ফারহানা রহমান

জন্মঃ ঢাকায়। লেখাপড়া করেছেন পল্লবী মডেল হাই স্কুল, লালমাটিয়া মহিলা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ। ইংরেজি সাহিত্যে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ থেকেই কবিতা লেখালেখির শুরু। সেই সঙ্গে গল্প ও গদ্য রচনাতেও সমান আগ্রহী। সিনামা তার বিশেষ দুর্বলতার জায়গা। আবৃতির প্রতিও আকর্ষণ আছে। পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেঁছে নিয়েছিলেন। বর্তমানে পারিবারিক একটি প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন। শখ; ভ্রমণ, ছবি আঁকা, গান শোনা, মুভি দেখা ও বাগান করা।

ফারহানা রহমানের ৫টি কবিতা


ঘৃণা

আমার শহরে

ঝুলন্ত মেঘের ফাঁসে বিদ্রূপ করে বেহেড মগজ

আমার শহরে 

মসজিদে মসজিদে বিকট চিৎকারে জড়পিণ্ড প্রহরীর দল 

আমার শহরে

উম্মতের পায়ের গোড়ালি ফেটে ভেসে আসে চাপচাপ রক্ত

আমার শহরে

প্রতিটি জানালার শার্সিতে ছিটানো ধূসর কান্না

আমি অপেক্ষা করি সমস্ত অন্ধ-ঘুমন্ত স্নায়ু জ্বলে ওঠার 

আমি অপেক্ষা করি অপহৃত হয়ে ঝলসানো পোড়া মাংসে আগুনের ছটা লেগে থাকার 

যদি চাও অন্তত একবার অনন্য মানবী হবো  

দু’ঠোঁট অস্ফুট অট্টহাসিতে

দোমড়ানো মুচড়ানো হৃদয়ে হানবে জ্বালা ধরে ওঠা তীব্র ঘৃণা। 

 

অনলের দাবদাহ  

এ বিমূর্ত সকালের গায়ে ঢেউ তোলে রঙধনুর স্বপ্ন ক্যানভাসের গ্রীবায়।

গমরঙা মায়াবী সংঘাত ভেসে থাকে নাভিপদ্মে।  

সূর্যকনার মতোই মানবজন্ম বিশুদ্ধ হয় মধ্যরাতে।  

এভাবে হৃদয় নিংড়ানোর মতো ফোঁটা ফোঁটা অহংকারে আকুলমায়া জমে আছে 

ডাহুকডাকা অনাদি ভোরের বিষণ্ণ আলোর কণার উৎসমুখে!

 

তুমি কী দেখেছো?

 

কতো জলজ কন্যারা যেখানে নিরুদ্দেশ হয় মহাশূন্যের স্ট্রাটোস্ফিয়ারে....!

নীল চৈতালি বাতাসে মুখ লুকায় বারবার কুয়াশা মানবীর মতো;

আমিও তখন নদীর অলস নীরবতায় ভেসে থাকি......

তীব্র অনলের দাবদাহে।।

 

নারীর মুদ্রা

নারীর মুদ্রায় নেচেছে যে জীবন প্রগাঢ় আনন্দের কোনো গল্পের নায়িকার মতো। ধুসর শূন্যতায় চাকার মতো ঘোরে স্বপ্নঘুড়ি। উড়ে উড়ে পাড়ি জমায় মেঘমল্লারের দেশে। শুভ্রতার মলিনতা আত্মস্থ হয়ে ধুলিজমে সেখানে। যেভাবে পরিত্যাক্ত কোনো রেস্তোরাঁয় শূন্য নৌকার দেহলিতে নিথর হয়ে ভেসে থাকতে হয়, জল ভেঙ্গে ভেঙ্গে জেগে ওঠার বাসনায়। নিখাদ ইন্দ্রধনুর বেশে।

নেপথ্যে রয়ে যায় দেবদারুর ঘন অন্ধকার ও নির্মমতা। কখনোবা ফিকে হয়ে আসে নিভে যায় সব আলো দূর নীলিমায়;

অথচ এমন কোনো ব্যর্থ গল্প না হলেও হয়তো হতো।

 

তবুও হোক আন্দোলন  

মোমের মতোই নুয়ে পড়া বেদনায়  

মেয়েটি ডুবছে, মরছে আবার হিম হচ্ছে  

অথচ এভাবে হিম হতে হতেও  

জলজ গাছের মতো নিথর হয় নি তো দেহ!

মনের মধ্যে যে দীর্ঘ ঢেউয়ের টান

তা উপেক্ষা করার কথাটি ভাবতে ভাবতে  

ক্লান্ত, শ্রান্ত অথবা উদ্ভ্রান্ত হয় নি তো মন?

মেয়েটি কোথায় যেন শুনেছিলো

কোনো কোনো দেশে দল বেঁধে   

উন্মুক্ত রাস্তায়

নারীর শরীর নিয়ে খেলা করে উদ্ভ্রান্ত উন্মাদ শকুনের দল!   

পুরুষ পুরুষ!

তুমি যতটা পুরুষ ততটা তো মানুষ হও নি  

তবে কি তুমিও ক্ষুধার্ত হায়েনা  

জীবন্ত নারীকে করো যত ভয়?

তাই হচ্ছে তোমার ভেতর এতো ক্ষোভ   

এতো এতো উন্মাদনা, বীভৎসতা  

নারীর জীবন্ত শরীরকে ঘিরে?  

হেম হেম! তবে হিম হোক চোখ

তবু শুচিগ্রস্ত না হোক নারীর দেহমন

যুদ্ধ আর আন্দোলনে অস্পৃশ্য থাকতে চাও কেনো তুমি নারী?  

নেশা নেশা নেশায় মিশুক তোমার প্রতিটি প্রতিবাদ  

দেহমনে ঢেলে দাও আন্দোলন!  

জেগে ওঠো নারী

আরও একটি বার, বারবার, বহু বহুবার মনে আসুক আবার আন্দোলন!

কেনো এই নিরবতা এই পরাজয়

তবে হোক প্রতিবাদ

ছড়িয়ে পড়ুক দিকে দিকে তোমার ধিক্কার 

হোক তবে আবার, আবার আন্দোলন!

 

বিপ্লব

একজন বিখ্যাত বিপ্লবী বলে গেছেন,
বিপ্লব দরকার হলে 
ঘোড়ার পেটের মধ্য লুকিয়ে থাকবে 
এবং সেখান থেকে বেরুবে সময় হলে
বিপ্লবকে বাঁচাতে হলেতো দরকার 
সার ও সেচের

আমার বিপ্লবী বন্ধুগণ! 
সেই সার? জানেন কোথায় আছে? 
সেই সার আছে জোতদার আর 
শেণিশত্রুর রক্তের মধ্যে...

বিপ্লবী বা প্রতিবিপ্লবীরা 
আজকে নিজেকে দেখুক
ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখুক

ওখানে স্টেপল ফুড বলতে কিছুই নেই আর 
শুধু কতগুলো তাজা বোমা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, আর আছে নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি
এদিকে ফাটছে এক এক করে বোমা

ভোরের আলোয় কৃষকের মেয়ে-বউ
জোতদারের ক্ষেতের ধান তুলে নিচ্ছে
কেউ কেউ পাহারায় আছে কাঁধে বন্দুকের নল
এটাই বিপ্লব...

পার্টি মরে যায়
স্পার্টাকাস থেকে চারু মজুমদার, চে গুয়েভারা
মরেছে সবাই
এম্পিডোক্লেসের মৃত্যু হয়
বিপ্লব মরে না শুধু!

আজ শ্রেণিশত্রুরা দেখুক -
শ্বেত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চেহারা লাল সন্ত্রাসের।

1109 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।