ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতনের দায় কি কেবল নারীর!

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ ২:২৪ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


পরিবার সমাজ সবার সম্মান রক্ষার  দায়  নারীর। কিন্তু নারী ঘরে বাইরে কোথাও কি নিরাপত্তা পাবে না কোনোদিন? 

প্রতিদিন সংবাদ পত্রের পাতায় থাকছে নারীর ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যার খবর। পারিবারিক সংঘাত কিংবা পুরুষের লালসার শিকার হয়ে নারীর জীবনে কিছু না কিছু ঘটেই যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আইন বা বিচারের কোনো তোয়াক্কা করে না বলে কোনো না কোনো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নানাভাবে। নির্মম হলেও এটাই সত্য যে আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা আমরা জানতে পারি না সত্যিকার ভাবে?

পাবনার সূর্বণার হত্যাকান্ড নিয়ে সাংবাদিকরা প্রতিবাদ মানববন্ধন করছে বিচারের জন্য। তবে এ হত্যার অন্তরালে কোন সত্য লুকিয়ে আছে তা জানা হয়তো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। পারিবারিক কোন্দলের কারণে এ হত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এমন হত্যা আর কত দেখতে হবে? প্রতিবাদ আর মিছিলে সমাধান যদি হতো তাহলে হয়তো নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হবার প্রশ্ন আসতো না এতদিনে।

সূর্বণার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে রূপার ঘটনার পুনারাবৃত্তি হয়েছে টাংগাইলে। এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কিশোরী বাসে গণধর্ষণের শিকার।  

রূপা, তনুসহ আরো অনেক নাম ভুলে গেছে এ সমাজের মানুষ। কিন্তু ভুলে নাই তাদের স্বজনরা। কারণ বিচারের আশায় তাদের রয়েছে প্রতীক্ষা।

সমতল পাহাড় সবখানেই ধর্ষণ নিত্যদিনের ঘটনা। সমতলে যদিও সাময়িক প্রতিবাদের ঝড়ে উঠে নারীটির জন্য। কিন্তু পাহাড়ের কন্যাদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবার তেমন কেউ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে সেখানে রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে।    

খুব বেশী  দিন আগের কথা নয় কুমিল্লার তনু হত্যাকান্ড নিয়ে তোলপাড় হয়েছে সারা দেশ। আপন জুয়ের্লাসের মালিকের পুত্রের ধর্ষণের ঘটনার জের ধরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এসব কিছুর পরেও এ দেশে ধর্ষণ এর মতো বর্বর আচরণ করতে এতটুকু দ্ধিধা করে না পুরুষ নামের নরপশুরা।    

এ দেশে কথায় কথায় যারা নারীদের অধিকার দাবি বিচারের জন্য প্রতিবাদ মুখর হয়ে সে তথাকথিত সুশীলরা বলতে পারেন কি রেপ বা হত্যার কেসগুলো থানা আদালতে এখন কি অবস্থায় আছে? বিচারিক কাজের ঢিমাতালে কত অপরাধী বের হয়ে যায় আইনের মারপ্যাচে। আর না হয় কালক্ষেপন করে মামলার গতি নষ্ট করে দেয় অপরাধীরা প্রভাব খাটিয়ে। তাৎক্ষনিক বিচার বা সাজা হয়েছে ধর্ষকের এমন উদাহরণ নেই বলে নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে প্রতিনিয়ত এখনো।          

যার ফলে একজন নারী যখন সম্ভ্রম হারায় কিংবা পুরুষের লালসার শিকার হয়ে জীবন দেয়- সে হয়ে যায় পরিবারের কাছে কলঙ্কিত। পরিচয় হয় ধর্ষিতা হিসাবে।    

এখানেই ক্ষান্ত হয় না সমাজ। শুধু মেয়েটিকে নয় তার গোটা পরিবারকে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বলে 'এ ঘরের মেয়েকে মানুষ নষ্ট করছে'। এ পরিস্থিতিতে সে পরিবার তখন প্রতিবাদের বদলে লজ্জাবনত হয়ে পথ চলে। অন্যায়ের বিচার পাওয়ার লড়াইয়ের সাহস রাখতে পারে না।

নারীর ধর্ষণ, নির্যাতন হত্যা পত্রিকার খবর হয়, ফেবুতে তুলে পোষ্টের ঝড়। তবে কেউ বলতে পারে না কতটা হেয় হয় ধর্ষিতা, নির্যাতিত বা অকালে প্রাণ দেয়া সে নারী আর তার পরিবার।

প্রকাশিত ধর্ষণ বা নির্যাতনের ঘটনা নারীর জীবনকে বিষময় করে শেষ হয় তা কিন্তু নয়। সংসার নামের ঘরের অনেক নারীর রয়েছে অলিখিত আরেক নির্যাতন। সহবাসের নামে একজন স্ত্রীর উপর স্বামী যে শারিরীক মানসিক অত্যাচার করে তার প্রতিকার নেই। আছে শুধু চোখের জল। প্রতিকার চাইতে হলে লোকলজ্জার ভয়ে বলতে পারে না স্বামী- স্ত্রীর একান্ত বিষয়টি। বাঙালি সমাজে সহবাসের বিষয়ে নারী কথা বলার এখনো সে পরিবেশ গড়ে উঠে নি। আর এক কারণে যদি প্রতিবাদ হয় তখন মেয়েদের শুনতে হয়, "বাপের বাড়ি নয় স্বামীর বাড়িই সব' - এমন যুক্তিহীন প্রলাপ। 

মেয়ে যতই কর্মক্ষম হোক স্বামীর ঘর ছাড়া যাবে না। কারণ মেয়ের দায় পরিবারের সম্মান রক্ষা করা। সে সংসার না করলে পরিবারের সম্মান থাকবে না।' যেন পরিবারের আত্মসম্মানের দায় কেবল নারীর।  

নারীর নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে তার কর্মক্ষেত্রে। যা অনেক ভাবে অপ্রকাশিত। যদিও অবস্থার পরির্বতন হচ্ছে ক্রমশ। তথাপি জীবনের প্রয়োজনে কত নারীর জীবনের না বলা কথা চোখের জলে ভাসে তার খবর কেউ রাখে না। কিছুদিন আগে আগে ভারতের রাম রহিমের ঘটনা দেখে এ দেশে অনেক নারী এক সময় শিকল ভাঙতে চেয়েছে। কিন্তু সমাজ আর লোক নিন্দার ভয়ে আজও পারে নি ভালো মানুষের ছদ্মবেশী বেশী পুরুষদের  মুখোশ খুলে দিতে।

একজন মানুষ কাজের প্রয়োজনে সময়ের হিসাব করে জীবনের পথে চলতে পারে না। জীবনের তাগিদে পুরুষের মতো নারীকে বের হতে হয় ঘর থেকে। কিন্তু পুরুষটি তার সম্ভ্রম নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে না। তাই পথ চলতে গিয়ে যে নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে তাকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে সে মানুষরূপী হায়েনাকে দিয়ে কীভাবে সম্ভ্রম হারিয়েছে। তবুও তথাকথিত মানুষের কাছে পুরুষের লালসার শিকার ধর্ষিত নারীটি সম্ভ্রমহীন হিসাবে হয় পরিচিত। তার অপরাধ মানুষ নয় নারী হিসাবে সে পুরুষের মতো জীবনের পথে চলতে পারে না। কিন্তু প্রতিনিয়ত ঘটে যাও এসব ঘটনা থেকে আর একটা নারী নিজে যে এমন অবস্থা শিকার হবে না তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না রাষ্ট্র। কারণ দেশের আইনীয় প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে  রয়েছে যথেষ্ট দূর্বলতা।

তাই ছুটে চলা জীবনের পথে বারবার মনে হয়, 'এ সমাজে নারী হিসাবে জন্ম নেবার সকল দায় কেবল কি নারীর?' 


  • ৪৯৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

হাসিনা আকতার নিগার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পাশ করে সাংবাদিকতা পেশাতে কাজ করে আসিছ ২০০৪ সাল থেকে।মুক্তিযুদ্ধ, নারী, উন্নয়ন মূলক বিষয় নিয়ে বই ফিচার তথ্য চিত্র নিরমান সহ গল্প ও চলমান ইস্যু ভিত্তিক লেখালেখি করি বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে।

ফেসবুকে আমরা