নারী পুরুষের আচরণে পার্থক্য- হরমোনসৃষ্ট নয়, সমাজসৃষ্ট

শুক্রবার, এপ্রিল ১৩, ২০১৮ ৫:৫০ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


পূর্ববর্তী লেখায় আমি লিঙ্গভিত্তিক সামাজিকীকরণ নিয়ে কথা বলেছিলাম। লক্ষ্য করি যে, এই পেইজে দু', একজন তথাকথিত মুক্ত চিন্তাবিদ(?!) রয়েছেন যাদের কাজ হচ্ছে নারীদের সমর্থনে যা-ই বলা হয় তা সম্পূর্ণ না পড়ে, না বুঝে বা মুক্তমনে(?) গ্রহণ না করে অনর্থক তর্ক করা বা খেঁজুড়ে আলাপ জুড়ে নিজের জ্ঞান জাহির করা। তাই তাদের মতো বিশেষ-অজ্ঞদের জন্য আমার এই লেখনী, যদিও আমার দৃঢ় বিশ্বাস(?!), এক্ষেত্রেও তারা একইভাবে পাণ্ডিত্য প্রকাশের অপচেষ্টা চালাবেন।

মূল কথায় আসা যাক। আগের লেখাতে জনৈক স্বঘোষিত মুক্তমনা আমাকে বুঝাতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন যে, নারী-পুরুষের 'আচরণগত' পার্থক্য সমাজসৃষ্ট নয় মোটেও বরং তা কেবলই প্রোজেস্টেরন এবং টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাব। তবে তিনি এটা দেখেন নি যে, আমি তা কখনোই অস্বীকার না করে আরো স্পটভাবে বলতে চেয়েছি যে, এই দুটো হরমোনের জন্য তাদের দৈহিক ভিন্নতা তৈরি হয়। কিন্তু আচরণগত বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা মূলত: সমাজ গড়ে তোলে। বিষয়খানা আরেকটু পরিচ্ছন্ন করতে অস্ট্রেলিয়ান নিউরোলজিস্ট ও মনো বিশ্লেষক সিগমন্ড ফ্রয়েড এর মনো বিশ্লেষণাত্মক গবেষণা সম্বন্ধীয় কিছু ব্যাপারে এখানে আলোকপাত করছি।ফ্রয়েড মানুষের ব্যক্তিত্ব/মনো কাঠামোকে (personality/psyche structure) ৩ টি অংশে ভাগ করে এদের নামকরণ করেছেন:- id, ego এবং super-ego। প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তিকে id বলা যেতে পারে। তাই এটি সকল জৈবিক চাহিদা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, আগ্রাসন, তাড়না, কামনা, বাসনার উৎস হিসাবে গণ্য। id-ই একমাত্র বিষয় যা জন্মসূত্রে অচেতনভাবে মানুষের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে। id ভাল-মন্দ বা নৈতিকতা বিচার করতে জানে না। এর উপস্থিতিতে মানুষ তাড়নার বশবর্তী হয়ে তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি অর্জনের পন্থা খোঁজে। অর্থাৎ id হচ্ছে যন্ত্রণা উপেক্ষা করার নিমিত্তে নির্বিচারে শুধুমাত্র নিজের স্বার্থে তুষ্টি লাভের প্রবণতা। আর তাই মানব শিশু আর পশু id দ্বারা পরিচালিত হয় বেশী।

উদাহরণস্বরূপ, রাস্তায় পড়ে থাকা পয়সা কেউ যদি পকেটস্থ করে তবে সেটা হবে তার id আর এক্ষেত্রে দৃশ্যটি অন্য কারো গোচরীভূত হচ্ছে কী না, তা বিবেচনা না করেই সে কাজটি করবে।

ego এবং super-ego মূলত: মানব মনের সচেতন ও সংগঠিত অংশ। শিশু বড় হবার সাথে সাথে এ দুটো অর্জন করতে শেখে। ego বাস্তব জগৎ আর id এর মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে। অর্থাৎ কোনো কাজ বাস্তবে বা সমাজে গ্রহণযোগ্য কী না তার উপর ভিত্তি করে id কে ego পরিচালন করে। এটি মানুষকে id তথা প্রবৃত্তির প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে বলে তাৎক্ষণিক আত্মসন্তোষ নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানে মূখ্য নিয়ন্ত্রক হিসাবে কাজ করে বাস্তবতা তথা বাহ্যিক পৃথিবী। এক্ষেত্রে 'পাছে লোকে কিছু বলে' এ ব্যাপারটি কাজ করে। তাই বলা যায়, বাহ্যিক পৃথিবী এবং id এর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে ego এর প্রকাশ ঘটে। তবে ego কখনও id কে অবদমন করে না। বরং id কখন ও কোন পরিস্থিতিতে প্রকাশ করা উচিৎ বা অনুচিত তা দেখিয়ে দেয়। যেমন:- রাস্তায় পড়ে থাকা পয়সা অনেকেই পকেটস্থ করার সাহস পায় না যদি সেখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি উপস্থিত থাকে। কেননা, এতে তার মানহানি ঘটতে পারে। আমাদের সমাজে অধিকাংশ পুরুষ ego নিয়ে চলে। তারা id কে নয়, কেবল id এর প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। নিজের কাছে নয় বরং সমাজের চোখে 'ভদ্র'(?!) থাকার জন্য মুখোশ পরিধান করে। আর যারা কদাচিৎও সমাজের ধার ধারে না তাদেরকে আমরা পশু বলতেই পারি।

super-ego প্রধানত নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ তা বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি কোনো ধরণের প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দেয় না। আর তাই ভুল-শুদ্ধ, উচিৎ-অনুচিত, বিচার-বিবেচনা করে কাজ করতে সাহায্য করে super-ego। এটি আদর্শ, মূল্যবোধ, যথার্থতা (perfection) এর সাথে সম্পর্কিত বিধায় পারিবারিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত। super-ego তাই শিশুরা তাদের মা-বাবা, আত্নীয়-স্বজন এর super-ego দেখে এবং তা শিখে শিখে বড় হয়। তাছাড়া শিক্ষক বা কোনো আদর্শবান ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব থেকেও super-ego গৃহীত হতে পারে। পূর্বের উদাহরণ টেনে বলা যায়, রাস্তায় পড়ে থাকা পয়সা পকেটস্থ করার কথা কেউ যদি চিন্তায়ও না আনে তাহলে সেটা হবে তার super-ego, অর্থাৎ এখানে তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত ছিলো কী না তা মূখ্য নয়, ঐ ব্যক্তির বিবেকের উপস্থিতিই মূখ্য। সহজ কথায়, super-ego মানুষকে বিবেকবান ও মূল্যবোধ সম্পন্ন আদর্শিক ব্যক্তি হিসাবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়ে শিশুদের ছোট থেকেই সততা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, আদর্শিকতা ইত্যাদি শেখানো হয় আর শিক্ষা দেয়া হয় রাগ, কামনা, বাসনা দমন করতে বা গোপন রাখতে। তাছাড়া ধর্মীয় শিক্ষাও দেয়া হয় যাতে উপরোক্ত বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত থাকে। এগুলো খুবই ভালো এবং সমাদৃত ব্যাপার। তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিজের সুবিধার্থে এই শিক্ষাগুলো ছেলেদের চেয়ে মেয়েদেরকেই বেশী দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আর তাই পুরুষের চেয়ে নারীর super-ego বেশী আর id এর দমন বেশী এবং প্রকাশ কম। এজন্য স্বাভাবিকভাবেই গোচরীভূত হয়, যে অশ্লীল চিন্তা, কথা, ইঙ্গিত, কাজ ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা করে কম। এটা শুধুমাত্র লোকলজ্জা তথা ego এর জন্য নয়, পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে তাদের super-ego এর জন্যেও। একথা অনস্বীকার্য যে, অধিকাংশ নর-নারী ego নিয়ে চলে। তবে super-ego পুরুষদের চেয়ে নারীরা ধারণ করে বেশী। সমাজ উভয়কে এরূপ শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষদের 'পৌরুষ' এর গর্বে গর্বিত করতে id কে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। আর একারণে গাল-মন্দ, যৌন নিপীড়ন, আগ্রাসন, শারীরিক বা মানসিক সহিংসতা চালিয়ে পুরুষরা পুরুষত্ব জাহির করতে চায়। আর id এর এই ব্যাপারগুলো জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে বিরাজমান। সুতরাং, যে পুরুষ প্রবৃত্তি প্রকাশ করে সে পশুগণ্য। তথাপি ego থাকলে কেউ বাহ্যিক পৃথিবীতে 'মানুষ'(?!)-গণ্য হলেও লোক সমাজের অন্তরালে সে প্রকৃত মানুষ কী না এ ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়। তবে তারা অবশ্যই সাধারণ মানুষ। প্রকৃত মানুষ বা মহামানব বলা যেতে পারে তাদেরকে যাদের সকল ক্ষেত্রে super-ego রয়েছে। আর বিবেকই মানুষকে পশু থেকে আলাদা করেছে। সব পুরুষ মহামানব হতে পারবেন না, তবে super-ego এর সাহায্যে যথার্থতার (perfection) এর যাওয়ার চেষ্টা করতেই পারেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভাঙতে নারীদেরকে পুরুষদের মতো হওয়ার প্রয়োজন নেই বরং উল্টোটাই প্রয়োজন। আর তখন পুরুষ নির্যাতন বাড়বে না, বরং নারী নির্যাতন কমবে।


  • ৭৪৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শাহনাজ ঈভা

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে নারীবাদী ঈভা লেখালেখির পাশাপাশি বর্তমানে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল-এ প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

ফেসবুকে আমরা