দীপনা চাকমা দীপু

লেখক ও একটিভিস্ট।

পাহাড় থেকে সমতলে ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়তে হবে

 
সকাল থেকে একটা বিশেষ কাজে সারাটা দিন ব্যস্ত ছিলাম। ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিউজফিডে চোখ বুলিয়ে যেতাম। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে জানতে পেরেছিলাম খাগড়াছড়ি শহরে বলপেয়্যে আদামে বাড়ির দরজা ভেঙ্গে জোর করে ঢুকে এক চাকমা নারীকে গণধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনায় নয় জন ধর্ষক থেকে সাত জন ধর্ষক গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু ধর্ষকদের ছবি প্রকাশ না হওয়ায় তার সত্যতা নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিলো। তবে আজ সকালের দিকে গ্রেপ্তারকৃত সেটলার ধর্ষকদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে বিশাল না পাওয়ার শূণ্যতার মাঝে এক বিন্দু প্রাপ্তির ছাপ পড়লো। আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি পুলিশ প্রশাসনকে।

তবে সংশয়ের ঘোর এখনো কাটে নি কারণ অপরাধীরা আদৌ শাস্তি পাবে তো? কেননা, পাহাড়ি আদিবাসীদের ওপর সেটলার কর্তৃক সংঘটিত কোনো অন্যায় অপরাধের শাস্তির কথা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের পাতায় এখনো লেখা সম্ভব হয় নি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত এ যাবত এ ধরণের জঘন্য কোনো অপরাধে অপরাধীদের পুলিশ স্বেচ্ছায় /অনিচ্ছায় গ্রেপ্তার করতে পারে নি। যা এবারের ঘটনাটি একেবারেই অন্যতম।

অস্বীকার করার জো নেই যে অপরাধীদের ধরতে প্রশাসন একদম তৎপর ছিলো। এবারের ঘটনায় অপরাধীদের ধরতে প্রশাসন যেরকম তৎপরতা দেখিয়েছে সেরকম তৎপরতা যদি অতীতে দেখাতো তাহলে তুমাচিং, সবিতা, ইতিসহ অসংখ্য পাহাড়ি আদিবাসী নারীর জীবন ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে যেতো। ওদের অনেককেই ধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয়েছে আবার অনেককেই ধর্ষণ করে জীবন্মৃত করে রাখা হয়েছে।

গত পরশু পাহাড়ের এক নারীবাদী নেত্রী এই ঘটনা নিয়ে তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন "খাগড়াছড়িতে গ্যাং রেপ জাতিগত ইস্যু বা বিষয় নয়"। আর অনেক কতিপয় ফেসবুক ফ্রেন্ডের ওয়ালেও দেখেছি জাতিগত ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত না করার কথা। ধর্ষক নাকি ধর্ষকই। ধর্ষকের কোনো জাত-পাত হয় না।

এই বারের ধর্ষণ ঘটনা বাদে অতীতের ধর্ষণ ঘটনাগুলোর ইতিহাস দেখে আমি কিন্তু জাতিগত ইস্যু এবং রাস্ট্রীয় পলিসি মনে করি। তার কারণ হচ্ছে- সেটেলার বাঙ্গালি কর্তৃক পাহাড়ি আদিবাসী নারীরা যে রকমভাবে রাস্তা-ঘাটে, ঘরে -বাইরে শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয় ঠিক সে রকমভাবে পাহাড়ি আদিবাসী পুরুষদের দ্বারা কোনো সেটেলার বাঙ্গালি নারীরা শিকার হয় না। ( যদিও এ রকম ঘটনা ঘটুক আমি তা কখনো চাই না)।

সেটেলার বাঙ্গালি কর্তৃক ধর্ষণের শিকার পাহাড়ি আদিবাসী নারী ভিকটিমদের মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়া যায় না। রিপোর্ট ধামাচাপা দেয়া হয়। ধর্ষকদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি প্রদানের দাবিতে প্রতিবাদ মিছিলে বাঁধা প্রদান করা হয়। সমতলে কি ধর্ষণের প্রতিবাদ ও বিচার দাবী সম্বলিত মিছিলে রাস্ট্র বাঁধা দেয়? ধর্ষকের জাত ধর্ষকই যদি হয়েই থাকে তাহলে পাহাড় আর সমতলে কেনো এই পার্থক্য থাকবে?

পাহাড়ে ধর্ষণের ঘটনাগুলো ঘটায় মূলত একটা শ্রেণি। মানুন আর না মানুন ঐ শ্রেণিটা হলো সেটেলার বাঙ্গালি। তো সেই শ্রেণিকে সম্মান জানিয়ে গোটা বাঙালি জাতির দিকে কি আমরা অভিযোগের আঙ্গুল তুলবো? সেই অভিযোগ কি পুরো বাঙ্গালি জাতি মেনে নেবেন? পাহাড়ে বসবাসরত স্থানীয় বাঙালিরাও কি মেনে নেবেন?

আর আপনারা কখনো শুনেছেন পাহাড়ি আদিবাসী পুরুষ দ্বারা কোনো সেটেলার বাঙ্গালি নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে, ধর্ষিত হয়েছে, গণধর্ষণের শিকার হয়েছে বা ধর্ষণের পর নৃশংস বিকৃতভাবে হত্যার শিকার হয়েছে?

শুনেছেন? দেখেছেন? কোনো প্রমাণ আছে?

যদি নাই শুনেন, নাই জানেন, নাই দেখেন তাহলে একই পুরুষজাত হওয়ার পরেও কেনো শুধুমাত্র সেটেলার বাঙালিরাই ধর্ষণ, খুনসহ জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে? তাহলে কিভাবে মেনে নেবো ধর্ষকের কোনো জাত নেই।

আমাদের পাহাড়ি আদিবাসী পুরুষরা কিন্তু ধোয়া তুলসীপাতা নয়। তারা এখনো বউ পেটায়, মানসিক নির্যাতন করে। ঘরে বউ রেখে আবার বিয়ে করে নতুন সংসার পাতে। অবৈধ সম্পর্ক বা আপত্তিকর সম্পর্কে জড়ালে সিনালী মোকদ্দমায় নারীকে অশ্লীল প্রশ্নবাণে ঝাঁঝরা করে দেয়। নিলামেও তোলে। তবে এসব ঘটনা হিসাব করলে মাত্র এক শতাংশ।

কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্নজাতির সাথে সম্পর্কে জড়ালে ভাইরাল করে দিয়ে সমাজ ও পরিবারে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে এক পা পিছপা হয় না। এই হার হিসাব করলে শতকরা ৮৫% মনে হয়।

এসব সত্ত্বেও পাহাড়ি আদিবাসী সমাজে ধর্ষণ বলে কোনো শব্দ নেই। যদি বিচ্ছিন্নভাবে সেরকম ঘটনা ঘটে তাহলে এমন শাস্তি দেয়া হয় বাকি জীবনে কোনো নারীর দিকে মুখ তুলে তাকানোর সাহস পায় না। যদিও সেরকম উল্লেখ যোগ্য ঘটনা সংঘটিত হয় নি। এতো কঠিন শাস্তি প্রদান করা হয় যার কারণে হয়তো মনের ভিতর থাকলেও শাস্তির ভয়ে তা প্রকাশ করার সাহস পায় না।

তো ধর্ষণে অভিযুক্ত সেটেলার বাঙ্গালিদের যদি প্রশাসন উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতো তাহলে এই জঘন্য অপরাধের হার অনেক গুণ কমে যেতো। কিন্তু প্রশাসন কখনো আন্তরিক ছিলো না। ভিকটিমকে মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়া থেকে বঞ্চিত করে। গণমাধ্যম থেকে অপরাধীদের আড়াল রাখে। আর গণমাধ্যমেও সঠিক খবর আসে না।

এ ধরণের অনেক গড়মিলের কারণে আমার কাছে পাহাড়ে সেটেলার কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনাগুলো জাতিগত এবং রাষ্ট্রীয় পলিসির একাংশ। সরকার এবং প্রশাসনের স্বদিচ্ছা থাকলে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠিন শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে।

আর একটা বিষয় দেশে কোনো ঘটনা দ্রুত প্রচার পেলে সেই একই রকম সংঘটিত ঘটনার খবর বিভিন্ন জায়গা থেকে উঠে আসে। খাগড়াছড়ি বলপেয়্যে আদামের এক বাড়িতে গ্যাং রেপ ঘটনার পরপরই সিলেট এমসি কলেজে আরেক নারীর গ্যাং রেপ'র খবর উঠে আসে; যেখানে অভিযুক্তরা সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা কর্মী। তার পরের দিন আরেকটা রোমহষর্ক ঘটনার খবর পাই। অসুস্থ স্বামীর জন্য রক্ত জোগাড় করতে গিয়ে আরেক নারী গ্যাং রেপের শিকার হন। আমি জানি না এই দুই ঘটনায় ধর্ষকদের প্রশাসন গ্রেপ্তার করেছে কিনা।

পুরো দেশটাই কি ধর্ষকদের ভোগ দখলে চলে গেছে?

আমি পাহাড় থেকে সমতলে সকল নারী নিপীড়ন কারী, ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের দাবি জানাই। সবার ঘরে ঘরে মা-বোন আছে। নিজের মা-বোনকে ধর্ষণ ও নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ হোন।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।