দিনা ফেরদৌস

আমেরিকা প্রবাসী। লেখালেখির পাশাপাশি ছবি আঁকেন জল রঙে।

পরীমণির ন্যংটো নাচে আমাদের ন্যংটো চরিত্রের উন্মোচন

 

"ততক্ষণেই কলংঙ্ক ভয়, মুখে ঝাঁটার বাড়ি 

যতোক্ষণ না সবার সামনে ন্যংটো হতে পারি" 

"চেন্নাই এক্সপ্রেস" মুভিতে দীপিকার লুঙ্গি পরা ড্যান্স অনেকেই দেখেছেন, খারাপ লাগার কথা নয়, সেতো ইন্ডিয়ান নায়িকা দীপিকা, তাই বলে পরীমণিও লুঙ্গি কাঁছা মেরে নাচ করবে, তা হয় না দেখতে বড় অশ্লীল লাগে। সেই অশ্লীল দৃশ্য বার বার দেখতে ইচ্ছে করে, সেই দৃশ্যের কোথা দিয়ে পরীমণির কি কি দেখা যায়, নাচের মুদ্রার সাথে আরো কি কি দুলে তা দেখার জন্যে বার বার চোখ যায়, যতবার চোখ যায় ততবার গালি দিতে ইচ্ছে করে। যতবার গালি দিতে ইচ্ছে করে, ততবার কাম জাগে শরীরে। গালি দিয়ে দিয়ে তাকে নগর বেশ্যা বানাতে ইচ্ছা হয়। পরীমণি নগর বেশ্যা হলে নগরের কিছু ভাগ নিজেরো পাওনা হয়ে যায়। কিন্তু স্বপ্ন ভাঙলে যখন দেখা যায় দিল্লি বহু দূর, তখন তার শাস্তি দাবি করতে ইচ্ছে করে। কিসের শাস্তি? তার টাকায় তার বন্ধুদের নিয়ে সে কেনো নাচবে, সেখানে আমরা কেনো যেতে পারি না, অংশগ্রহণ করতে পারি না নাচে, সেই যন্ত্রণায়। 

এখানে কিছু কিছু নারীবাদী আপারাও এক হন, যাদের দিকে বহুদিন কেউ ফিরেও তাকায়নি গালি দিতে দিতে সোজা করে দিয়েছে। এইরার তারা সুযোগ পেয়েছেন, যদি পরীকে দুইটা গালি দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বুঝাতে পারেন আমরা ভালো হয়ে গেছি, দেখো কি সুন্দর তোমাদের সাথে তাল মিলাই, এতে যদি কিছুটা দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। আপারা সহ্য করতে পারছেন না, তাহাদের ঈমানদার প্রেমিক/স্বামীরা গালি দিতে দিতে লোলুপ দৃষ্টিতে পরীমণির কোমরে লুঙ্গি কাঁছার দৃশ্য দেখে যতোটা আত্মতুষ্টি লাভ করেন তিনাদের দিকে জীবনেও সেই দৃষ্টি নিয়ে তাকান নি। এই না তাকানোর জন্যেই এই প্রেমিক/স্বামীদের তিনাদের কাছে ঈমানদার মনে হতো, কিন্তু এখন বুঝতে পেরেছেন তিনাদের দেখানোর মতো কিছু ছিলো না বলেই উনারা দেখেননি। ফলে জ্বালা আরো বেড়ে যায় শরীরে, হৃদয়ে একসাথে। তুলনা করে বসেন দেশের আর সব নায়িকাদের সাথে, কই তারা তো এমন না। এই ন্যাকাবোকা কথা শুনলে মনে হবে অন্যান্য নায়িকাদের খুব প্রশংসা করে সকলে। এখনো মিথিলা, মাহি, অপু বিশ্বাসকে গালি দেয় লোকজন। কারণ কি? কারণ তারা নায়িকা তারা সকলের কামনার মানুষ। তারা খুব কষ্টে থাকলেও সংসার ছেড়ে চলে আসতে পারবে না। এখন বলবেন, শাবানা আপা তো এমন না। জ্বি, ঠিক বলেছেন, শাবানা আপা এমন না। শাবানা আপা এখন দেখাবেনটাই বা কি। তিনি তো অভিনয় জগতে নেই এখন। যখন ছিলেন তখনো নিশ্চয় ইরানীদের মতো বোরকা পরে ছবি করতেন না। আর শাবানা আপা যখন ছবি করতেন তখন ওই এক বিটিভি না দেখে উপায় ছিলো না, এখন পরীদের ১৫/২০টা হলিউড, বলিউড চ্যানেলের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজের জায়গা করে নিতে হয়। 

এখন আরেক দল বলবেন, সব ঠিক আছে বুঝলাম, কিন্তু এইসব ন্যংটো নাচ দেখে সমাজের মানুষ খারাপ হচ্ছে। কেনো খারাপ হয়? কারণ মানুষ নায়িকাদের ফলো করে? কেনো এই সমাজে কি আর ভালো কিছু হয় না? কি কারণে এতো ভালো ভালো বিষয় থাকতে নায়িকাদেরকেই ফলো করতে হয়। তাহলে নিজেদের গালি দিন, ভালো কিছু দেখার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে ন্যংটো নাচের দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকার জন্যে। পরীমণি ধর্ম প্রচারক না, সে নায়িকা। তার নাচে আবেদন থাকবেই আর সেই নাচ দেখতেই আপনি তার ভিডিওতে উঁকি দেন, ভিউয়ার বাড়ান। আর সেই জন্যেই সাংবাদিকরা রসিয়ে রসিয়ে এইসব উপস্থাপন করেন। তারা জানেন গালি দিলেও যৌন সুড়সুড়ি নিতে ঈমানদাররা ওইসব ভিডিওতে আসবেন, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারাও ভিউয়ার বাড়ান। এখন কিছু দুধের বাচ্চারা বলবেন; ওইসব ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করার দরকার কি? তিনাদের ভাব দেখলে মনে হবে নায়িকদের ব্যক্তিগত জীবন বলে কোনকিছু আছে বলে নিজেরা বিশ্বাস করেন। নায়িকা প্রতিদিন কয়টা আম খায় সেটাও যেখানে নিউজ হয়, আর সমালোচিত নায়িকা পরীমণি যে কাউকে পাত্তা না দেয়ার কারণে আরো বেশি সমালোচিত, সে লুকিয়ে জন্মদিন পালন করবে আর সেইটা লুকানো থাকবে। দেখতে চান দেখেন, দেখার জন্যেই পরী সব উন্মক্ত করে রেখেছে। গালি দিয়ে মুখের চুলকানি মিটাতে চান মিটান, তবুও ওইসব নাদান প্রশ্ন ছোঁড়ে দিয়েন না।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আর দু‘মুখো দল হচ্ছেন তারা, যারা এখন ভাবছেন আগে পরীমণির পক্ষে দাঁড়িয়ে ভুল করেছেন। আমি জানি না, তারা শর্ত দিয়ে পরীমণির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন কিনা যে, তারা পরীমণির পক্ষে থাকলে পরবর্তীতে পরীমণি তাদের ইচ্ছেমতো চলবে বা তাদের নিয়ে নাচবে। অভিনয়, নাচ ছেড়ে দিয়ে হিজাব বোরকা লাগিয়ে লুকিয়ে রাখবে নিজেকে। ধর্মের রেফারেন্স টানলে নাচ, গান, অভিনয় সব হারাম; এইখানে শালীন অশালীন নাচ, গান, বলে কিছু নেই। নাচাতেও চাইবেন আবার ঘোমটা দিলো না কেনো তা নিয়েও বলবেন হয় না। কথা হচ্ছে, পরীমণি কি ব্যক্তিগতভাবে কারো ক্ষতি করেছে? কোনো মানুষ খুন বা মসজিদ, পূজা মন্ডপ ভাঙার মতো কোন অন্যায় করেছে, যাতে ধর্মীও অনুভূতিতে আঘাত লাগে? নায়িকার ধর্মই নাচ, গান, আর সৌন্দর্য তুলে ধরে নিজেকে আবেদনময়ী হিসেবে দেখানো। নায়িকারা অশ্লীল বলেই আপনারা সবাই এতো মাতামাতি করছেন্‌, কিন্তু কতজন সেইভাবে প্রতিবাদ করেন, একটা নম্রভদ্র মেয়ে বা বাচ্চা যখন ধর্ষণের স্বীকার হয়? পরীমণিকে আবার জেলে ভরতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু হিজাব লাগিয়ে যেই তনু ধর্ষণের শিকার হয়ে মরে গেলো, পেরেছিলেন তার হত্যাকারীকে খোঁজে বের করে জেলে ভরতে? পেরেছিলেন মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাতকে শ্লীলতাহানি করে আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্যে হত্যাকারীকে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে। এখন বলবেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। হো সুবিধা মতো আইনকে নিজের গতির উপর ছেড়ে দিবেন আর পরীমণির বেলায় নিজেই আইনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকবেন। তখনই বোঝা যায় জুতাটা ঠিক জায়গাতেই মেরেছে পরীমণি। পরীমণি একা ন্যংটো নাচের সাথে সাথে ঈমানদাদের লুকিয়ে থাকা ন্যংটো চরিত্রটাও উন্মোচন করে দিয়ে দিয়েছে। এইবার সমালোচনার লোভে ন্যংটো নাচ দেখো বা ন্যংটো নাচ দেখার উদ্দেশ্যে কিছু সমালোচনা করে ঈমানদার সেজে যাও । 

893 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।