শোয়ার বিনিময়ে আত্মউন্নয়ন করা এবং প্রকাশ্যে এ কথা চর্চিত হওয়া পুরুষতান্ত্রিকতা নয়

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৯ ২:১৯ AM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


আমি একবার এক নারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকার বুদ্ধিহীন আচরণ, ব্যক্তি আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে ফেসবুকে তার শোয়াশুয়ি করে অধিক সিজিপিএ পাওয়া এবং পরবর্তীতে চাকরি পাওয়ার বিষয়ে একটা বাক্য বলেছিলাম। ফলস্বরূপ আরো কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকবৃন্দ আমাকে তেড়ে এসে বললেন, "আপনি নিজেকে নারীবাদী দাবি করে কীভাবে এই কথা বলতে পারেন? এটা হলো নারীর মগজে পুরুষতন্ত্রের বসবাস।" আমি তাদের কথাবার্তা শুনে সোজাসাপ্টা হেসেছি আর বলেছি, বুদ্ধি বাড়ান।

উদাহরণঃ কোনো নারী যদি শোয়ার বিনিময়ে মার্কস আদায় করে অথবা 'তুমি শুইলেই চাকরি পেয়ে যাবে। শোবে কি?' শর্তে রাজি হয়ে চাকরি পায় এবং কোনো লোক (নারী/পুরুষ) যদি উপযুক্ত প্রমাণ সামনে রেখে বন্ধুমহলের আড্ডায় বা সিরিয়াস আলাপে উপরোক্ত নারীর কার্যকালাপ বর্ণনা করে তাহলে বক্তাকে 'পুরুষতান্ত্রিক' তকমা দেওয়া যায় না কারণ বিনিময় প্রথায় পুরো পৃথিবী চলে সেটা অর্থ, শরীর কিংবা তৈল যে কোনো কিছুই হতে পারে।

ধরেন, উপরিউক্ত কাজ অর্থাৎ শুয়ে কোনো পুরুষও মার্কস পেতে পারে, চাকরি পেতে পারে অথবা ফিল্মে কাজের সুযোগ পেতে পারে, পায়। এক্ষেত্রে অর্থাৎ এই শোয়াশুয়ির ক্ষেত্রে পুরুষেরা নারীদের থেকে অধিকতর উন্নত অবস্থানে আছেন কারণ পুরুষেরা নারী বসদের সাথে শুয়ে পড়তে পারেন, একইসাথে বাইসেক্সুয়াল অথবা গে পুরুষ বসের সাথে শোয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে বাংলাদেশে কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশে বাইসেক্সুয়াল এবং লেসবিয়ান নারী কম। সুতরাং, শুয়ে শুয়ে আত্মউন্নয়নে নারীরা পিছিয়ে আছেই।

আপনারা বুঝেন না 'রহিম শুয়ে শুয়ে চাকরি পেয়েছে' এই বাক্য যদি পুরুষতান্ত্রিক না হয়, তবে 'রহিমা শুয়ে শুয়ে চাকরি পেয়েছে' এই বাক্যও পুরুষতান্ত্রিক না। কেউ শুয়ে চাকরি পেয়েছে বলা যা, কেউ অর্থের বিনিময়ে চাকরি পেয়েছে বলাও তা। কিন্তু আপনাদের মস্তিক এমন অক্ষে চিন্তা করার ক্ষমতা রাখে না। আপনার 'শোয়া' কর্মকে অতীব কিছু মনে করেন কিন্তু ঘুষ, দালালি, তেলবাজিকে 'সিলি ম্যাটার' ভাবেন। এমন ভাবনার ফলে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিবাহ বহির্ভূত শোয়ার ভিডিও প্রকাশে তার চাকরি নিয়ে টানাটানি হয় কিন্তু অন্য সরকারি কর্মকর্তার ঘুষ আদান-প্রদানের ভিডিও প্রকাশ হলে সে ব্যক্তির একখানা গুপ্তকেশও ছিঁড়তে পারে না কেউ।

এসব দেখে, শুনে আমি প্রায়ই বিস্মিত হই এদেশের লেখক, শিক্ষক, জনতার বুদ্ধির অগভীরতা এবং চিন্তার অস্বচ্ছতা দেখে। তারা সেক্স ভিডিওতে উত্তেজিত হয়ে ভিডিওধারী ব্যক্তিদের চৌদ্দগুষ্ঠি চুদেন কারণ সেক্স ইজ এ্যা ট্যারিবল থিং টু দেম, সেক্স ইজ এ্যা ট্যাবু টু দেম। কিন্তু এদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। আবার এরাই নারীর শরীর বিষয়ক কিছু বললেই সংগে সংগে দা-কুড়াল নিয়ে এসে হাজির হয়ে বলেন, "এটা রেসিজম। এটা পুরুষতান্ত্রিকতা।" অথচ পুরুষের শরীর বিষয়ক একই ধরনের কথাবার্তা বললে তারা নিশ্চুপ থাকেন।

এখন আমি যদি কোনো পুরুষকে উদ্দেশ্য করে বলি, অমুক শুয়ে শুয়ে শিক্ষক হয়েছেন কিংবা অমুক শুয়ে শুয়ে চাকরি পেয়েছেন। তখন ব্যাপারটা কেউ সিরিয়াসলি নেন না। উল্টা হেসেই উড়ায়ে দেন কিংবা বিশ্বাস করেন না। কিন্তু কোনো নারী শুয়ে শুয়ে শিক্ষক হয়েছেন বা চাকরি পেয়েছেন বলা মাত্রই আপনি 'পুরুষতান্ত্রিক লোক' এবং ওই নারী 'চরিত্রহীনা' তকমা পেয়ে যাবেন। কারণ এটা একটা বহু বছরের লালিত সোস্যাল সিস্টেমের ফলাফল। এই সিস্টেমে আপনার চিন্তাপদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে লকড থাকে। আপনি নিজের অজান্তে 'সাম্যবাদ' চর্চার নামে 'বর্ণবাদ' চর্চা করেন। আপনি সমতার স্লোগান দিয়ে একজন নারীর কৃতকর্ম এবং একজন পুরুষের কৃতকর্মকে একই নজরে দেখতে পারেন না।

শেষমেশ বলে দিলাম, আপনি ঘুষ দিয়ে আপনার আত্মউন্নয়ন করলে যেমন প্রকাশ্যে এই কথা বলা যায়, ঠিক একইভাবে কোনো নারী/পুরুষ শুয়ে আত্মউন্নয়ন করলে তার এই কর্ম প্রকাশ্যে বলা যাবে। এই বাক্য কোনোভাবেই পুরুষতান্ত্রিকতার ডেফিনেশনের মধ্যে পড়ে না।


  • ৫৭৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফাহমিদা জামান ফ্লোরা

শিক্ষার্থী (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা