ধর্মের নামে অধর্মের কিছু ফিরিস্তি

শুক্রবার, জুন ১৫, ২০১৮ ১:৫৭ AM | বিভাগ : মুক্তচিন্তা


১। বেশিরভাগ ধার্মিক পরকালের কথা ভেবে ধর্ম পালন করেন। বেহেস্তের আশা করে হুর-পরীর সঙ্গ পাওয়ার জন্য ধর্মে লিপ্ত হওয়ার যত আয়োজন করেন। ইহকালের সুখ কিছু না, পরকালের সুখ হলো চিরন্তন এবং শাশ্বত; এমন বিশ্বাসে বিশ্বাসী তারা। বিশেষভাবে যখন ধর্মীয় বয়ান চলে তখন এসব লোভনীয় কথাই বেশি বলা হয়। বলা হয় ওয়াজ, নসিয়তেও। কাউকে কনভিন্স করার জন্য হলেও পরকালের সুখসর্বস্ব বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো হয়। কী কাজ করলে বেহেস্তে যাবে বা ধর্ম কীভাবে পালন করলে বেহেস্তে যাওয়া সহজ হবে; এসবই চারদিকে শুনতে হয়। এমনকি মানুষের মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করেও বেহেস্তের পথ তৈরি করেন তারা।

কিন্তু মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার কথা কি খুব শোনা যায়!? যদিও ধর্মে বলা হয়েছে, মানবের সেবা করলেই সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও কি দেখতে পাওয়া যায়? সবাই তো স্বার্থপরের মতো বেহেস্তে যাওয়ার জন্য লাইন ধরে আছে! কোনো দান-দক্ষিণার কাজ করলে সাথে সাথে বলবে বেহেস্তে যাওয়ার রাস্তা অনেকটাই পরিষ্কার হলো। অথচ, 'আমি চিন্তা করি মানুষ ভালো থাকুক। ধর্মের নামে এমন প্রায়ই উদ্ভট পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। মানবধর্মেই যে প্রকৃত ধর্মের জিয়নকাঠি লুকিয়ে আছে; তা প্রকৃত ধার্মিকেরা কি বোঝেন? যদি বুঝতেন; তাহলে মুসলিম বিশ্বকে এভাবে মুখথুবড়ে পড়তো না। লোভী, স্বার্থপর সব যেন ধার্মিক মানুষের মধ্যেই দেখি। বেহেস্তে যাওয়ার আশা করে যারা ধর্মচর্চা করেন; তারা অবশ্যই লোভী স্বার্থপর এবং কখনও কখনও প্রতারকও বটে!

২। সবরকম পাপকর্মের সাথে নাকি নামাজ, রোযার কোনো সম্পর্ক নেই। যত পাপই মানুষ করুক না কেনো, নামাজ, রোযা তাকে করতেই হবে। কারণ, এটি প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ কাজ এবং তা অবশ্যই পালনীয় কর্তব্য। তাছাড়া নামাজ, রোযার হিসাব নাকি সম্পূর্ণ আলাদা। এই হিসাবটা আমি বুঝি না। পাপ যদি করবেই তাহলে নামাজ, রোযার দ্বারস্থ হবে কেনো? আবার নামাজ, রোযা যদি করবেই তাহলে পাপকর্মে লিপ্ত হবে কেনো? অথচ কিছু ধার্মিক মানুষ দিব্যি তাই করে যাচ্ছে। ধর্মকর্মের নামে সমাজের চোখে ধোয়া তুলসিপাতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরলেও অন্ধকারে তাদের আরো একটি পাপিষ্ঠ জীবন থাকে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এদের সংখ্যাই বেশি। এমনকি রমযান মাসেও তাদের চরিত্র বদল হয় না। যদিও বলা হয় রমযান মাস হলো সংযমের মাস, শুদ্ধির মাস। আসল কথা হলো নিজের প্রতি আস্থা না এলে সৃষ্টিকর্তার প্রতিও আস্থা আসে না। বিশ্বাসটা সেখানে।

৩। মনের পবিত্রতা যেখানে থাকে না। সেখানে ধর্মের লেবাস পরে কী হবে! মুখের কথা আর কাজে যেখানে মিল থাকে না, তখন খাঁটি মুসলমানের ভাব নেওয়াটাকে কী বলা যেতে পারে! এসব ভণ্ড ধার্মিক ভরে গেছে সবজায়গায়। ধর্মের সত্য, সুন্দর রূপকে কলঙ্কিত করছে বক ধার্মিকেরা। ধর্মের প্রথম শর্তই হচ্ছে সততা। অথচ, বাস্তবে সততার কোনো ছোঁয়া নেই। তাছাড়া, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে অনেক কথা বলা হয় কিন্তু ধর্মের নৈতিক ব্যবহার নিয়ে কোনো কথা বলা হয় না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকালাম পড়েও অনেক ধার্মিক মানুষকে দেখেছি আকামকুকাম করে বেড়াতে। সেখানে সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, লোভ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, হিংসা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে প্রতি প্রশ্নে আঙ্গুল তোলা হয় রোজা নামাজ করা লোক কেমনে এত অসৎ লোভী হিংসুক হয়! একথাও বলতে শোনা যায় আমি হাজি মানুষ আপনার মনে হয় আমি ওজনে কম দেবো, রোজামুখে বলছি এই মাল বিক্রি করে আমার লস হবে, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা কোরান ছুঁয়ে বলছি আমি ওনার সাথে সহবাস করি নি অথবা তিনি নামাজ কালাম পড়েন খুব আল্লাহওয়ালা ভালো মানুষ – এভাবে জীবনের প্রতি পদে পদে ধর্মকে সামনে দাঁড় করিয়ে নৈতিকতার ফিরিস্তি দেয়া হয় নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এসবই সম্ভব মিথ্যাচারের মাধ্যমে। যেখানে আসল ধর্ম মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে।

৪। ধর্মে আছে যাকাত, ফেতরা দেওয়ার কথা। গরীব দুখী মানুষকে সাহায্য করার কথা। এসব যাকাত, ফেতরা দিয়ে তাদের কিছুক্ষণ বা কিছুদিনের জন্য মুশকিল আহসান করা হয় বটে তবে এই গরীবের গরিবিয়ানা কী ঘুচায়! ধার্মিক মানুষ তাদের সাহায্য করে অনেকটা সোয়াবের আশা করে। তাহলে বেহেস্তে যাওয়ার রাস্তাটা আরো সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু গরীব মানুষটি কি সারাজীবনের জন্য সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে? একদিন দুদিন বা একবেলা খাওয়ার জন্য ভিক্ষার মতো জাকাত, ফেতরা দিয়ে গরীব মানুষটির কি উপকার হচ্ছে! গরীব তো গরীব থেকেই যাচ্ছে। প্রয়োজন গরীব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তার গরীবত্ব ঘুচিয়ে দেওয়া। এতে আখেরাতের যেমন কাজ হয় তেমন ইহকালেরও কাজ হয়। একটা দেশের উন্নয়নের জন্য গরীবের কী ভূমিকা থাকতে পারে! গরীবকে তো অন্য সামর্থবান মানুষ পালছে। গরীবি অক্ষমতা একটি দেশের মেরুদণ্ডকেও নুইয়ে রাখে। তাহলে এমন দান-দক্ষিণার কী মূল্য আছে? দান-দক্ষিণা বা জাকাত, ফেতরা এমন ভাবে বিলি বন্টন করা হোক যাতে গরীব মানুষগুলো আর গরীব না থাকে। সেইসাথে মানবতার জয় হোক।

ধর্ম হোক মানুষের, মানুষের হোক ধর্ম। এই প্রত্যাশাই করি সারাক্ষণ।


  • ৯২১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা