সানজিদা সুলতানা

হিউম্যানিস্ট এক্টিভিস্ট

একটি মানবিক বিয়ে আর কিছু প্রশ্ন

ধরুন ইদানিংকালের ভাইরাল ইস্যুতে যত সব অডিও বের হয়েছে, তার সবই ডিপফেইক। ডিপফেইক শব্দটাই অবশ্য আমি প্রথম শুনলাম। এই ফেইক কেবল মওলানাদের বিরুদ্ধে বানানো হয়। তাও না হয় মেনে নিলাম যে তাগুতি যত খারাপ লোক মওলানাদের হেয় করতে চায় জন্যই এটা করে। মেনে নিলাম শুধু মামুনুল হক সাহেবের বক্তব্যই সত্য আর সোনারগাঁও রিসোর্টে উনার আটক হওয়া সত্য। এর বাইরে সবই মিথ্যা।

এখন চোখ কানে মোহর না মেরে আল্লাহর ওয়াস্তে নিরপেক্ষভাবে একটু চিন্তা করেন তো, যদি আপনাদের মগজে একটু পরিমাণ ঘিলু আল্লাহ রব্বুল আলামীন দিয়ে থাকেন আর কি, সবাইকে তো আর আল্লাহপাক সব দেন না।

উনি বলেছেন উনি প্রচলিত আইনে বিবাহ করেননি, শরীয়া সম্মত ভাবে বিবাহ করেছেন। বাংলাদেশ রাস্ট্র তো আপনাকে শরীয়া সম্মত ভাবে বিয়ে করতে বাঁধা দেয় না। বরং উৎসাহিত করে। সাথে স্বামীটি বা স্ত্রীটি পরবর্তীতে যাতে মিথ্যা প্রতারণার স্বীকার না হন, সেই অধিকার নিশ্চিত করার জন্য রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করেছে। এটা উনার দাবিকৃত বিয়েরও কয়েক দশক আগের কথা। তাহলে রাস্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে উনি সেই ইসলামের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক নয় বরং স্ত্রীর শরিয়তি অধিকারকে আরো নিশ্চিত করে দেয়া আইনের লঙ্ঘন করে কি রাস্ট্রকে অবমাননা করেন নি?

গেলো, করলেন রাস্ট্র অবমাননা। বাদ রইলো আল্লাহর কসম কেটে শরিয়ত সম্মত মানবিক বিয়ের প্রসঙ্গ। যাকে উনি মানবিক বিয়ে করেছেন, তার পিতা জীবিত। দুইটি প্রায় সাবালক(শরীয়া অনুযায়ী ইতোমধ্যে সাবালক), পুত্রসন্তান জীবিত আছেন। যাদেরকে ইসলাম অভিভাবক হিসেবে গন্য করে।

তার যে দুইটি ছেলেসন্তান আছেন আগের ঘরে, সেটি মামুনুল সাহেব নিজেও তার ভিডিওতে উল্লেখ করেছেন।

এমতাবস্থায় অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত কোনো নারীর বিবাহ কি শরীয়া সম্মত বা বৈধ?

আসুন কয়েকটি হাদীস পর্যালোচনা করি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘অভিভাবক ছাড়া বিবাহ সংঘটিত হয় না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১১০১; আবু দাউদ, হাদিস : ২০৮৩)।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবে তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ১০২১)

নবী (সা.) বলেন, ‘এক নারী অন্য নারীকে বিয়ে দিতে পারবে না। অথবা নারী নিজে নিজেকে বিয়ে দিতে পারবে না। ব্যভিচারিনী নিজে নিজেকে বিয়ে দেয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ১৭৮২; সহিহ জামে : ৭২৯৮)।

এইরকম অগনিত হাদীসের রেফারেন্স দেয়া যাবে যে শরীয়া অনুযায়ী বিয়েতে নারীর নিজের অনুমতি যেমন বাধ্যতামূলক তেমনি অভিভাবকের অনুমতিও কতখানি গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যাবশ্যকীয়। এবং নারী সাবালক বা তালাকপ্রাপ্তা হলেও তার অভিভাবক উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। যেখানে অভিভাবক ছাড়া নারীর ঘর থেকে বেরুনোর অনুমতি নাই, সেখানে বিয়ের মত একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নারীর একার অনুমতিতে হতে পারে না, সেটা সহজেই অনুমেয়।

এখন আপনারা বলেন, শরীয়ত সম্মতভাবে উনার এই কথিত বিয়েটি কি বৈধ হয়েছে? অনুমতি দূরের কথা, বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা জেনেছি উক্ত নারীটির, সে আমিনা তাইয়েবাই হোক বা ঝর্ণাই হোক উনার ওয়ালি বা অভিভাবকরা জানেনই না যে বিয়ে হয়েছে। অভিভাবকের অজ্ঞাতে, বা তাদের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করলে ইসলাম সেটাকে বাতিল বলে গণ্য করে, যা কিনা মাওলানা মামুনুল সাহেব নিজেও একটি ইসলামিক অনুষ্ঠাবে জানিয়েছেন আগে।

হ্যাঁ, পাত্রপাত্রী একটি শরীয়া সম্মত বিয়েতে রাজী থাকলে ওয়ালী বা অভিভাবকরা যদি বাঁধা প্রদান করে, বা কোনে ওয়ালী জীবিত না থাকেন বা সুস্থমস্তিষ্কের না থাকেন, তখন ওয়ালী হন উক্ত অঞ্চলের শাসক বা প্রশাসক। এক্ষেত্রে এইটিই ইসলামের বিধান। কিন্তু এই ভদ্রমহিলার ক্ষেত্রে তো তার ওয়ালীদের জানানোই হয় নাই।

সুতরাং আমরা বলতেই পারি, উনার এটা কোনো বিয়েই হয়নি। না শরীয়ত সম্মত ভাবে, না রাস্ট্রীয় ভাবে। আর এই দাবির পক্ষে উনার কাছে কোনো প্রমাণও নেই। যারা শরীয়া শরীয়া করে বাকিদের জীবন, আহার, নিদ্রা হারাম করে দিচ্ছেন, সেই শরীয়ার বক্তব্য কী তা কি আসলেই আপনারা জানেন, নাকি জানার চেষ্টা করেছেন কখনো?

মাওলানা সাহেব যা করেছেন উক্ত রিসোর্টে, সেটি শুধুমাত্র সেক্যুলারদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সিদ্ধ কনসেনসুয়াল সেক্স। এমনকি উনি যেভাবে জনগনের হাতে ধৃত এবং অপমানিত হয়েছেন, সেটিকেও এই সেক্যুলার আইডিওলজিই অন্যায় এবং অনধিকার চর্চা বলে মনে করে। কী আইরনি দেখেন, যেই সেক্যুলার জীবনধারার বিরুদ্ধে উনাদের জিহাদ, যেই সেক্যুলারদের কল্লা নেয়ার জন্য এত ভয়ানক তর্জন গর্জন, যেই সেক্যুলারদের এতগুলো লাশ পড়লো উনাদের কথায় গত প্রায় এক দশকে, সেই সেক্যুলার সুবিধাটিই উনি নিয়েছেন নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্য। তাও কি আপনাদের চোখ খুলবে না? নাকি এখনও হুজুরপুজারীরা হুজুরকে সকল পাপ তাপ অন্যায়ের উর্ধ্বে একজন মহামানব ভেবে অন্যায়ের পক্ষ নিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেবেন আর বাকি নিরীহ জনগনেরও শান্তির জীবন অশান্তিতে ভরিয়ে ফেতনা ফাসাদ করতেই থাকবেন?

774 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।