ইভানা শামস

লেখক ইভানা শামসের জন্ম ঢাকায়, শিক্ষক পরিবারে। ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে, ১৯৯৩ সালে দিল্লী ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটির আই.বি.এ এবং গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে এম.বি.এ ডিগ্রি নেন। ২০+ বছর দেশের বাইরে। ১৩ বছর ইউ.কে, এখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস করেন এবং ফুল টাইম কর্পোরেট জব করেন। লেখকের তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে একুশে বই মেলায়; ইংরেজি ও বাংলা কবিতা লেখার পাশাপাশি, লেখক নিজ কবিতা আবৃত্তি করেন।

হিজাব – স্বাধীনভাবে পরুন, স্বাধীনভাবে খুলুন

একজন প্রফুল্ল মাকে হেয় না করে, জায়গা মতো আন্দোলন করুন। হিজাব ইজ মাই চয়েস - কথাটা বাংলাদেশের জন্য 'আপাতত' আংশিক সত্য। ইরানের জন্য সত্য না, মালয়েশিয়ার ইসলামিক ইউনিভার্সিটির জন্য সত্য না, ইউরোপ বা আমেরিকার অধিবাসী মুসলিমদের জন্য আসলেই চয়েস। তারা না পরতে চাইলে সরকার, প্রশাসন বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদেরকে বাধ্য করবে না। ইসলামী বাবা মায়ের পরিবার থেকে বের হয়ে গেলে সরকার তার ভরণ পোষণ দেবে। বাকি থাকলো ধর্ম, সেটাও তিনি তার ব্যক্তিগত বিদ্যাবুদ্ধি, আখেরাতের চিন্তা, ইত্যাদি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন (যদিও কোরানে হিজাবের উল্লেখ নাই, তারা নিজেরাও মনে মনে জানেন তাদের না-হিজাবি নানী দাদীরা তাদের চেয়ে বেশি ধার্মিক ছিলেন)।

যেমন গে ম্যরেজে আমার কোনো সমস্যা নাই, তেমনি কেউ হিজাব পরলে আমার কোনো সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় দুটি কারণে :

১। তিনি হিজাব পরে সুপ্তভাবে বোঝাচ্ছেন আমি (না-হিজাবি) জাহান্নামে যাবো অথবা আমি একটা স্লাট। কেউ কেউ ভরা অনুষ্ঠানে বলেও ফেলেন।

২। তালিম দিতে থাকেন - ‘হিজাব পরো, বেহেস্ত পাবা’।

কেউ যদি আমাকে এসব না বলেন, আপনার হিজাবে আমার কিচ্ছু আসে যায় না। 

যা হোক আসল কথায় আসি। উত্তরা ক্রিসেন্ট হসপিটালে দেখলাম ৯৯% নার্স, কর্মচারী হিজাব পরা। যতটুকু বুঝলাম এটা তাহলে হাসপাতালের ইউনিফর্ম। যদি না হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো পীয়ার প্রেসারে পরেছে, (আমি এক হিজাবিকে বলতে শুনেছি “হিজাব পরেন ভাবী, চেহারা অনেক কাটা কাটা সুন্দর দেখা যাবে”), মানে হচ্ছে কোনো মাথামুণ্ড না বুঝে, হুজুগে পরে, হিজাব এখন স্টাইল সিম্বল। খুব সংখ্যালঘু পাবেন যারা ধর্মীয় কারণে হিজাব পরেন। এই সব কর্মচারীদের স্বামীরা কি তাদের পিটিয়ে হিজাব পরাচ্ছে? না। তাহলে এই মেয়েদের উপর রাগ না হয়ে, হাসপাতালের প্রধান কর্মকর্তাদের উপর হন, কাজে লাগবে।

আমাদের ঢাকার বাসায় ক্লাস নাইনে পড়া একটা মেয়ে আছে। সে বললো ওদের স্কুলে হিজাব বাধ্যতামূলক, ইউনিফর্মের পার্ট, তো আমি যতই অপছন্দ করি, কোনো লাভ নাই, ওর স্কুলে হিজাব পরেই যেতে হবে। খুব অসুবিধা হলে আমি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে যেয়ে ঝগড়া করতে পারি, কিন্তু বেচারা ক্লাস নাইনের মেয়েটাকে বকে কি লাভ।

আমার মা প্রফেসর নাজনীন হক, জীবদ্দশায় মাথায় কাপড় দেন নাই। তার নামে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লায় এক গ্রামে - 'নাজনীন হাই স্কুল'। ২০১৩ সালেও যখন স্কুল ভিজিটে যাই, ছাত্রীরা হিজাব পরতো না। গত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছর গিয়ে গিয়ে দেখলাম এখন স্কুলটা পুরোপুরি হিজাবে ঢাকা। পার্সোনালি এটা দেখে আমি কষ্ট পেয়েছি, আমার প্রগিতিশীল মায়ের নামে স্কুলে এভাবে ইসলামায়ন হলো? তো, কষ্টে থাকতে না পেরে, একদিন হেডমাস্টারকে ফোন করলাম বিস্তারিত জানতে। তিনি বললেন, “১। সরকার থেকে বাধ্যতামূলক না, ২। সব স্কুলে পরে তাই তারাও করেছে (এমন কি হিন্দু ছাত্রীরাও), ৩। অন্যথায় ছেলেরা মেয়েদের ত্যক্ত করে।“ উনি কিন্তু ধর্ম টানেন নাই। এই স্কুল থেকে পাশ করা ছেলেরা, ছয়/সাত বছর ধরে ক্লাসমেটদের হিজাবে দেখে অভ্যস্ত (সোশ্যালি কন্ডিশন্ড)। হঠাৎ এরা কোনো নারীকে খোলা চুলে, ওড়না-বিহীন বক্ষে দেখলে, তাদেরকে স্লাট ভাবা এদের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। ছেলেরা ত্যক্ত বিরক্ত করলে, এটা তো স্কুলের দায়িত্ব ছেলেটাকে শাস্তি দেয়া, মেয়েটাকে কেনো হিজাব পরতে হবে? উনি সিসি টিভি লাগানোরও পদক্ষেপ নেন। কিন্তু হিজাব রাখতে হবে, কারণ গ্রামের অন্যরা হিজাব পরছে।

সুতরাং, একজন মা হিজাব পরে ক্রিকেট খেললে, সেটা শুধু তার পার্সোনাল স্ট্যান্ড না, এটা সমাজের স্ট্যান্ড, সরকারের স্ট্যান্ড, শেখ হাসিনার স্ট্যান্ড। প্রধানমন্ত্রীর উচিত হবে ১। এই সব হাসপাতাল, স্কুল থেকে ‘বাধ্যতামুলক’ হিজাব-ইউনিফর্ম তুলে দেয়া, ২। রাস্তাঘাটে ইভ-টিজিং এর শাস্তি দেয়া, ৩। যে সব স্বামী জোর করে হিজাব পরান তাদের শাস্তি দেয়া। এবং তার পরও যদি কেউ ‘ইচ্ছাকৃত’ হিজাব পরেন (ধর্মীয় অনুভূতি থেকে হোক আর হুজুগে হোক), আমি তাকে পূর্ণ সমর্থন করবো, ‘হিজাব ইজ মাই চয়েস’ নামক স্বাধীনতাকে সম্মান করবো। বুঝতে পারছেন তো - আপনার হিজাব, মানে আমার ‘স্লাট’ টাইটেল। আপনি গুড লিস্টে আছেন, আমি ব্যাড লিস্টে। তবু আমার ক্ষতি মেনে নিয়ে, আপনার হিজাব পরার ‘বাধ্যতাহীন’ স্বাধীনতা আমি চাই।

নতুবা, পাঁচ বছর পর দেশে বেড়াতে গিয়ে আমারও ‘বাধ্যতামূলক’ হিজাব পরে ঢাকার রাস্তায় বের হতে হবে, বাংলাদেশও ইরান বা আফগানিস্তানে পরিণত হবে, প্রস্তুতি নেন...অথবা বেশি বেশি স্কার্ট আর জিন্স পরুন (কাউন্টার অ্যাটাক), দেশটাকে ইউরোপ আমেরিকা বানানোর জন্য (লোল)

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।