শীলা চক্রবর্তী

পেশায় আইনজীবী শীলা চক্রবর্তীর জন্ম খুলনায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আর মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা শীলার নেশা রবীন্দ্র সঙ্গীত, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কবিতা, অভিনয় এবং লেখালেখি। মঞ্চ নাটকেও তিনি নিয়মিত।

ধর্ষণ যেখানে আতঙ্ক নয়, আতঙ্ক গর্ভধারণে

 
বিহারের ভাগলপুর শহরের অনতিদূরে প্রত‍্যন্ত গ্রামগুলোতে স্বাস্থ‍্যকর্মী হিসেবে অল্পবয়সী অবিবাহিত মেয়েরা কাজ করেন, সরকারি কর্মচারীই তারা। তাদের কাজ হলো গণ্ডগ্রামগুলোর বাড়ি বাড়ি ঘুরে বাড়ির মহিলাদের বোঝানো। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব‍্যবহার করা, বিশেষত নিরোধ ব‍্যবহার করা -যেহেতু জন্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়াও নিরোধ ব‍্যবহার যৌনরোগ আটকায়।
 
এছাড়াও গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং সদ‍্যোজাতকে দুগ্ধদানকালীন সচেতনতা, নিজেদের যত্ন, পর্যাপ্ত  সুষম আহার এবং বিশ্রাম, ডাক্তার পথ‍্যি ঔষধ করা ইত‍্যাদির গুরুত্ব বোঝানো। তো, স্বাভাবিকভাবেই এই বলয়ের গৃহবধূ মহিলাদের পেটে বিদ‍্যে তো বটেই এমনকি  শিক্ষা বলতে যা বোঝায় তাও তেমন নেই, বাড়ির পুরুষদের‌ও নেই। পুরুষরা একেবারেই পছন্দ করেন না এধরণের স্বাস্থ‍্যকর্মীরা তাদের বাড়িতে আসুন বা তাদের বাড়ির মেয়েদের সাথে কথা বলুন। তারা ক্ষুব্ধ হন, আপত্তি করেন, কলহেও জড়িয়ে পড়েন, অপমান করে বের করে দেয়ার ঘটনাও ঘটে।
 
কিন্তু আদ‍্যোপান্ত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছি যে কথাটি শুনে, তা হলো এই পুরুষরা ওই স্বাস্থ‍্যকর্মীদের ধরে ধরে রেপ করে দেন। ধর্ষণ করে দেন, তাদের কথা না শুনে তাদের অমতে তাদের বাড়ির মেয়েদের স্বাস্থ‍্যকর্মীরা নিরোধ ব‍্যবহার বা অন‍্যান‍্য জন্মনিয়ন্ত্রণ বিধি অনুসরণ করতে বলেন বলে। যাকে সমাজ বলে "শিক্ষামূলক ধর্ষণ"! যা আমরা প্রথম শুনেছিলাম নির্ভয়া জ‍্যোতি সিং গণধর্ষণ মামলায়। অপরাধী মুকেশ সিং বলেছিলো বেশি রাতে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলো অত‌এব মেয়েটি "ভালো নয়", ওকে শিক্ষা দিতেই ধর্ষণ করেছি।
 
তো এই ঘটনায় ওই পুরুষরাও মুকেশ সিংদের জাতভাই, "শিক্ষা দেবার" ঠেকা নিয়ে রেখেছেন। আর ধর্ষণ করার চেয়ে ভালো আর কী উপায় আছে শিক্ষা দেবার! এ নিয়ে আইন আদালত হ‌ওয়া তো দূরের কথা, এটা ওই স্বাস্থ‍্যকর্মীদের দোষ বলেই মনে করেন সেখানকার সমাজ, অতএব চুপচাপ হজম করে নেয়াই "নিয়তি"। জানাজানি হলে যেতে পারে চাকরিটিও! অথচ নাকি সরকারি চাকরি! উপরন্তু, এইসব ধর্ষণের ফলে যদি গর্ভবতী হয়ে পড়েন ওই স্বাস্থ‍্যকর্মীরা, তাহলে সমাজে ছিছিক্কার পড়ে যায় তাঁদের নামেই। তাঁদের‌ই দায়ী করা হয় এই ঘটনার জন‍্য। আর যদি গর্ভবতী না হন এবং উচ্চবাচ‍্য না করেন, ধর্ষণের ঘটনাটি জানলেও সমাজ তেমন একটা হ‍্যাক ছি করে না। একটি মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়ায় সমাজ তাকে এমন "ট্রীটমেন্ট" দেয়, যে আত্মহত‍্যা করে জ্বালা জুড়োতে বাধ‍্য হয় মেয়েটি, গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ে ভ্রূণ সমেত।  এ কোন জগৎ! কী অবস্থা এদের!
 
আরো বাকি আছে বিস্ময়ের। এইভাবে কাজ এবং সমাজের মধ‍্যে সমন্বয় সাধন করেই চলতে হয়, হবে, উপায় নেই.... অত‌এব এই অল্পবয়সী মেয়েরা ডাক্তারের কাছে যান "লুপ" বা কপার টি পরতে। অন্তত ছ‘মাস বা এক বছরের জন‍্য নিশ্চিন্ত, ধর্ষিত হলেও অন্তত যাতে এড়ানো যায় অবাঞ্ছিত গর্ভসঞ্চার। কিন্তু গ্রামের ডাক্তাররা মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে তাদের কার্যতঃ খেদিয়ে দেন। সব জেনেও না জানার ভান করেন তারা। বক্তব‍্য, অবিবাহিত মেয়েরা লুপ পরতে এসেছে, অর্থাৎ উদ্দেশ্য পরিষ্কার, "বদমাইশির" জন‍্য রাস্তা পরিষ্কার রাখা । অতএব গ্রামের স্বাস্থ‍্যকেন্দ্রে মেয়েগুলোর মেলে না নিজেদের জন‍্য এটুকু সহায়তাও। অতঃপর তারা ছোটে নিকটস্থ শহর ভাগলপুরে। সেখানে গিয়ে লুপ পরে এসে "নিশ্চিন্তে" যায় চাকরি করতে। ধর্ষিত হলেও যাতে গর্ভিণী হয়ে না পড়তে হয় -এটুকুই তাদের সাধের নিশ্চিন্দিপুর!
 
মহারাষ্ট্রের গ্রামে গ্রামে আখ শ্রমিক মেয়েদের নিরুপায় হয়ে  জরায়ু কেটে ফেলার কথা জেনেছিলাম , এখন এই মেয়েদের কথা জানলাম। ভাগলপুরে যাঁর কাছে ওই মেয়েরা লুপ পরতে গিয়েছিলো, সেই বাঙালি ডাক্তার ভদ্রমহিলা প্রথিতযশা সাহিত‍্যিক  নবনীতা দেবসেনের বন্ধু, তাঁর একটি লেখা পড়েই জানলাম কথাগুলো। শিউরে উঠেছি আপাদমস্তক, আর ভাবছি কোথায় আছি আমরা ...!
 

587 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।