দায়িত্ব নিতে না পারলে নীতি বাক্য আওড়াবেন না

বুধবার, মে ২৯, ২০১৯ ৩:০৬ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


খাবার টেবিলে জামাইর সাথে কথা হচ্ছিলো নবজাতক বাচ্চা ফেলে দেয়া নিয়ে। ইদানিং দুই দিন পর পর শোনা যায় ডাস্টবিনে, বাথরুমে, রাস্তায় কেউ ফেলে গেছে নবজাতককে। আর সঙ্গে সঙ্গে সবাই দোষারোপ করতে থাকেন বাচ্চার মা'কে। তাহলে জন্ম দিলো কেনো, হেন কেনো, তেন কেনো?

একবার লিখেছিলাম আমাদের বাচ্চাদের সেক্স এডুকেশন দরকার। আমাকে ভদ্রলোকেরা গালি দিলেন, বললেন নৈতিক জ্ঞান দিলে বাচ্চারা সঠিক পথে চলবে। তাইতো প্রতিদিন দেখি, অত্যাধিক নৈতিক জ্ঞান নিয়ে হুজুররা এখন নেমেছেন ধর্ষণের প্রতিযোগিতায়। কেউ আবার বলতে যাইয়েন না শুধু হুজুরদের কথা বলছি কেনো, আর কেউ করে না? আর কেউ ধর্মের সাইনবোর্ড লাগিয়ে রাখেনি তাই তাদের কথা আর নাই বললাম। সবাই তো আর মাদ্রাসায় পড়ে হুজুরদের মতো নৈতিক জ্ঞাণ অর্জন করেনি, তাই হুজুরদের কথা বলা।

শারীরিক চাহিদা প্রাণী কুলের জৈবিক চাহিদা। আর সে চাহিদা খাওয়া, ঘুম, টয়লেট করার মতোই জরুরি। পেটে ক্ষিধে পেলে বাঘ যেমন নিজের বাচ্চা খেতেও দ্বিধা করে না, তেমনি শারীরিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে করতে এক সময় মানুষ যেকোনোভাবে সেই চাহিদা মিটাতে অস্থির হয়ে যায়। তাই রাস্তাঘাটে, ঘরে বাইরে আজ কোথাও বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধা নারী, এমনকি বোরকা পরেও নিরাপদ না কেউ।

আমার জামাই বললেন, আমেরিকার বহু রাজ্যে এবোরশন নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে চাইলে একটি মেয়ে বাচ্চা রাখতে পারে। অন্যে কিছু বললে কী যায় আসে। শুধু অন্যে সম্মান দিবে, সুবিধা দিবে, এই সেই না চাইলেই হয়। তার কথা পরনির্ভরশীলতাই এর জন্য দায়ী।

বিদেশে কেউ কারো উপর নির্ভরশীলও না, তাই অন্যে কী ভাবে না ভাবে তাতে কারো কিছুই যায় আসে না। আমি বললাম, আমাদের দেশে কেউ পরনির্ভরশীল না হলেও তার বহু সমস্যা আছে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে। পরচর্চা তো সাধারণ ব্যাপার।

প্রথমত একা একটা মেয়েকে কেউ বাসা ভাড়া দেয় না, সঙ্গে বাচ্চা হলে তো কথাই নেই। আর একটা নবজাতক বাচ্চার সঙ্গে যখন তার মায়েরও যত্নের প্রয়োজন , তখন তথাকথিত অবৈধ হলে ঘরের মানুষই তাকে নেবে না, আর পাড়া প্রতিবেশী, আত্নীয়রা কী করতে পারে তা বাদই দিলাম। সেই মা'কে যদি কাজও করতে হয় তার জন্যেও সময়ের প্রয়োজন, তার বাচ্চাকে দেখার লোকের প্রয়োজন।

স্কুলে যখন যাবে তখন বাবার পরিচয় নিয়ে আরেক যুদ্ধ। এরপর বাচ্চাকে বড় করে তোলা পর্যন্ত তার খরচ একজন স্কুল/ কলেজ / ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মায়ের পক্ষে কতোটা কঠিন তা না বুঝার কিছু না, সমাজ/পরিবার বাদ দিলেও।

জ্ঞানের কথা, নীতি কথা বলতে আমাদের পয়সা লাগে না, কিন্তু অন্যের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে হেডম লাগে। মানুষের বাস্তবতা বুঝতে হয় নিজের বাস্তবতা দিয়ে বিচার না করে। অনেকে আবার বলেন আমরা সেইসব মায়েদের ঘৃণা করি যারা বাচ্চা ফেলে দেয়, এর থেকে প্রস্টিটিউটদের সম্মান করি যারা শরীর বেঁচে বাচ্চা পালন করে। আপনারা প্রস্টিটিউটদের মুখে মুখে সম্মানই করতে পারেন। এইসব মৌখিক সম্মানে তাদের পেট যেমন ভরে না, তেমনি তাদের অবস্থারও পরিবর্তন হয় না। প্রস্টিটিউটদের ওই সম্মানই করবেন, তাকে নিজে বিয়ে করবেন না বা আপনাদের কারো জন্যে বিয়ে করায়ে নিয়ে আসবেন না, কারণ আপনারা জানেন রাতের অন্ধকারে আপনাদের, বাপ, ভাই ওখানে যান।

আপনি/আপনার কারো জন্যে সেই মেয়েটিকেও সিলেক্ট করবেন না, যে সিঙ্গেল মাদার হয়ে সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের বাচ্চা নিয়ে বাঁচতে চায়। আপনি বা আপনার পরিবারের জন্যে সেই মেয়েটিকেই আনবেন যার কোনো কলঙ্ক নেই, যার এইসব যুদ্ধের ইতিহাস নেই। অথচ হয়তো সেই মেয়েটিকেই আনবেন যার লুকিয়ে বাচ্চা ফেলে দেয়ার ইতিহাস আপনার জানা নেই।

তাই আল্লাহর ওয়াস্তে ওইসব মায়েদের দোষারোপ করা ছাড়ুন। বরং সমাজে বসবাসকারী মানুষের চিন্তা কিভাবে পরিবর্তন করা যায়, তা নিয়ে কথা বলুন। মুখে দুনিয়া উদ্ধার করা যায়। সমাজের মানুষের চিন্তা পরিবর্তন হলে সব আপনাতেই হবে না, পরিবর্তন আপনার নিজের থেকে আগে আসতে হবে।

আর সেক্স এডুকেশন নিয়ে যাদের চুল্কানি আছে তাদের বলি, বাচ্চারা যখন তাদের শারিরীক চাহিদা বুঝতে পারে, তারা তখন এক ফ্যান্টাসি জগতে বসবাস করে। ওইসব নৈতিক ফৈতিক জ্ঞান বিলি করে ওখানে লাভ নেই। ঘটনা ঘটার পর আপনার নিজের ঘরে হলেও একি কাজ করতেন । হয় ডাস্টবিনে ফেলতেন নয় হসপিটালে নিয়ে ওরে মারতেন, আর অন্যের হলে নীতিবাক্য আওড়াবেন।

যেহেতু নীতিবাক্য, ধর্মের ভয়, সামাজিক ভয় কোনোটাই কাজ করছে না, তার থেকে বলুন, সোনা বাচ্চারা যাই করো প্রটেকশন নিয়ে করো, আর যদি অঘটন ঘটেই যায় তো, ঘটনা ঘটার ৭২ ঘন্টার মধ্যে "ইমার্জেন্সি কন্টাসেপটিক" নামক একটি পিল পাওয়া যায়, লক্ষী মেয়ের মতো রাস্তার যেকোনো ফার্মেসি থেকে কিনে খেয়ে নিও (ভুলেও পাড়ার দোকান থেকে কিনো না)। নিজে যেতে না পারলে তোমার যার সাথে কাজ হয়েছে তাকে বলো এনে দিতে।

আর মেয়েদের দোষারূপ করা বন্ধ করুন। পারলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলুন। নিজের পরিবারের কারো জন্য বিয়ে করায়ে সিঙ্গেল মাদার নিয়ে আসুন, বছরে পারলে একজন প্রস্টিটিউটকে মুক্ত করুন। যে নারী একা থাকতে চায়, পারলে তাকে বাসার ব্যবস্থা করে দিন। বেশি না, এক হাজারে আপনাদের একজন করে যদি সাহায্যের হাত বাড়ান, তবে ষোল কোটিতে, একলাখ ষাট হাজার নারীর মুক্তি মিলবে একা একা বয়ে বেড়ানো যন্ত্রণা থেকে। ভেবে দেখুন। আর আমাকে গালি দিতে চাইলে দিন। এই ভয় থাকলে তো লিখা বন্ধ করে বসে থাকতে হবে।


  • ৩৫২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

দিনা ফেরদৌস

আমেরিকা প্রবাসী। লেখালেখির পাশাপাশি ছবি আঁকেন জল রঙে।

ফেসবুকে আমরা