নাদিয়া ইসলাম

নারীবাদী

আমায় ডুবাইলি রে

আমায় ডুবাইলি রে, আমায় আরো আরো আরো ডুবাইলি রে, ডুবাইতে ডুবাইতে আমারে মাইরা ফেলাইলি রে…

‘ডুব’ নিয়া কিছু লেখার প্রাথমিক কোনো ইচ্ছা ছিলো না। আজকে ফিল্ম দেখা শেষ হওয়ার পরেও সেই ইচ্ছা জাগ্রত হওয়ার আমি কোনো সম্ভাবনা দেখি নাই। কিন্তু এরপর ফেইসবুকে ফারুকী এ্যান্ড প্রথম আলো গং-রে ‘মাস-সাইকির বিপরীতে যেতে পারাই আর্টের সবচাইতে বড় সাকসেস’ এবং ‘আর্ট কী এবং কীভাবে আর্ট হয়’ মার্কা একই সাথে উচ্চমার্গীয়- অফ ট্র্যাক- আন্ডারগ্রাউন্ড- নিউ ওয়েভ- এলিট ভাব চোদানো জগাখিচুড়ি আলাপ করতে দেইখা মনে হইলো কিছু বলা যাইতেই পারে।

না, আমি ‘ঢাকা এ্যাটাক’ এর সাথে ‘ডুব’ এর তুলনা দিবো না। দুইটা দুই ধরণের ফিল্ম। খুব স্বাভাবিক কারণেই ঢাকা এ্যাটাক যাদের ভালো লাগার কথা, তাদের কাছে ডুব ভালো লাগবে না। হলিউডের ক্লাসিক যাদের ভালো লাগে, তাদের মোটাদাগে রাশান রিয়েলিজম ভালো লাগার কথা না। কিন্তু এইক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে ঢাকা এ্যাটাকের মার্কেটিং এবং ডুবের মার্কেটিং মোটামুটি একই ঘরানার একই শ্রেণির একই দর্শকদের মাথায় রাইখা করা হইছে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে পরিচালকরা যে দুই ভিন্ন শ্রেণির দর্শকরে মাথায় রাইখা ফিল্ম বানাইছেন তা প্রাথমিকভাবে মনে হয় নাই। এখন বেশিরভাগ মানুষের কাছে ঢাকা এ্যাটাক ভালো লাগার পরে ডুব ভালো না লাগায় ডুব বলা শুরু করছে, এই ফিল্ম শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত, আর্টের সমঝদার, ‘গোওডা’, ‘ট্রুফো’, ‘কুরোসাওয়া’, ‘শ্রেব্রল’, ‘মালবাফ’, ‘পানাই’ ইত্যাদি কঠিন কঠিন বানান জানা এলিট দর্শকদের জন্যই শুধু বানানো হইছে। হিহি। খাড়ান, হাইসা লই।

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়লো। আমার পরিচিত বাংলাদেশী এক ছেলে ব্যান্ডে গান গাইতেন। আমি তখন পিংক ফ্লয়েড, মেগাডেথ, ল্যাম্ব অফ গড, এসি-ডিসি, জিমি হেন্ড্রিক্স, কুইন, আ’য়ন মেইডেন, ড্রিম থিয়েটার, নিরভানা, সিস্টেম অফ আ ডাউন ইত্যাদি হেভি মেটাল, অল্টার মেটাল এবং হার্ড রক ঘরানার গান শুনতাম। তো সেই ছেলে আমারে একদিন জোর কইরা ধইরা মাথা ও শরীর ঝাঁকাইতে ঝাঁকাইতে উনার নিজের লেখা ও সুর করা কিছু ‘হেভি মেটাল’ গান শুনাইলেন। এরপর আমারে জিগাইলেন আমার ক্যামন লাগছে তা ‘সত্যি’ কইরা বলতে। ‘সত্যি’ কইরা বলতে হওয়ায় আমি বলতে বাধ্য হইলাম যে এইগুলি গানের নামে ‘গু’ হইছে। শুধু গু হয় নাই, তিন মাস ধইরা রক্ত-আমাশয়ে আক্রান্ত রোগীর গু হইছে।

আমার কথায় আহত হইয়া এরপর উনি আমারে প্রায় দেড় হাজার শব্দের এক ই-মেইল লিখা পাঠাইলেন, যার বক্তব্য হইতেছে এইরকম- উচ্চমার্গের আর্ট বোঝা ‘সবার’ কাজ না, পৃথিবীর সব বড় বড় আর্টিস্ট তাদের জীবদ্দশায় মানুষের ভালোবাসা পান নাই, তারা মারা গেলে মানুষ বুঝতে পারছেন তারা ‘কী’ হারাইলেন, এবং গণ-মানুষ যা পছন্দ করেন তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিম্ন ও মাঝারি রুচির আর্ট এবং সেকারণেই অযি অসবোর্নের চাইতে ব্রিটনি স্পিয়ার্স বেশি জনপ্রিয়, যেইখানে অযি অসবোর্ন পৃথিবীর সেরা গায়কদের একজন- ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি সেই ই-মেইলের উত্তরে এক সেন্টেন্সে লিখছিলাম, “তাইলে তোমার মারা যাওয়ার পরে তোমার গান শুনবো। তুমি জীবিত অবস্থায় তোমার গান শুনলে আমার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।”

যদিও আমি সত্যি সত্যি স্বীকার করি, বেশিরভাগ মানুষ যা পছন্দ করেন, তা বেশিরভাগক্ষেত্রে মাঝারি মানের আর্ট। বেশি মানুষের সাইকোলজিকে ‘স্যাটিসফাই’ করতে গিয়া আর্টরে ‘কম্প্রোমাইজ’ করতে হয়। এইটাও স্বীকার করি, এই জিনিস সত্য নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত। আজকে ২০১৭ সালে বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচের অভিনয়ে টিভি সিরিজ ‘শার্লক’ বা লেডি গাগা, এ্যাডেল ও বিয়ন্সের মতো পপ গায়করা সাধারণ (?) দর্শক ও শ্রোতার কাছে যেইভাবে পৌছাইতে পারছেন, ঠিক একইভাবে তারা উচ্চমার্গীয় আর্টের সমঝদারদের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয় হইতে পারছেন। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘ফ্রেন্ডস’রে পপ কালচার বইলা যেইভাবে উচ্চমার্গীয় আর্ট নাকচ কইরা দিতে পারে, ঠিক একইভাবে এই দশকের জনপ্রিয় ‘প্রিজন ব্রেক’ বা ‘ব্রেকিং ব্যাড’রে উচ্চমার্গ দিয়া ফালায়ে দেওয়া যায় না।

এখন ২০১৭র ‘ডুব’ কি নিজেরে নব্বইয়ের দশকের অজনপ্রিয় উচ্চমার্গীয় আর্ট বইলা দাবী করতে চায়? সেই দাবীর কি যৌক্তিক কোনো জায়গা আছে তাদের? হুমায়ুন আহমেদের বায়োপিক ইত্যাদি হেনতেন বাদ দিয়া আপনি যদি নিরপেক্ষভাবে ফিল্মটা দেখেন, তাইলে আপনার কী কী মনে হবে? মনে হবে, দুর্বল কাহিনী, দুর্বল চিত্রনাট্য, দুর্বল সিনেম্যাটোগ্রাফি, দুর্বল সেট ডিজাইন, দুর্বল ক্যারেক্টার, দুর্বল অভিনয়ের, দুর্বল পরিচালনার অতি দুর্বল এক নাটক, যারে আপনি কোনো ঘরানাতে ফেলতে পারবেন না। ডুব না হইতে পারছে তথাকথিত নিম্নবিত্ত শ্রেণির ব্যবসা সফল ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বা ‘স্বামী কেন আসামী’ বা ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’, না হইতে পারছে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জনপ্রিয় ‘মাটির ময়না’ বা ‘মুক্তির গান’ বা ‘ভাত দে’ বা ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ বা ‘টাইটানিক’ বা ‘ফরেস্ট গাম্প’ বা ‘রাং দে বাসান্তি’ বা ‘থ্রি ইডিয়ট’-এর মতো কিছু, না হইতে পারছে উচ্চমার্গীয় আর্টের ‘নিশ মার্কেট’রে স্যাটিসফাই করা ‘দ্যা হোয়াইট রিবন’ বা ‘দ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ’ বা ‘রশোমন’ বা ‘দ্যা ফোর হান্ড্রেড ব্লোয’।

গতকাল রাতেই আমি সিলভিও সো’ডিনির বানানো ‘কাম আনডান (২০১০)’ ফিল্মটা দেখতেছিলাম। খুব সাধারণ পরকীয়ার গল্প নিয়া বানানো অসাধারণ এক আর্টহাউজ ঘরানার মেইনস্ট্রিম ইটালিয়ান ফিল্ম। ক্লোজ শটে নেওয়া এবং ক্যামেরা, মেকাপ, শব্দ, কৃত্রিম আলো এবং ওভার-এডিটিং-এর উচ্চমার্গীয় আর্টের কেরদানিমুক্ত একেকটা দৃশ্য দেখার সাথে সাথে মনে হইতেছিলো আমি প্রটাগনিস্ট এ্যানার মাথার ভিতর ঢুইকা যাইতেছি; তার দুঃখ, তার অস্বস্তি, তার উদ্বেগ সবকিছুই আমার দুঃখ, আমার অস্বস্তি, আমার উদ্বেগে পালটায় যাইতেছে- আমি যেন তার প্রত্যেকটা ব্যথা টের পাইতেছি!

কাম আনডান কোনোদিনই আমার প্রিয় ফিল্মের তালিকায় থাকবে না। কিন্তু কাম আনডান আধুনিক ‘ভালো ফিল্ম’ বলতে যা বোঝায় তার একটা উদাহরণ মাত্র। কোনো শক্ত স্টোরিলাইন না থাকার পরেও, তেমন কোনো ডিরেক্টোরিয়াল এডিটিং না থাকার পরেও, তেমন কোনো অসাধারণ সিনেম্যাটোগ্রাফি বা সাউন্ড ডিজাইন না থাকার পরেও এইটা এমন একটা ফিল্ম যেইটা দেখার পর এর রেশ আপনার মাথায় তিন দিন ধইরা ঘুরবে। ভালো আর্টের বৈশিষ্ট্য সেইটাই। ভালো আর্ট বুঝতে হইলে আপনার স্পেশাল ক্যাটাগরির অতিবুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী বা আর্ট এ্যাপ্রেসিয়েশান কোর্স করা পঞ্চাশ হাজার আর্টিস্টের নাম জানা ও প্রতিটা আর্ট মুভমেন্টের নাম মুখস্ত বলতে পারা অতি আঁতেলিয় সম্প্রদায়ভুক্ত প্রথম আলো গং হইতে হবে না। ভালো আর্ট নিম্ন-মধ্য-উচ্চবিত্ত আর্থ-সামাজিক শ্রেণি ও নিম্ন-মধ্য-উচ্চ শিক্ষা ব্যতিরেকে পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ বুঝতে পারেন, যদি তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়। এইটাই ভালো আর্টের একমাত্র বৈশিষ্ট্য। ভালো আর্টরে যদি ভালো খাবার হিসাবে দেখেন, তাইলে এক প্লেট হাজির বিরিয়ানি বা আপনার আম্মার হাতে রান্ধা শোল মাছের ঝোল খাওয়ার পরে সাবান দিয়া হাত ধোওয়ার পরেও আপনার হাতে যতক্ষণ তার গন্ধ লাইগা থাকবে, ততক্ষণই আপনি ভালো লাগা খারাপ লাগার অদ্ভুত অনুভূতিতে সারাদিন ভাসতে থাকবেন।

আনফরচুনেটলি, ডুব আমারে ভাসাইতে পারে নাই। পুরাপুরি টেন থাউস্যান্ড লিগ আন্ডার দ্যা সি-তে ডুবাইয়া দিছে।

 

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।