চৈতী আহমেদ

প্রধান সম্পাদক, নারী

ডুবো জাহাজ এর যাত্রী

জলের মতো টাকা আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আমাদের জীবনে, অফিসে। কিছু কিছু আসতেও শুরু করেছে। অর্থাভাবে ছাটাই হয়ে যাওয়া, ছেড়ে যাওয়া অফিস স্টাফরাও কেউ কেউ আবার ফিরতে শুরু করেছেন। অফিসে বাইরে কবি কঠোর পরিশ্রম করছেন। ফাঁকে ফাঁকে আমাকে সামনে বসিয়ে এঁকে ফেলছেন সুন্দর সুন্দর সব স্বপ্ন! সেই সব স্বপ্নের রোল মডেল কবির শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সাইদের “বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র“। কবির জীবন যেনো সুনীলের বা শীর্ষেন্দুর নায়কের জীবন। আমি কবির সামনে বসে পড়ছি, কবিরই জবানীতে।

অথচ ক‘দিন আগেও খা খা করতো পল্টনের এই অফিসটা। ফ্লোরের মালিক বা তার ম্যানেজার এসে যা তা ব্যবহার করে যেতো কবির সাথে। আসতো বিভিন্ন পাওনাদার।

ষণ্ডা ষণ্ডা টাইপের তিন চারজন লোক এলো একদিন। বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে আমি ছুটে গিয়ে দাঁড়ালাম কবির চেয়ারের পাশে। আগাগোড়া নীল কার্পেট আর নীল পর্দায় মোড়া কবির অফিসরুম। তার মধ্যেই তিনি কপালে হাত চেপে মাথাটা নিচু করে বসে আছেন। দেখে বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে গেলো। লোকগুলো বসে আছে সামনের চেয়ারে। কাঁচ ঢাকা টেবিলের উপর রাখা একটা মটোরলা ওয়্যারল্যাস সেটের মতো, একটা লাইটার, একটা ব্যানসন সিগারেটের প্যাকেট এবং পাশেই একটা পিচ্চি পিস্তল এর দিকে চোখ পড়তেই আমার শরীর ঝিমঝিম করে উঠলো। কবি কথা বললেন।

-ভাই আমাকে আর কটা দিন সময় দেন আমি টেণ্ডার জিতেছি। কিছু ছোটো খাটো সমস্যা কেটে গেলেই আমার আদমজীর সি গ্রুপের কাজটা শুরু হবে, এই দেখেন.... ড্রয়ার থেকে কিছু কাগজ পত্র বের করলেন, এই দেখেন.. দেখেন... প্রথমেই আপনার টাকা শোধ করবো আমি নিজে গিয়ে। বলেই তিনি আবার মাথাটা নিচু করে কপালটা হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। আমার মনটা কষ্টে ছেয়ে গেলো, একজন ডাক সাইটে সাবেক ছাত্রনেতা, একজন কবি -এই সব যন্ত্রণার মধ্যেই তিনি বেশ কিছুদিন ধরে আমাকে আকারে ইঙ্গিতে আমার প্রতি তার অনুরাগ বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমিও তখন একটা ডুবো জাহাজ থেকে সদ্য উঠে আসা মানুষ। সাঁতার না জানা আমাকে ডুবে যাবার আতঙ্ক তখনও ছেড়ে যায় নি।

কবির নতমুখ দেখে আমার বোধোদয় হলো, আমি একজন আর্মির অনারারি ক্যাপ্টেনের মেয়ে, একজন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে। জন্ম থেকে বাসায় আব্বার কোমরে এইসব রিভলভার, বন্দুক দেখে দেখে বড় হওয়া মেয়ে, আমি কি ভয় পাই!

-আপনারা কেমন মানুষ? সামান্য কয়টা টাকার জন্য এই রকম একটা মানুষ, কবিকে পিস্তল দেখাতে এসেছেন? কবি আমাকে থামিয়ে দিলেন।
-তুমি যাও, তোমার রুমে যাও। আর পারলে কাউকে দিয়ে একটু চা‘র ব্যবস্থা করো। লোকগুলো উঠে দাঁড়ালো। পিস্তল সামগ্রী ইত্যাদি তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। আমি লোকগুলোর পেছন পেছন গেলাম দরজা পর্যন্ত। দরজার লক টিপে দিয়ে ফিরে এসে দেখি কবি কাঁদছেন।

আমি কবিকে বললাম -আমার কাছে কিছু টাকা আছে। আমি আরো কিছু টাকার ব্যবস্থা করতে পারবো। কবি একটা শুকনা হাসি হাসলেন।

-তোমার টাকা নেবো?

আমি শুনলাম না, আমি চোর হয়ে ‍উঠলাম, আমি ডাকাত হয়ে উঠলাম। কাছের দূরের যখন যার কাছ থেকে যা পেলাম চেয়ে, চুরি করে, কেড়ে টাকা এনে দিতে লাগলাম কবিকে। কবি লজ্জা পেতেন। বলতেন

-আমি তোমার কাছে এইভাবে ছোটো হয়ে যাচ্ছি!
-আপনি কেনো ছোটো হয়ে যাবেন? ওয়ার্ক অর্ডার পেয়ে গেলেতো টাকা আপনি ফিরিয়ে দেবেন।

খুব বিমর্ষ সেইসব দিন। কোনো কেনো দিন আমি আর কবি সারাটা দিন অফিসে বসে থাকি চুপ চাপ। কখনও কবি কথা বলেন। তার অতীতের সব উজ্জল স্মৃতির আওড়ে যান স্বগতঃউক্তির মতো। আমারও অবশ্য সেই সময় খুব বেশি কিছু করার নেই, কিছু অর্ডারি নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখছিলাম, কবির কাছ থেকে ফিরে সেগুলো নিয়ে বসি। কিছুতেই এগোতে পারি না। ভিউ মিডিয়া, বর্তমান মাই টিভির মালিক এমডি নাসিরুদ্দিন সাথী। আমার পাতানো ভাই। উনার কাছে গিয়ে স্ক্রিপ্টের অগ্রগতি জানিয়ে উনার কাছ থেকে টুকটাক টাকা নিয়ে আসি। সব তুলে দেই কবির হাতে। আমাকে যেনো একটা ঘোরে পেয়ে বসলো। বাসায় গিয়ে স্থির থাকতে পারি না। উনি ফোন করেন।

-তুমি কেনো আমাকে ছেড়ে চলে যাও? কেনো সারাটা ক্ষণ আমার সামনে বসে থাকো না। আমি বোনের উদ্যোগ, ভাইয়ের সতর্কবাতা, মায়ের শাসানি সব উপেক্ষা করে ছুটে ছুটে যাই কবির কাছে।

অফিসে আমার জন্য নির্দিষ্ট রুমে গিয়ে বসে টেবিলে পাই তরজাতা একটা কবিতা, কবির নিজের হাতের লেখা। সেই কবিতায় থাকে কবির তার নায়িকাকে ছুঁতে না পারার বিষাদ। বলাই বাহুল্য সেই নায়িকা আমারই ছায়া। কবি নিজে বাংলা টাইপ করতে জানেন না তখনও। আমিও দ্বিধা থরো থরো হাতে সেই কবিতা টাইপ করি। তিনি এসে আমার সামনে বসেন, স্থির তাকিয়ে থাকেন। প্রবাসী স্ত্রী পুত্র কন্যার জন্য কবির হাহাকারও মাঝে মাঝে ঘরের বাতাসকে ভারী করে তোলে। আমার খুব মায়া হয় কবির জন্য!

সদ্য ডুবে যাওয়া একটা জাহাজ থেকে উঠে আসা আমার ডান হাতে একটা কাটা দাগ। কবি আমার হাতটা তুলে নেন নিজের হাতে।

-এতো সুন্দর একটা হাত, কোন সে পাষাণ্ড ছুরি দিয়ে কাটতে পারে? আমার মাঝে মাঝে কি ইচ্ছে করে জানো?
-কি?
-ইচ্ছে করে স্কাউন্ড্রেলটাকে ধরে নিয়ে এসে ফ্যানের সাথে লটকে চাবকাই। তোমার মতো কারো গায়ে কেউ কিভাবে আঘাত করতে পারে! বাসায় ফিরে আমি আমার সদ্য ডুবে যাওয়া জাহাজটার জন্য কাঁদি। যাপন করি দোটানার একটা জীবন। কবির ফোন পেয়ে আবার ছুটে যাই মিরপুর থেকে পল্টনে।

কবি অফিসে নেই, আমার টেবিলে একটা হাতে লেখা কবিতা রাখা। আমাকে কবিতার ঘোরে পায়।

একা

ছুঁয়ে ছুঁয়ে আছো তবু যায় না ছোঁয়া
আশে পাশে আছো, তবু হয় না পাওয়া
আকাশের মতো আছো সর্বব্যাপী
তবু কেনো একা একা দুঃখযাপী?
সবটুকু দিয়ে তবু পাইনি কিছুই
সর্বহারা হয়ে যাই যা কিছুই চাই
খুব বেশি ভালোবাসি যখন যাকেই
খুব বড় ক্ষত রেখে যায় সেই।
কী দেই, কী পাই মেলে না হিসাব
হৃদয়ের ধারাপাত শুধুই কিতাব?
তুমি আছো তবু নেই, কেউ নেই?
একা ছিলাম একাকী আছি একা
কোনোদিন কারো সাথে হয়নি দেখা!

চলবে...

854 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।