ভালবাসা, নাকি আধিপত্য?

শনিবার, ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২০ ৩:৫৩ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


প্রেম, ভালবাসার কথা শুনলে দু'জনকে দু'জনার পছন্দ হয়েছে বা ভাল লেগেছে –এ ব্যাপারটি আমাদের মনের মাঝে ঘুরপাক খেলেও প্রকৃতপক্ষে, পূর্বের বা বর্তমানের যে কোনো সময়ের প্রেম বা ভালবাসার সম্পর্কে একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতাই পরিলক্ষিত হয় বেশী অধিকার ফলানোর নাম করে তা যে অনধিকার চর্চা হিসাবে প্রতীয়মান হয় তা অনেকে বুঝতে পারেন না বা বুঝার চেষ্টাও করেন না

অনেক আগেকার প্রেমের সম্পর্ক বেশীর ভাগই হয়তো বিয়ে পর্যন্ত গড়াতো না। তাই এ বিষয়ে বেশী কিছু বলার অধিকার রাখি না আবার প্রেমের সময় তাদের মধ্যকার মিথষ্ক্রিয়া কেমন ছিলো তা বলাও কঠিন যেহেতু তখন দু'জনের মধ্যে প্রেম চলছে কিনা তা অনুধাবন করা অন্যের পক্ষে দুষ্কর ছিলো তাছাড়া তখন প্রেম মানে ছিলো দু'জনের চোখাচোখি, চোখের ভাষায় কথা বলা তাই ধরা পড়ার ভয়ে যেখানে নিজেরই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা সেখানে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার চিন্তা বা কাজ স্বাভাবিকভাবেই অপ্রাসঙ্গিক তবে এ কথা হলফ করে বলতে পারি যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের পর পুরুষরা ভালবাসার নাম করে স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব দেখিয়ে অন্তত মানসিক নির্যাতনটা করেছেন (তা সে প্রেমের বিয়ে হোক বা না হোক)

এর পরের সময়টাতে দু'জনের মধ্যে যে প্রেমের সম্পর্ক চলমান তা পাড়া-প্রতিবেশী মোটামুটিভাবে জেনে যেতো আর তাই প্রেমের সম্পর্কে পারস্পারিক টানাপোড়েনও অন্যের দৃষ্টিগোচর হতো এই টানাপোড়েন অনেক ক্ষেত্রে প্রিয়জনকে হারানোর ভয় বা অবিশ্বাস ইত্যাদি থেকে সৃষ্টি হলেও মূলত, এর পেছনে আধিপত্য বিস্তারের একটা সূক্ষ্ণ চাল লুকিয়ে থাকতোযেমন, প্রেমিকার চলাফেরা, জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতো প্রেমিক পুরুষটি। প্রেমিকা কার সাথে কথা বলবে/ বলবে না, কার দিকে তাকাবে/ তাকাবে না এ ব্যাপারে বাঁধা-নিষেধ আরোপ করাটা প্রকৃতপক্ষে ভালবাসা প্রকাশ না করে প্রেমিকের কর্তৃত্বপরায়তাকেই প্রকাশ করে।

একইভাবে বর্তমানে দেখা যায়, প্রেমিকা কেনো অন্য ছেলের সাথে কথা বললো (সে মেয়েটির বন্ধু, ভাই, শুভাকাঙ্ক্ষীও হতে পারে), কেনো এতো সেজে ঘর থেকে বের হলো ইত্যকার তুচ্ছ বিষয় নিয়ে প্রেমিক ঝগড়া বাঁধানোর অবকাশ পায়। মজার বিষয় হলো প্রেমিকাও অন্য মেয়ের দিকে তাকিয়েছে বলে প্রেমিককে শাসানোর উপায় খোঁজে। আসলে মেয়েরা এতোদিন ধরে নিয়ন্ত্রিত হতে হতে এখন উল্টো ছেলেদেরকেই নিয়ন্ত্রণ করা শিখে গেছে। তবে হ্যাঁ, এ কথা অনস্বীকার্য যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষরা নারীর উপর প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস চালায় বলে প্রতিশোধপরায়তা, ক্ষোভ বা আত্নরক্ষার্থে নারীরা Reverse psychology প্রয়োগ করে পুরুষের পৌরষ (বেটা গিরি) প্রতিরোধের প্রচেষ্টা নেয় তাই এসব নারীকে কোনো কিছু বলার ধৃষ্টতা আমি দেখাতে চাই না কেননা, আমি প্রতিবাদে বিশ্বাসী আর অনেক ক্ষেত্রে এমন প্রতিবাদে কাজ হয়।

তবে এখানে কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করলো বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলো তা মূখ্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করা বা এর চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে আলোকপাত করা আমার উদ্দেশ্য। যদিও হুমায়ূন আজাদ তার নারী বইয়ে “প্রেম” বিষয়টিকেই পুরুষের একটি হাতিয়ার হিসাবে দেখেছেন যার সাহায্যে সে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করে বা তার উপর কর্তৃত্ব ফলায়। অর্থাৎ নারীর উপর পুরুষ আধিপত্য বিস্তারের পরিশীলন ঘটায় প্রেমের মাধ্যমে। সে চায় প্রেমিকা তাকে ঈশ্বর জ্ঞান করে তার কাছে আত্নসমর্পন করবে। পুরুষের আধিপত্য মেনে নেবে নারী। সে নিজেকে পুরুষের ভক্ত মনে করে তার বশ্যতা স্বীকার করবে, যেহেতু নারীর কাছে প্রেমই জীবনের সবকিছু। অপরদিকে, পুরুষের জীবনের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে প্রেম বিষয়টি বিরাজ করে না। তার কাছে প্রেম জীবনের অংশবিশেষ মাত্র। আর সেই চিন্তা থেকেই পুরুষ নির্ধারণ করে দেয় নারীর গণ্ডি, নির্মাণ করতে চায় তার জীবনের সীমানা প্রাচীর।

তবে বর্তমান সময়ের মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে আবার কোনো কারণ ছাড়াই (হয়ত পুরুষ বিদ্বেষী) অথবা কর্তৃত্ব প্রদর্শনের লক্ষ্যে পুরুষদের মতো পুরুষদের উপরই পুরুষতান্ত্রিকতার চর্চা করে। দেখা যায় তারা উল্টো প্রেমিকটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এটাও কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয়। সমস্যা হচ্ছে আমরা পুরুষতান্ত্রিকতা বর্জন না করে পাল্টা একে আঁকড়ে ধরছি। পদার্থ বিজ্ঞানে বলা আছে, ‘শক্তি কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়; এর কোনো বিলুপ্তি নেই।’ ঠিক সেরকম পুরুষতান্ত্রিকতা পুরুষ থেকে নারীতে প্রতিফলিত হচ্ছে, এর বিলুপ্তি ঘটছে না।

আর তাই আমার লেখনী শুধু তাদের বিরুদ্ধে যারা নিজেদের প্রভু জ্ঞান করে তাদের ভালবাসার মানুষদের উপর আধিপত্য, কর্তৃত্ব স্থাপনের রাজনীতি চালিয়ে ওদের চিন্তা, কর্ম, জীবন নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা চালান। ভালবাসার মধ্যে সংকীর্ণতা স্থান পেতে পারে না, সংকীর্ণতা থাকলে তা প্রকৃত ভালবাসা হতে পারে না। ভালবাসা হবে উদার, মহৎ। আর তাই অন্যের ব্যক্তি স্বাধীনতা মেনে নেয়াটাই ভালবাসা।

আমার অন্য একটি লেখা পড়ে জনৈক পাঠক বলেছিলেন যে তিনি তার স্ত্রীকে এতোই ভালবাসেন যে মার মতো তার স্ত্রীকে তিনি বাজারে(?) পাঠান না। আমার প্রশ্ন ছিলো, “আপনার যদি এতোই ভালবাসা তাহলে অর্ধাঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটা ভালবাসার কোন পর্যায়ে পড়ে (যেহেতু বাজারে যাওয়া না যাওয়া পাঠকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে)?”-কবি (পাঠক) নিরুত্তর। মনে মনে শুধালাম, “আপনার স্ত্রীর চোখ-কান খোলা থাকলে তো বাজারে যাবে, তার কি সেই জ্ঞান আছে? অবরোধবাসী না হলে আপনার মতো মহান(?) প্রেমিকটিকে বিয়ে করতে সে মত (যদিচ তার মত কেউ নিয়ে থাকে) দিতো না।” তবে এর প্রত্যুত্তরে অনেকেই বলবেন, নিরাপত্তার কথা ভাবলে মেয়েদের বাইরে না যাওয়াই উচিৎ। নিরাপত্তা তো পুরুষরাই নষ্ট করে। তাছাড়া পুরুষতান্ত্রিকতা আপনাদেরকে দায়িত্ববোধ, নারীর নিরাপত্তা দিতে শিখিয়েছে, তাহলে এক্ষেত্রে নিরাপত্তা নষ্ট করছেন কেনো (পুরুষতান্ত্রিকতা সম্ভবত কেবল নিজের প্রিয় নারীদের নিরাপত্তা দিতে শিখিয়েছে, পরনারীদের নয়)? এটা আবার কেমন দায়িত্ব?! আর যদি নারীকে মানুষ মনে না-ও করেন তাহলে অমানুষকে বিরক্ত করতে হবে তা কোথায় লেখা আছে? পশু; পাখি, কুকুর, বিড়াল, গরু, ছাগলকে মানুষ পোষ মানায়, আদর করে- নারীকে যদি তা-ই মনে করেন তাহলে তার প্রতি এতো ঘৃণা কেনো? বাঘ, সিংহও কিন্তু পশু, নারীকে তা মনে করলেও তো ভয় পাবার কথা! না, আপনারা তাকে নাগিনী মনে করেন, তা মনে করলে ভয় পেয়ে দূরে থাকার কথা। আসলে আপনারা নিজেরা নিরাপত্তাহীন্তায় ভুগেন, পাছে মেয়েটি আপনাকে ছেড়ে চলে যায়। নিজের দুর্বলতা আছে বলেই এই ভয়।

আবার অনেক পুরুষ নারীদের বোকামির দোহাই দেন। তারা বোকা বলে বাইরে গেলে বা অন্যের সাথে মিশলে শঠতার শিকার হবে। মেয়েরা বোকা- তাও শিখিয়েছে পুরুষতন্ত্র। তো এই বোকাদের পেছন পেছন ঘুরে বা তাদের সাথে প্রেম করে বা তাদেরকে বিয়ে করে তাদের সাথে জীবন অতিবাহিত করতে আপনাদের লজ্জা লাগে না, পৌরষে বাঁধে না? আপনাদের এই দ্বিমুখিতা জীবনেও শেষ হবে না, হবার কথাও না। কেননা তা হলে তো আর পুরুষতান্ত্রিকতা অব্যহত থাকবে না। আপনাদের তো প্রভুত্ব জাহির করা লাগবে আবার সেই প্রভুত্বকে প্রয়োগ করতে, পূজো দিতে নারী লাগবে, তবে থালা উল্টালে দেখা যাবে সেই নারী ছাড়া আপনারা একা, অসহায়, তীর্থের কাক।

একসাথে চলতে গেলে মতের, চিন্তার অমিল হতেই পারে- এবং তা খুবই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে একে অন্যের কোনো কিছু অপছন্দ করে থাকলে সেটা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা, পরিস্থিতি বিবেচনা, যুক্তি-তর্ক ইত্যাদি আমলে এনে কেনো তা পছন্দ নয় তার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, বর্ণনা দেয়া যেতে পারে। পরন্তু, কেবলমাত্র প্রাধান্য বা অধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যের উপর নিয়ন্ত্রণ নেবার প্রয়াস প্রভু-দাসের সম্পর্ককেই প্রকাশ করে, ভালবাসার নয়। যেমন, শিশুকে তার ভালর জন্য শাসন করা জায়েজ হলেও সে যখন একটু একটু করে নিজের ভাল-মন্দ বুঝতে শিখে তখন তাকে সে অনুযায়ী স্বাধীনতা দেয়া যৌক্তিক। আর যুগলের ভালবাসায় যখন উভয়েই প্রাপ্ত বয়ষ্ক আর তা না হলেও যেহেতু কেউ কারও সন্তানের পর্যায়ের নয় অর্থাৎ পথ বা জীবন চলার সঙ্গী সেখানে পরস্পরের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান প্রদর্শন করা অবশ্যম্ভাবী।


  • ৪৩১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শাহনাজ ঈভা

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে নারীবাদী ঈভা লেখালেখির পাশাপাশি বর্তমানে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল-এ প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

ফেসবুকে আমরা