমন? স্বামী যখন অফিস থেকে ফিরে তার হুংকারে সিংহের তেজ। আমি অফিস করে যখন বাড়ি ফিরি তখন যেনো অপরাধ করে ফিরছি। আমাকে যে সে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে সেটাই যেনো তার মহত্ব। অথচ শিক্ষাগত যোগ্যতায় আমি তার চেয়ে কম নই। ভোরে উঠে রান্না বান্নাসহ ঘরের যাবতিয় কাজ সেরে আসি। যাতে সে আমায় বলতে না পারে যে চাকরী করে সংসার অবহেলা করছি। অফিস থেকে ফিরেও আবার সংসারের কাজে ঝাপিয়ে পরতে হয়। আপনারা কিন্তু অনেকেই এই চাকরী করা নারীর সাথে নিজের মিল পাবেন। আরেকটা ঘটনা বলি, আমাদের বাসায় ঘর ঝাড়ামোছার কাজ নিয়েছিলো একজন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের মেয়ে। ওর কাহিনী শুনলাম। বর কিছুই করে না। বাসায় শুয়ে বসে থাকে। আর সে বাড়ি বাড়ি ঠিকেঝি এর কাজ করে সংসার চালায়।

এই চরিত্র ও আপনার আসে পাশেই আছে। গ্রামের দিকে তাকালেও দেখবেন কি হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে একজন নারী। ফসলের মাঠ থেকে দপ্তরে, নির্মাণ কাজে, কোথায় নেই নারী? তারপরেও সে একজন পুরুষের সমকক্ষ নয়, তারপরেও সে সম্পূর্ন মানুষ নয়। একজন পূর্ণ মানুষের মর্যাদা সে পায় না। পুরুষ নিজেদের উচ্চতর ভাববেন, নারীর মালিক ভাববেন, নিজের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চাইবেন সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু নারীরা? তারাও। এমন অনেক নারী আছেন। যখন মিছিলে যেয়ে কোনো নারী লাঞ্চিত হয় নারীরাই বলে, ওর মিছিলে যাওয়ার কী দরকার ছিলো! যখন কোনো নারী ধর্ষিত হয় তখন নারীরাও বলেন নিশ্চয়ই মেয়েটার মধ্যে কিছু সমস্যা ছিলো। আর ওর বাইরে বের হওয়ার দরকার কী? কুতকুতে চোখের ছোকছোকে স্বভাবের স্বামী, অফিস থেকে ফিরে এসে বউকে রসিয়ে গল্প করে অফিসে তার নারী সহকর্মী তার দিকে ইশারা ইঙ্গিত করছে। স্ত্রীও তা বিশ্বাস করে এবং পাশের বাসার ভাবির সঙ্গে গল্প করে, অফিসে কি আর ভালো মেয়েরা কাজ করে! কোনো মেয়ে কাজে ভাল করলে, কেরিয়ারে উন্নতি করলে- মেয়ের খালা মামী জাতীয় মহিলারাই বলবেন, এমনিতে কি আর এত উপরে উঠে! নিশ্চয়ই বসের সাথে শোয়। আর কোনো মেয়ে সিনেমায় বা গণমাধ্যমে কাজ করলে তো কথাই নাই। সেই মেয়ে স্কুলের ভাবীদের গল্পের বিষয় কার কার সাথে সম্পর্ক হয়েছিলো কার কার সাথে শুয়েছিলো।

এই গল্প গুলো আমরা সবাই জানি তবু আমি বললাম কেনো? কারণ নারীবাদী পুরুষ বিদ্বেষী নয়। নারীবাদ এই সব ভাবনার নারীদের সাথেও লড়াইয়ের নাম। যে ভাবনা নারীকে পূর্ণ মানুষ ভাবে না, যে ভাবনা নারীর ক্ষমতাকে ছোটো করে দেখে, যে ভাবনা নারীকে পুরুষের সমান অধিকার দেয় না- সেই ভাবনাই পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা। নারীবাদ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলে। কিছু নারী যেমন পুরুষের মস্তিষ্ক নিয়ে জন্ম নেয়, তেমন কিছু পুরুষও আছে যারা নারী পুরুষের এই বৈষম্যকে সমর্থন করে না। এই পুরুষরা নারীবাদী। তারমানে নারীবাদী কেবল নারীই হবে তা নয়। এবং নারীবাদী আন্দোলন- কেবল পুরুষের বিরুদ্ধে নয়। পুরুষতন্ত্রের বৈষম্যমূলক নিপীড়নের বিরুদ্ধে এইটি একটি মানবিক অন্দোলন এবং এইটি সমধিকারের আন্দোলন। এবং আপনি যদি চান নারী তার কাজের মর্যাদা পাক, নারী এবং পুরুষ কেবল লিঙ্গের জন্যে আলাদা নয়, নারীর সম্মান এবং অধিকার একজন পুরুষের সমান, নারীও পুরুষের মতো পূর্ন মানুষ তবে আপনিও একজন নারীবাদী।

985 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।