দোভাষী’র দিনিলিপি-(পর্ব-১)

শনিবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭ ৩:২০ AM | বিভাগ : ওলো সই


‘তোমার স্বামীর সাথে দেখা করলে না কেনো?’

উত্তরে বিড়বিড়িয়ে কিছু একটা বলে নাহার, তার কন্ঠস্বর তার নিজের শ্রবণসীমারই বাইরে যেতে পারে না। তার ঠোঁটের নড়া দেখে মেহেককে বুঝে নিতে হয় সে কিছু একটা বলছে, কান পেতে শোনার চেষ্টা করে, বুঝবার চেষ্টা করে কিন্তু কিছুই বুঝতে পারে না। খুব অসহায় বোধ করে নাহার। ক্লায়েন্ট কথা না বললে সে অনুবাদ করবে কী করে?

‘গত এক সপ্তাহে দু’বার এসেছেন ভদ্রলোক, তুমি একবারও দেখা করলে না’।

কিছু বলে না নাহার।

‘তোমার স্বামীকে মিস করো না তুমি?’ 
হালকাভাবে এদিক ওদিক মাথা নাড়ে সে। 
‘কেনো?’

এবারও কোনো উত্তর নেই। ভীষণ বিরক্ত বোধ করে নাহার। ঘন্টায় সতেরো পাউন্ড রেটে দুই ভাষায় কথা বেচে পেটের ভাত জোটায় সে। ক্লায়েন্ট কথা না বললে তার রোজগারটা ঠিক হালাল হয় না যেন। একবার ক্লায়েন্টের দিকে, একবার ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত একগাদা মুহুর্ত নিরবে কাটিয়ে টাইমশিটে সই নিতে ভালো লাগে না তার। ক্লায়েন্টকে কথা বলার জন্য বাড়তি পীড়াপীড়িও করার এক্তিয়ার নেই তার। ঐ কাজটা ডাক্তারের। এই ডাক্তার বেটার ধৈর্যের প্রশংসা করতে হয়। তার চেহারার বিরক্তির লেশমাত্র নেই, কোনো ধরণের অভিব্যক্তিই নেই।

ডাক্তার আবার বলে, ‘তোমার স্বামী তোমার জন্য খুব উদ্বিগ্ন’। 
এবার কথা বলে নাহার, ‘সব মিথ্যে’। 
‘মিথ্যে?’ 
‘মিথ্যে কথা বলে’। 
‘কে?’
‘সবাই’। 
‘আমিও?’

নাহার আবার চুপ। 
ডাক্তার এইবার একটু প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন। নিরবতা সম্মতির লক্ষণ, কথাটা হয়তো মনে পড়ে যায় তার।

‘তোমার কেনো মনে হয় সবাই তোমার সাথে মিথ্যা কথা বলছে? আমার সাথে তো কেউ মিথ্যা কথা বলে না?’

নাহার আবার যথারীতি চুপ।

মেহেক মনে মনে স্থির করে ফেলে এই কাজটা আর নেবে না। এজেন্সি থেকে অনুরোধ এলেও নির্বিকারভাবে না বলে দেবে।

এই শহরের বিভিন্ন হাসপাতালের মানসিক রোগীদের সাথে কাজ করছে মেহেক বেশ কয়েক বছর ধরে। এক এক সময় খুব ক্লান্ত লাগে। রোগীরা নিজেরাই তাকে ডাকার জন্য অনুরোধ করে ডাক্তারদেরকে। মানসিক রোগীদের এতো পছন্দ কেনো তাকে? মেহেক জানে না। প্রতিটা কেইসেই সে দেখেছে ডাক্তারদের প্রতি, নার্সদের প্রতি, এমনকি আত্মীয়স্বজনদের প্রতিও রোগীদের তেমন একটা আস্থা নেই। তবে তার প্রতি এতো আস্থা কেনো? তারা কি তাকেও তাদেরই একজন ভাবে? মনে মনে হাসে মেহেক। সে ও কি একটুখানি পাগল?

এক এক সময় ভাবে এই কাজগুলো আর করবে না। বড় বেশি চাপ পড়ে মনের ওপর। এজেন্সি থেকে ফোন আসে, 
‘মিস সুলতানা, ক্লায়েন্ট তোমার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ পাঠিয়েছে। মঙ্গলবার চারটার সময় ফ্রি আছো?’ 
খুব ইচ্ছে করে না বলে দেয়। সে তো ফ্রি না থাকতেই পারে। তার কী দায় পড়েছে এইসব পাগলদের বিশেষ অনুরোধে সাড়া দেবার?

শুধু ক্লায়েন্টই নয়, ডাক্তাররাও চায় একই দোভাষী বারবার ব্যবহার করতে। বিশেষ করে মানসিক রোগীদের বেলায় বারবার নতুন মানুষের আবির্ভাব ঘটলে অনেক ঝামেলা হয়। রোগী স্বচ্ছন্দ বোধ করে না, প্রতিবার নতুন দোভাষীকে নতুন করে কেস ব্রিফিং দিতে গিয়ে ডাক্তারদেরও প্রচুর সময় নষ্ট হয়। একজন পেশাদার দোভাষী হিসেবে এসব মেহেকের অজানা নয়। সে নিজেও একধরণের দায়বদ্ধতা অনুভব করে।

তাছাড়া একজন ক্লায়েন্টের জন্য একবার কাজ করার পরে তার জন্য একধরণের মমতাবোধ সৃষ্টি হয়। জানতে ইচ্ছে হয় সে কেমন আছে, অবস্থার কোনো উন্নতি হলো কী না। একদিক থেকে দেখলে এই অনুভূতিগুলো ঠিক পেশাদারিত্বের আওতায় পড়ে না। মানবতাবোধ আর পেশাদারিত্ব দুই মিলিয়ে মেহেকের পক্ষে না বলা সম্ভব হয় না খুব একটা। অনেক সময় নিজের জরুরি কোনো কাজ ফেলেও সে হাসপাতালের ডাকে ছুটে আসে।

কিন্তু অনেক হয়েছে। নাহারের জন্য আর কাজ করবে না সে। গত কয়েক মাসে নাহারের নীরবতায় ভীষণ বিরক্তি ধরে গেছে তার। কথাই যদি না বলে তো আর দোভাষী কেন প্রয়োজন? এসব দুই এক কথা বোঝানোর মত যথেষ্ট ইংরেজি জানা আছে নাহারের নিজেরই।

ডাক্তারের কথায় মেহেকের ভাবনায় ছেদ পড়ে, 
‘গতকাল তোমার মেয়েরাও এসেছিল, তারা খুব মন খারাপ করে ফিরে গেছে’।
‘যাক’। 
‘মেয়েদেরকে মিস করো না তুমি?’ 
‘সবাই আমার শত্রু’।

এতো অস্ফুট কন্ঠে কথা বলে নাহার যে কথাগুলো বুঝবার জন্য মেহেককে মাথাটা তার দিকে ঝুঁকিয়ে রাখতে হয়। ঘাড়ে ব্যথা ধরে যায়। 
নাহারের নিরবতায় এতোটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে মেহেক যে এই কথাটা অনুবাদ করার কথা তার খেয়ালই থাকে না।

ডাক্তার তাকিয়ে আছে মেহেকের দিকে, 
‘কী বলছে? তুমি অনুবাদ করছো না কেনো?’
‘আয়াম সরি। শি ইজ সেইং দে আর ওল হার এনিমিজ।’ 
আবার নাহারের দিকে তাকায় ডাক্তার, 
‘কেনো তোমার এমন মনে হয়?’

কিছু বলে না নাহার, শুধু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মেহেকের মনে হয় গত কয়েক মাসে অনেকটা ওজন বেড়েছে নাহারের। তার প্রিন্টের ম্যাক্সিটা প্রতিবারের সাক্ষাতে যেন গায়ের সাথে আরেকটু বেশি আঁটসাঁট হয়ে আসছে। তার কি একটাই ম্যাক্সি? নাকই একই প্রিন্টের অনেকগুলো? অথবা একই রকমের অনেকগুলো প্রিন্ট? মেহেক ঠিক মনে করতে পারে না।

হাসপাতালের নিয়ম মাফিক জীবন, স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া, ওষুধ-নির্ভর ঘুম নাহারের চেহারায়ও বেশ একটা জেল্লা এনে দিয়েছে।

সারাক্ষণ পান চিবোয় নাহার। ঠোঁটের সন্ধিতে জমে থাকা রক্ত-লাল পানের রস সেই সাক্ষ্যই দেয়। তেলে চুপচুপ চুলে কতদিন চিরুনি পড়েনি কে জানে? সবমিলিয়ে মেহেকের সমবয়েসী নাহারকে তার চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের বড় মনে হয়। এখানে কে পান এনে দেয় তাকে? মেহেক শুনেছে নাহারের ভাই প্রায়ই দেখতে আসে তাকে। ভাইকে এখনো বিশ্বাস করে নাহার, দেখাও করে শুধু তার সাথেই। পান সুপারি কি তবে ভাই ই নিয়মিত সাপ্লাই দিচ্ছে? ডাক্তাররা কিছু বলে না? জানতে ইচ্ছে হলেও জিজ্ঞেস করতে পারে না মেহেক। নিজে থেকে কোনো প্রশ্ন করার অধিকার নেই তার।

শুরুর দিকে নাহারের স্বামী আলিমকেও একদিন দেখেছিল মেহেক। খুব নিরীহ টাইপের লোক বলেই মনে হয়েছে। স্ত্রীর মানসিক অবস্থা নিয়ে সীমাহীন দুশ্চিন্তা ভদ্রলোকের। তার ধারণা প্রথম স্বামীর হাতে নির্যাতনের স্মৃতি নাহার ভুলতে পারেনি বলেই সে ধীরে ধীরে এই অবস্থায় উপনীত হয়েছে।

তিন মেয়েসহ নাহারকে বিয়ে করেছিলেন আলিম এ দেশে থাকার অধিকার পাওয়ার জন্যই কিন্তু স্ত্রীর প্রতি কখনো কোনো ধরণের অবহেলা করেন নি। নাগরিকত্ব লাভের জন্য নাহারের প্রতি সীমাহীন কৃতজ্ঞতা থেকে মেয়ে তিনটার ভালোমন্দের দিকেও সূক্ষ দৃষ্টি রেখেছেন সবসময়। তাদের পড়াশোনা, মানসিক বিকাশের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। মেয়েগুলোও তাকে আপন করে নিয়েছে। নিজেদের বাবা তাদের খোঁজ খবর রাখে না, তারা তাকেই বাবা বলে ডাকে। নাহারের বয়স এবং শারিরীক সুস্থতার কথা ভেবে আবার সন্তান নেয়ার কথাও ভাবেন নি তিনি। সৎ তিন মেয়েকেই নিজের সন্তানের মত লালনপালন করে এসেছেন। সবমিলিয়ে তাদের পাঁচ জনের সংসার প্রথম ক’বছর বেশ সুখেরই ছিল। নাহারের মানসিক অসুস্থতা সবকিছুকে তছনছ করে দিয়েছে।

শুরুতে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও নাহার বেশিরভাগ সময়ই মনমরা হয়ে থাকত, প্রায়ই চিৎকার করে উঠত ঘুমের মধ্যে। দুঃস্বপ্নে ফিরে আসত আগের জীবনের নির্যাতনের স্মৃতি। ঘুম ভেঙ্গে বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ত প্রায়ই। আলিম তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিতেন।

একসময় বদলে যেতে শুরু করল নাহার। বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিলো, বাড়িতে মেহমান এলে বের হতে চাইত না। নিজের মেয়েদের সঙ্গও সহ্য করতে পারতো না। আলিমকে দেখলেও কুঁকড়ে যেত। আলাদা কামরায় ঘুমাতে শুর করল একসময়। নিজের কামরায় ঢুকে প্রায়ই দরজা ভেতর থেকে লক করে দিত, নক করলেও খুলত না।

প্রায় রাতেই আলিম শুনতেন নাহার নিচের তলায় পায়চারী করছে, সিঁড়ি বেয়ে উঠছে নামছে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে। বাথরুমে গিয়ে হাত ধুচ্ছে বারবার। তার হাঁটার শব্দে, পানির শব্দে রাতে ঘুমাতে পারে না কেউ। কিছু বললেই ক্ষেপে যায় নাহার, ‘তোমরা সবাই আমার শত্রু’।

এতোদিন যেমন তেমন ছিলো। একসময় সে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিলো, শুকিয়ে যেতে শুরু করলো। বাধ্য হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিলেন আলিম। হাসপাতালে ভর্তি করা হলো নাহারকে। তার টিন-এজ মেয়ে তিনটার দায়িত্ব পুরোপুরিই এখন আলিমের উপর। এতে কোনো ক্ষোভ নেই আলিমের। তিনি চান নাহার দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে, তাদের সংসার আবার আগের মতো সুখে শান্তিতে ভরে উঠবে।

ডাক্তার আবার বললো ‘তুমি নাকি ক’দিন ধরে ঠিকমত খাচ্ছ না?’ 
বিড়িবিড়িয়ে উত্তর দেয় নাহার, ‘বিস্বাদ খাবার’ 
‘কী খেতে ভালো লাগে তোমার?’ 
কয়েক মুহুর্ত নীরবতার পর এক শব্দের উত্তর, ‘জানি না’। 
‘একটু ভেবে বলো’। 
‘আমার ভালো লাগছে না। আমি আমার কামরায় যেতে চাই’। 
‘অবশ্যই যাবে। একটু পরে যাও। তোমার কী খেতে ভালো লাগে জানতে পারলে খুব সুবিধা হতো আমাদের’। 
‘জানি না। আমার ভালো লাগছে না’।

এই বলে অনুমতির অপেক্ষা না করেই নাহার উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ডাক্তার বললেন, 
‘আই কান্ট ফোর্স ইউ টু টক, বাট দেয়ার আর আ ফিউ থিংস আই মাস্ট ফাইন্ড আউট। শুড আই বুক এনাদার এপয়েন্টমেন্ট?’

ততক্ষণে নাহার দরজার গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মেহেক পেছন থেকে অনেকটা চেঁচিয়েই বললো, 
‘আপা, অনেক কথা বাকি। আবার এপয়েন্টমেন্ট বুক করতে হবে বলছে’। 
ফিরে তাকালো নাহার। মৃদু কন্ঠে বলল, 
‘তোমাকে যেন আবার আনে, বলে দিয়ে যাও’।

এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলার পালা মেহেকের। এই ক্লায়েন্টকে নিয়ে মানসিক ভাবে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে গেলেও তার জন্য এক অদ্ভুত মমতায় মেহেকের বুকটা টনটন করে ওঠে। সে জানে তাকে আবার আসতে হবে। আবার এবং বারবার।

(লেখা শেয়ার করার জন্য সময়টা ভালো না, বাংলাদেশী পাঠকরা সবাই এখন ঘুমে। তবু দেখা যাক ক'জন পড়ে। এটা একটা বিশাল সাইজের বড়গল্প হতে পারে, উপন্যাসেও রূপ নিতে পারে। নাম নিয়ে কোনো সাজেশন থাকলে জানতে চাইব। )

 


  • ১৮৪০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জেসমিন চৌধুরী

প্রবাসী, সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা