দোলনচাঁপা দাশগুপ্ত

চিকিৎসক দোলনচাঁপা একজন কথা সাহিত্যিক। কিশোর কাহিনী, কল্পবিজ্ঞান লেখায় রয়েছে তাঁর রয়েছে মুন্সিয়ানার ছাপ। একাধিক সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত দোলনচাঁপা'র প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস "চন্দ্রতালের পরিরা"।

প্যানডেমিক ডায়েরি-০১ (চেরিরেড)

সিজারের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলো কাসকা। ছুরির ঘা বসিয়ে দিলো অতর্কিতে সিজারের বুকে। সিজার চেয়েছিলেন বাধা দিতে। কিন্তু নাহ। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। প্রায় তেত্রিশটা ছুরির ঘা এসে পড়ল ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে। আহত সিজার, রক্তমাখা সিজার- খুঁড়িয়ে, কষ্ট চেপে ব্রুটাসের কাছে গেলেন বাঁচার আর্তি নিয়ে। কিন্তু ব্রুটাসের আঘাত নেমে এলো সিজারের মৃত্যু হয়ে! একী!
মৃত্যু ?
শেষ ?
কিশোরটির চোখে জল এসে গেলো। এভাবে কেউ চলে যেতে পারে? চিরতরে?

অনলাইন ক্লাস হচ্ছে লকডাউনে। ছেলেটির মন চলে গেছে কোন সুদূরে। সারা শরীরে বর্ম এঁটে তার বাবা-মা লড়ে চলেছে হাসপাতালে। মুখ ঢাকা মাস্কে। কোনওভাবে যেনো ভাইরাস এসে কাবু না করতে পারে।

কতোদিন সে বাবার সঙ্গে গলিতে ক্রিকেট খেলেনি। দাবার বোর্ড খোলেনি। কতোদিন হয়ে গেলো মায়ের গায়ের গন্ধ পায়নি ছেলেটা। মায়ের হাতের আলুপোস্ত খায়নি। আধোঘুমে কপালে হাত বোলায়নি একটা নরম হাত।

কিন্তু নাহ। মন খারাপ করলে চলবে না। তার থেকেও তার বাবা মাকে এখন বেশি দরকার সমাজের। হাজার হাজার মানুষ অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছে বাবা মায়ের দিকে। কাতর দৃষ্টিতে। ওরা যে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করছে সিজারের মতো। আর ছুরির পর ছুরি চালাচ্ছে ভাইরাসটা। ব্রুটাস!

গত বছর 'মাদার্স ডে'র দিনে ছেলেটা একটা দোকানে ঢুকেছিলো। স্কুলছুটির পর। কসমেটিক্সের দোকান। লিপস্টিক আর নেলপালিশ চাইতেই দোকানী অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো।
"কার জন্য নেবে? গার্লফ্রেন্ড?" ইতস্তত ভাবে প্রশ্নটা করেই ফেলেছিল দোকানি। তেরো বছরের কিশোরও আজকাল বান্ধবীর মন জোগাতে শপিং করে! কী দিনকাল এলো!
"লাইট কালার নয়, আঙ্কল ঐ চেরিরেড লিপস্টিকটা দিন। আর ঐ গ্লসি নেলপালিশটা। মা একদম সাজগোজ করার সময় পায় না।"

মা কী খুশি যে হয়েছিল সেদিন। নিজেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চটপট মেখে নিয়েছিল লিপস্টিকটা।

অনেকদিন মা'কে দেখেনি ছেলেটা। পাছে সন্তানের কোভিড সংক্রমণ হয়, মা বাবা এখন অনেক দূরে। সে রয়েছে দাদু দিম্মার জিম্মায়। তালাবন্ধ প্রাণহীন শহর। সন্ধ্যা হতেই টিমটিমে আলো। আজকের দিনে মা'কে কিছু দেওয়া হলো না।

কিন্তু ছেলেটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ফেস শিল্ড, মাস্কের মধ্যে মায়ের ঠোঁটে লেগে আছে দৃঢ়তার লিপস্টিক। গ্লাভসে ঢাকা আঙুলগুলো পরম যত্নে রোগীর হৃদয় আর ফুসফুস থেকে টেনে টেনে বার করছে এক একটা ছুরি।

মায়ের নেলপালিশের রঙটা কী ছিলো? মনে পড়ছে না।

ভালোবাসার কী রঙ?
চেরিরেড?

926 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।