ডিপ্রেশন, ব্রুটাস এবং চিনি কাহিনী – Cross the Rubicon

শনিবার, ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০১৯ ২:০৬ PM | বিভাগ : ওলো সই


নূর জাহান মণি নামে এক নারীর সাথে আমার পরিচয় হয় গত বছরের ফেব্রুয়ারির দিকে। নূরজাহান মণি দেখতে ঘোড়ামুখী হলেও তার কন্ঠস্বর অনেক শ্রুতি মধুর। তবে কন্ঠ যতই মধুর হোক না কেনো, তার দেয়া তথ্য খুবই তেঁতো ছিলো। আমি শুরুতেই তার দেয়া সমস্ত তথ্য অবিশ্বাস করি এবং ধরে নেই এই সমস্ত তথ্য আসলে জামাত শিবির হেফাজতের অপপ্রচার এবং নূরজাহান মণি হতে পারে আওয়ামীলীগের একজন পেইড এজেন্ট। এই নারী আমাকে তথ্য দেয় যে তিনি মারুফ রসূলের “চিনি মাতা” এবং মারুফ রসূল তার “চিনি পুত্র”।
 
 
চিনি মাতা’র ইংরেজি আসলে সুগার মম। এইগুলো বিদেশী কনসেপ্ট, তবে অতোটা বিদেশীও ঠিক না। এই দেশেও এইসব আছে। কাহিনী হচ্ছে, কোনো ব্যাক্তি যখন বয়সে ছোট ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্কে থাকে এবং সেই বয়সে ছোট ব্যক্তির ভরণপোষণ দেয়, তখন সেই সম্পর্কটাকে সুগার রিলেশন বলে। বয়সে বড় ব্যক্তি পুরুষ হলে সুগার ড্যাড এবং ব্যক্তি নারী হলে তাকে সুগার মম বলে।
 
তো নূরজাহান মণি মারুফ রসূলের সুগার মম এবং তিনি গত ৫ বছরে মারুফ রসূলের পিছনে লাখ লাখ টাকা ঢেলেছেন, তার জামা কাপড়, মোবাইল ফোন, প্রিন্টার, প্রিন্টারের কালি আরো যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি আরো জানান যে মারুফ রসূলের আরেকজন চিনি মাতা হচ্ছে সঙ্গীতা ইমাম। আমি এই তথ্য শোনা মাত্রই ধরে নিলাম এই ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন, এইসব কিছুই সত্যি নয়, এইটা হয় না। তখনই ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বাজলো, কে বলেছে হয় না, এসো এই মঞ্চে, উদীচী এমনই এক আয়না... আমি কান বন্ধ করে ফেললাম। যারা সংগঠনের সাথে জড়িত, তারা আমার উপর রাগ করবেন না প্লিজ! আপনারাও জানেন আমি সত্যি কথা বলছি। তাছাড়া সংগঠন আর ব্যাক্তি এক নয়। আপনারা আপনাদের প্রাণ প্রিয় সঙ্গীতা ইমামকে নিয়ে, বরঞ্চ দূরে গিয়ে ঢাক, ঢোল খোরতাল বাজিয়ে উদীচী এমনই এক আয়না গানটি গাইতে থাকুন। ভিকারুননিসা স্কুলের মেয়েদেরও সাথে নিতে পারেন, তারা এস এস সি রেজাল্টের দিন ভালো ড্রাম বাজায়, আশা করি তাদের শিক্ষকের জন্য তারা এটা করতেই পারবে।
 
মারুফ রসূল আমাকে যখন বলছিলো যে আমার মধ্যে সে তার স্বপ্নের সহযোদ্ধাকে দেখতে পায়, ভালোবাসি শব্দটা শুধুই আমাদের, আমাদের সময় আসলে একটা নিরবিচ্ছিন্ন আকাশ, ভোরের বকুল বিছানো পথ, তখন আমি তার কথা বিশ্বাস করেছি। যে মানুষ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলে, যে মানুষের সাথে গলা মিলিয়ে জয় বাংলা বলেছি, যে মানুষ ছাত্র ইউনিয়ন করেছে, দেশ, মানুষ এবং মুক্তির কথা বলেছে, আমি কি তাকে বিশ্বাস করবো না? তাহলে আমি কাকে বিশ্বাস করবো?
 
সঙ্গীতা ইমাম আমাকে ম্যাসেঞ্জারে যখন জানালো যে তাদের সম্পর্ক স্বামী স্ত্রীর এবং মারুফের জন্য অন্যান্য সব সম্পর্কই একটা খেলা। সে এইরকম আরো অনেক নারীদের সাথেই করেছে। এবং এইসব ঘটনা সম্পর্কে সঙ্গীতা ইমাম জানেন, কিন্তু তবুও তিনি “এইসবই ওর খেলা” বলে দায়সারা ভাব  দেখিয়ে মারুফকে বুকে করে রেখেছেন, আমি ডিপ্রেশনে চলে গেলাম।
 
মানুষ মাত্রই বহুগামী, তিনি মারুফের এই বহুগামীতাকে মেনে নিয়েছেন, কিন্তু পুরোপুরি মানতে পারেন নাই। কারণ মানতে পারলে তিনি আমার কিংবা অন্যান্য নারীদের, ম্যাসেঞ্জারে ঢুঁ মারার প্রয়োজন বোধ করতেন না। মারুফ অন্য নারীতে গমন করলেও তিনি পাত্তা ফাত্তা দিতেন না। একজন পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তি এবং নারী বলেই, তার যে সেক্স আহ্লাদ থাকবে না, সেটা আমি মনে করি না। অবশ্যই থাকবে। কিন্তু এমন একটা ব্যক্তির সাথে তিনি জড়িত, এমন ব্যক্তির সমস্ত খরচ তিনি বহন করেন, যে তাকে দুই দিন পর পর ঠকায়, মিথ্যে বলে আবার তিনি সেই মিথ্যেবাদীকে বুকে করে রাখেন। মারুফের এই “খেলায়” তিনিও আসলে একজন সমান অংশীদার।
 
মারুফ রসূল যদি শুরুতেই আমাকে জানাতো যে সে একটা কমিটেড সম্পর্কে আছে, বা সে এমন একটা সম্পর্কে আছে যা থেকে বের হয়ে আসা তার পক্ষে সম্ভব না, তবে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম। সেটা না করে মারুফ ভূল তথ্য দিয়েছে, এবং নিয়মিত, ভালোবাসা মন্ডিত কথা বলে বলে, নানান চিঠি লিখে, ম্যাসেজ পাঠিয়ে, নানান আবেগী আচরণের মাধ্যমে, আমার ইগো এস্টিম কে দুর্বল করে গেছে। এই পুরো ব্যাপারটিকে এক্সপ্লয়টেশন বলে। মানুষকে ধীরে ধীরে ম্যানুপুলেট করে, সম্পর্কের জালে জড়িয়ে বিপর্যস্ত করে ফেলা একটি অনৈতিক কাজ। উচ্চ মানের স্যোশিওপ্যাথরা সাধারণত, এই কাজ গুলো করে।
 
আমি প্রায় আট মাস ধরে ডিপ্রেশনে আছি। ডিপ্রেশনে থেকেও প্রতিনিয়ত কাজ করে যাওয়া, লেখালিখি করা খুব কষ্টকর। এমনিতে ডিপ্রেশনের রোগীদের আত্মহত্যা প্রবণতা থাকে। কিন্তু কেউ মারা গেলে আপনারা ফেসবুকে “আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়” লিখে দায় দায়িত্ব এড়িয়ে যান। মানে বেঁচে থাকতে কেউ সেইরকম কোনো সমাধান দিতে পারেন না, অথচ নিজে নিজে মরে গেলে খুব দার্শনিক হয়ে, গম্ভীর হয়ে লিখেন, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। কাউকে বাঁচিয়ে রাখতে চাওয়া, রাখতে পারা কঠিন জিনিস। মরে যেতে দেয়াটা সহজ। জীবনের শেষ লক্ষ্য যেহেতু মৃত্যু, তাই ঝামেলার মানুষটা মরে গেলে অনেকেই কিন্তু খুশি হয়। মানে আমি বলছি না যে সবাই খুশি হয়। বেশ কিছু মানুষ কাঁদে, কিন্তু সেই মানুষ গুলোও ব্যাপারটা পরে মেনে নেয়।
 
আমার অবশ্য মরে যেতে ঠিক ইচ্ছে করে না। আমি তো বেঁচেই আছি। তবে মাঝে মাঝে আমি শুঁটকি বাজারে যাই এবং শুঁটকি দেখি। ওখানে বড় বড় প্রকান্ড সাইজের মাছ মেরে শুঁটকি বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। একবার একটা মাছ দেখলাম, সামুদ্রিক বাইম, প্রায় সাড়ে ৫ ফিট হবে। আমার চাইতে লম্বা। এইরকম কাছাকাছি উচ্চতার একটা মানুষ কে মেরে এইভাবে শুঁটকি বানিয়ে রাখলে কেমন হতো আমি তাই ভাবছিলাম। আমি যে মানুষটাকে মেরে শুঁটকি বানিয়ে রাখতে চাই তার নাম মারুফ রসূল। একসময় আমি তাকে ভালোবাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম। এখন প্রচন্ড ঘৃণা করি।
 
সঙ্গীতা ইমাম গত রোজার ঈদের পরের দিন, ময়মনসিংহ গিয়েছিলো। ম্যাসেঞ্জারে অনেকবার কল করেছিলো দেখা করার জন্য। আমাকে দিনের পর দিন সুপ্রভাত লেখা ফুলের স্টিকার পাঠিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে তাকে ব্লক করে দেই। তিনি অন্য সকলের কাছে কত সম্মানিত মানুষ, অথচ আমার চোখে তিনি একটা ছ্যাচড়া মহিলা।
 
গত বছর তার ছেলের বিয়েতে মারুফকে দেখেছিলাম টিয়া রঙের পাঞ্জাবী পরে তার ঘাড়ে হাত দেয়া একটা ছবিতে। আমি প্রায়ই সেই অনুষ্ঠানের স্বপ্ন দেখি। দেখি যে সেই অনুষ্ঠানে আমিও গেছি, কিন্তু সেটা সঙ্গীতা ইমামের ছেলের বিয়ে না, সেটা তার ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠান, ১ম জন্মদিন। স্বপ্নে দেখি তার এক কোলে তার শিশু পুত্র এবং আরেক কোলে তার শিশু স্বামী। আর আমিও একটা বেবী ফ্রক পরে বেলুন হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
 
আমি মানুষকে খুব গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি। কারণ শুধু এদের জন্য, শাহবাগ, গনজাগরণ, সহযোদ্ধা, উদীচী এই শব্দগুলো অর্থহীন লাগছে, বাজে লাগছে। এই ডিপ্রেশন থেকে কি করে বের হবো! কতদিনই বা লাগবে!
 
মারুফ রসূলকে আগে কেনো জানি সুন্দর লাগতো। কিন্তু এখন জানি একজন অসৎ, অসত্য ব্যক্তি আসলে যথেষ্ট বিশ্রী। মারুফ রসূল দেখতে এতোই বিশ্রী যে মৃণাল হক তার স্ট্যাচু বানালে সেই স্ট্যাচু দেখতে বেশি সুন্দর হবে।
 

  • ৫৭৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ফেসবুকে আমরা