দেখি, হাসি- ঘৃনা করি

শুক্রবার, জানুয়ারী ৫, ২০১৮ ৬:৫১ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


মানুষ কখনোই ততটা না যতোটা জনসংখ্যার হিসাব বলে। আমি পথ চলতে- দেশে বিদেশে মানুষ খুঁজি। পাই। তবে ততটা নয়- যতোটা প্রত্যাশা। অবয়ব মানুষের- মগজভরা পুরুষতন্ত্র। ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের ভুত। পোষাকে বা পারফিউমে আধুনিক- মাথার ভেতরের বস্তুগুলো এখনো মধ্যযুগ পেরোতে পারে নি। পারে নি বলেই সংকট।


প্রচন্ড আধুনিক, উড়ে বেড়ান বিশ্বজুড়ে- তাকে বলেছিলাম, আপনি ভালোবাসাতে বিশ্বাস করেন? তিনি বললেন কেনো করবো না? প্রশ্ন করলাম- দু’জন নারী বা পুরুষের ভালোবাসাতে? তিনি বললেন- আপনারা তো এভাবেই সমাজটা নষ্ট করছেন। বললাম, কেনো? বললেন- এসব পাপ। আমি তার ‘অপাপবিদ্ধ’ চেহারাটা দেখলাম। বেশ কয়েকপদের দু’নম্বরীর সেরা লোকটার পাপ বা পূন্যের হিসাবে আমার যায় আসে না। যেমন যায় আসে না- কে নারী আর কে পুরুষে? আমার যায় আসে নারীর প্রতি সহিংসতায়। চাপাতির কোপে জুলহাস আর তন্ময়ের খুন হওয়ায়।

এটা একুশ শতক, সব কিছুতেই এখন প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতার হাওয়ায় রাষ্ট্র আর সমাজও আক্রান্ত- আক্রান্ত হয়ে তারা ঝুঁকে পড়ছে ডানের দিকে- মধ্যযুগের ধর্মভাবনায় পুরুষতন্ত্রের দিকে। সীতা কানোয়ারের আগুন পোড়া লাশের পাশেই এখন কান্দিল বালোচের রক্তাক্ত লাশ। যে বিষয়গুলো এখন আলোচিত না হওয়ার কথা- সেই বিষয় এখন হয়ে ওঠে মানুষ হত্যার কারণ।

আদিকাল থেকে প্রচলিত সমকামীতার পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে আমি যে শহরটিতে থাকি- সেখানেও মানুষ খুন হন। আর অন্যান্য হত্যার প্রতিবাদে যারা বিবৃতি দেন- প্রতিবাদ করেন, তারাও জুলহাস আর তন্ময়ের চাপাতিতে কোপানো লাশ দেখে নীরব থাকেন। কানে কানে অনেক প্রগতিশীলও আমাকেই বলেছেন- ভাই, এই ইস্যুতে একটু চুপ থাকেন। এটা অন্য বিষয়। হেসেছি- হাসি মুখে ঘৃনায় চমকেছি- ভেবেছি, এই মগজের প্রগতিশীলের শেষ পরিণতির নাম আল মাহমুদ বা ভুপেন হাজারিকা।


এখন থেকে ১০০ বছর আগে এই গ্রহে একটা বিপ্লব হয়েছিলো- রুশ বিপ্লব। মানব সভ্যতার খোলনলচে বদলে দিয়েছিলো সেই বিপ্লব। তারপর অনেকগুলো ইতিহাস তৈরি করেছে গত শতক। দেশে দেশে মানবমুক্তির বিপ্লব থেকে হিপি আন্দোলন- সমাজে নারীকে পড়িয়ে রাখা শেকল ভাঙার ইতিহাস রচিত হয়েছে।

প্রীতিলতা বা রোজা লুক্সেমবার্গ- প্রতিবাদের ইতিহাস হয়েছেন। কিন্তু সমাজের ভেতরে বহমান মনস্তত্ত্ব বদলায়নি- বদলায়নি বলেই আমাদের চোখগুলো মানুষের না হয়ে পুরুষের হয়েছে। মুক্তবাজার আর বিশ্বায়নে নারীকে পণ্য বা পণ্যের মডেল ভাবার মনস্তত্ত্ব নিয়েই আমরা মঙ্গল গ্রহে রকেট পাঠাই। ধর্মের বুনটে পরিবারের নারীদের রেখে নাইটক্লাবে মাংস কিনি। পর্নগ্রাফি আর ধর্মের বানী দু’য়ের জন্যই সেল ফোন অবাধে ব্যবহার করি।

এখানেই বদলটা দরকার। নিজেকে পুরুষ না ভেবে মানুষ ভাবলেই শুরু করা সম্ভব সেই বদলের। যেটাতেই অনীহা সবার- আর সেই অনীহাকে প্রতিষ্ঠিত করতে কখনো সমাজ আর কখনও ধর্মের ঢালে নিজেদের বাঁচাই। স্বস্তি খুঁজি। সেই স্বস্তি খোঁজার শেষটা সবচে জরুরি। সমাজে অবাধ টাকা, উন্নয়ন বা কাগজে লেখা নারীর ক্ষমতায়ন সবকিছু অর্থহীন হয়ে যায়- যখন একুশ শতকের শরীরটাতে মধ্যযুগের মগজ নিয়ে আমরা বেঁচে থাকি, এমনকি সেই বেঁচে থাকাটা সুখের মনে করি। তখনি আমি ঘটনাগুলো দেখি, হাসি- এবং ঘৃনা করি।


  • ২৫৩৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অঞ্জন রায়

সংবাদকর্মী

ফেসবুকে আমরা