শামীম আজাদ

কবি, লেখক।

ধর্ষকও নাকি “সম্মানিত ধর্ষক!“

 
যাই কোথা বলেন! এরা অপকর্মে ধরা পড়ার পরও সম্মানিত বলে তাদের মুক্তির দাবী তোলে মানুষ! যাক গে সে কথা। তারা তার আগে আরো মহৎ থাকে। যদিও সূর্য, জল , হাওয়া, পাথর ও পানিতে সবারই সমান অধিকার। কিন্তু তারই ব্যতয় ঘটে যখন কোনো মানুষ মাপের অন্য মানুষের কাছে ঈশ্বর হয়ে যায়। আর একটি ছাঁকনি নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের সমাজে চিহ্নিত কুলাঙ্গার পুরুষ পরিবারের জন্য ঈশ্বর। সে কিছু রেখে কিছুটা খেয়ে বাকিটা নারীর জন্য বরাদ্দ করে।
 
এখানেই কথা, তাদের কথা যারা মানুষ এবং পুরুষ নামে ঈশ্বর ঈশ্বর রাজনীতি করে। নারীর উপরে বাজ বৃষ্টি, বান, খরা আনে আর দায়টা দিয়ে দেয় আবার অদৃশ্য আল্লাহর উপর। আসমানী গ্রণ্থের উপর। ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে দেখা যায় সব পুরুষই নারীর জন্য নিজেরাই বিধাতা হয়ে যায়।
 
পুরুষরা সংসারে প্রধান মন্ত্রী হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট হয়ে যায়। অর্থমন্ত্রী হয়ে যায়। হয়ে যায় পীর পয়গম্বর। কারণটা এই- কে হায় নিজের নির্বুদ্ধিতা, অক্ষমতা কিংবা অসহায়ত্ব জানাতে চায়? কে নিজেকে শক্তিহীন স্বীকার করবে বলুন? সত্যি চেহারা দেখানো তাদের দ্বারা সম্ভবও হয় না। আসলে সামাজিক চাপে আমরাই তাদের অমন করে তুলেছি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে তারাও মানুষ। তাদেরও ভয়ভীতি, ক্ষমতা একজন নারীরই সমান। পুরুষ মানেই বুদ্ধিমান, শক্তিময়, সাহসী, যোদ্ধা না। ওরা নারীর সমানই বুদ্ধিমান, সাহসী ও যোদ্ধা। তুলনামূলকভাবে তাদের দেহগত শক্তি নারীর চেয়ে কিছু বেশি। তো নারীরও তো কিছু ব্যপার ও ক্ষমতা পুরুষের চেয়ে বেশি। তাহলে তো কাটাকাটি। সমান সমান। নারীর যে টিকে থাকার ক্ষমতা, জন্মদানের ক্ষমতা আছে, দেহ থেকে সন্তানের আহারের উপায় আছে তাতো পুরুষের নেই! না থাকুক এর কিছু ওর। এটা তো রিলে রেস না। এরা পরস্পরের সম্পূরক হবে এবং নিজেদের সীমাবদ্ধতা অন্যকে দিয়ে পূর্ণ করেই চলবে সেটাই কাম্য।
 
কিন্তু সেখানে নর নিজের সুবিধার্থে ঈশ্বরকে কাটিয়া ছাঁটিয়া বাটিয়া একজন বর্ণবাদী সেক্সিস্ট করিয়া তুলিয়াছে। এসব তারই নাকি বিধান! হা হা … হাসা ছাড়া তো উপায় দেখি না। এক মানুষ হইতে আরেক মানুষের ব্যবধান তৈরি করলো নিজেরা আর ঈশ্বরকে দায়ী করে বুদ্ধিমানের কাজটি করলো। এবং এতেই তাদের মোক্ষ হচ্ছে দেখে অনুন্নত বিশ্বে বিদ্যার অভাবে তাই করেই চলেছে। আর এদিকে মেয়েরা একের পর এক যাহা যাহা কঠিন কাজ বলে, পুরুষের কাজ বলে পরিচিত তা- যেমন এভারেস্টে বেয়ে ওঠা, প্লেন চালানো, মাটি কাটা, ইট ভাঙা, শুটিং করা, সবই প্রমাণ করে দিতেই থাকলো যে কোনভাবেই তারা কম তো না বরং বেশী শক্তিময়ী। কারণ ছেলেরা এসব কাজ যখন করে তাদের একজন ‘বউ’ থাকে বা কন্যা বা ভাবী থাকে বা মা থাকে ঘর সামলানোর জন্য, পাতে গরম খাবার তুলে দেবার জন্য, ঘরের কাজের জন্য, ও সন্তানদের বমি মোছানোর জন্য। মেয়েদের তো কোনো ‘বউ’ নেই। ভাই বাবা থাকলেও তারা তো পুরুষ। আমাদের দেশে তারা তো মেয়েদের কাজ’ করবে না রে ভাই! সুতরাং এ যুগের নারীকে মেয়েদের এবং ছেলেদের উভয়েরই কাজ করতে হচ্ছে। পারছেও। এ কোনো ব্যতিক্রম নয়। এ ‘নিয়ম’। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে অভ্যাসে পরিবারে সব চেয়ে কম খেয়ে, কম সময় ঘুমিয়ে তারা সবার চেয়ে বেশি দিতে পারছে। আর তাতে পুরুষের সকল ক্ষমতা উবে যেতে যেতে গিয়ে তা চোয়ালে এসে ঠেকেছে। যত বড় বুর্বক তত বেশি চোয়ালের চেলা। ব্যতিক্রম আছে। আর ব্যতিক্রমই যা স্বাভাবিক বলে ঘটিয়ে যাচ্ছে তাকে আলাদা করে তোলে। রাখে তার সুষ্পষ্ট প্রমাণ। যে পুরুষ সমতা মানে সংবেদনশীল হয় তাকে বলে অপুরুষ, মেয়েদের মত, বোকা, স্ত্রৈন। নরম সরম মানবিক ছেলেটিকে বলে, ও নারীর মতো, ওকে চুরি পরাও! কেনো ভাই পুরুষ, মানবিক গুণধারী কি কেবল মেয়েরাই?
 
যা হোক, এবার সাঁঝের আগে একবার পড়ুন নারীদের নিয়ে ক্ষুদ্রমনা কথা বলেছেন কোন ঈশ্বর? তারা কিন্তু কোনো নারী না। দৈবিক বা বৈদিক না সবাই পরাক্রমশালী চোয়াল সর্বস্ব পুরুষ। এন্তার উদাহরণ আছে। সব দিচ্ছি না। এ শোনা কথাও হতে পারে। তাই আমাকে বিশ্বাস করবেন না। অনুগ্রহ করে নিজেরাই সার্চ করুন গুগুলে বা লাইব্রেরীতে।
 
আমি শুনেছি লিও টলষ্টয় বলেছেন- 'নারী সমাজ জীবনে এক অনিবার্য নিরানন্দের উৎস। মেয়েদের একটি সুবিধা হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত। তাই যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত‘। নেপোলিয়ানের কথা ছিল নাকি, 'মেয়েরা আমাদের দাসী হবে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম, মেয়েরা আমাদের সম্পত্তি গাছের ফল যেমন বাগানের মালিকের সম্পত্তি’। হায় হায়! আর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট নাকি বলে গেছেন, ‘কোনো মেয়ে যখন ভাবে তখন সে অশুভ জিনিষই ভাবে'। আমি এ নিয়ে বেনিফিট অব ডাউট রাখতে চাই। এসব ‘গ্রেটম্যান’রা এসব বলতে পারেন না নিশ্চয়ই মেয়েদের ষড়যন্ত্র! আর না হলে তা এ হচ্ছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার রাজনীতি। এ হচ্ছে বিদ্যাবুদ্ধি ও সহিংসতার সংশ্লেষ। ক্ষুদ্র ও অশক্ত পুরুষের হাতিয়ার।
 
আর তাই তারা গ্রেট ওম্যান ক্ষনার জিহব্বা কেটে নেয়। রোকেয়া সাখাওয়াতের বই থেকে তাদের জন্য অস্বস্তিকর বানী মুছে দেয়। বেশী বুদ্ধিমান মেয়েটি মুখ খুললে তাকে প্রেতিনী আখ্যা দেয়। মেধাবী মেয়েটিকে বাঁধে পুরুষের মতো স্বভাব বলে। আচ্ছা পুরুষের যা হলে ভালো তা কি করে মেয়েদের জন্য খারাপ হতে পারে?
 
এমন কি এ ধরনের নেতিবাচক ধারণার সামান্য পরিবর্তন ঘটলেই তা রোধ করার রাজনীতি শুরু হয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী এ কূটনীতির কারণেই এখনো এক পুরুষের ব্যর্থতা ও তার একক দূর্বলতা চিহ্নিত হচ্ছে– তারই নিজস্ব না পারা হিসেবে আর নারীর ব্যাপারে দায়ী হচ্ছে পুরো নারী জাতি। ওদিকে আবার সফলতায় সব পুরুষকে সিক্ত করে তুললেও নারীর অর্জনকে দেখছে তারা ব্যতিক্রম হিসেবে। বলছে এভাবেই বিধাতা বেঁধে দিয়েছে। এ কোন বিধাতা? কেউ কি দেখেছে অন্যায় বিধানকারী বিধাতা এমন? আসলে এ হচ্ছে ঘরের বিধাতা। আর সে সব দায় তুলে দিচ্ছে অদৃশ্য ও বৈদিক- দৈবিকের হাতে। সে কোনো দায় নেবে না। তাতে পৃথিবীর বস্তুগত, বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদের উপর অযোগ্য হলেও নিয়ন্ত্রণটা বলবৎ থাকে আর অসম মানদন্ডে নারী ও পুরূষকে বিচার করতেই থাকবে... করতেই থাকবে।
 
তাহলে যারা তা করছেন তারা কি জানেন না বা বোঝেন না বা যে তারা তা অন্যায় করছেন! এবং অন্যায় সঙ্ঘটিত হচ্ছে এমনকি তার নিজ কন্যা ও মাতার সঙ্গে ! এখানে স্ত্রীর কথা বাদ দিলাম- সে সারাজীবন পর। সম্পত্তির হিস্যাতে তার কথা ভাবনায়ই থাকে না। বাকি দু‘ সম্পর্কেই যা একটু ঝাঁকি। কিন্তু বৃহত্তর ব্রাদারহুডের কাছে সে প্রেমও পরাজিত হয়ে যায়।
 

333 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।