চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় এবং রানী ইয়েন ইয়েনের যৌথ বিবৃতি

রবিবার, ফেব্রুয়ারী ১৮, ২০১৮ ১২:৫৪ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর:

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টার সময় প্রচুর সংখ্যক পুলিশ এবং প্রায় দশ জন সিভিল পোশাক পরিহিত ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হওয়া মারমা দুই বোনের বাবা-মাকে হাসপাতালের ওয়ার্ডে আনে যেখানে ভিক্টিম মেয়ে দুটি গত ২৪ জানুয়ারি থেকে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। পুলিশ হাইকোর্ট থেকে একটি অর্ডার নিয়ে আসে ও ধর্ষণের শিকার হওয়া কিশোরী দু’জনের বাবা-মাকে তাদের মেয়েদের নিয়ে যেতে বলে। মেয়ে দুটি তাদের বাবা-মার সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।

পুলিশ বারবার মেয়ে দুটিকে জোর করে নিয়ে যেতে তাদের বাবা-মাকে চাপ দিতে থাকে। এই পর্যায়ে পুলিশের কথায় প্রভাবিত হয়ে মেয়ে দু’টির বাবা মেয়েদের একজনকে ও মা অপর মেয়েটিকে থাপ্পর মারে। রানী ইয়েন ইয়েন এবং অন্যান্য ভলান্টিয়াররা এতে বাধা দেয়। সহকারী পুলিশ সুপার ধর্ষিতা কিশোরী দু’জনকে হাসাপাতালের ওয়ার্ড থেকে বাইরে সরিয়ে নিতে আদেশ দেয় নারী পুলিশদের। এ সময় রানী এবং ভলান্টিয়াররা বলেন কোর্ট বাবা-মার জিন্মায় থাকার কথা বললেও মেয়েদের অনিচ্ছায় তাদের জোর করে সরিয়ে দেয়ার কথা বলেন নি…।

মেয়ে দুটি যখন তাদের আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে চায় প্রথমে তাদের দাবী প্রত্যাখান করা হলেও রানী ও অন্যান্যদের চাপে পরে আইনজীবীদের দেখা করতে দেয়া হয় যদিও তা কেবল দশ মিনিটের জন্য। এরপর পুলিশ বারবার রানী এবং ভলান্টিয়ারদের ওয়ার্ড ত্যাগ করতে বলে এবং তারাও একযোগে তা প্রত্যাখান করতে থাকে। বেলা চারটার সময় আবার সকল ভলান্টিয়ারদের স্থান ত্যাগ করতে বলা হয় তখন একজন ভলান্টিয়ার (২১ বছর বয়েসী) সে রানীর সঙ্গ ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সর্বশেষ ঘটনা পর্যন্ত সে রানীর সঙ্গেই ছিলো।

ছয়টার দিকে পুলিশ ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করে দেয়। রানী ও অন্যান্য ভলান্টিয়াররা দোতালার জানালা দিয়ে দেখতে পায় সেনাবাহিনীর সদস্য এবং সাদা পোশাকের লোকজন হাসপাতালের দুটি প্রবেশ মুখ থেকে মানুষজনকে সরিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যা সাতটার দিকে নিচতলা, দোতালার করিডোর, সাধারণ মানুষের বসার স্থানের বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়। সাড়ে সাতটার দিকে মাস্ক ও মুখে কাপড় ঢাকা আট থেকে দশজন নারী এবং মুখে মাস্ক পরিহত ছয়জন পুরুষ সেখানে প্রবেশ করে। মাস্ক পরা পুরুষরা তাদের সঙ্গে আসা নারীদের আদেশ দেয় রানী এবং তার সঙ্গে থেকে যাওয়া একমাত্র মেয়ে ভলান্টিয়ারটির উপর আক্রমন করতে। ভিক্টিম, তাদের বাবা-মা এবং দশ বছরের তাদের শিশু পুত্রের সামনেই রানী এবং মেয়ে ভলান্টিয়ারটির উপর আক্রমন শুরু হয়। এক পর্যায়ে আক্রমনকারীদের মুখের মাস্ক খুলে পড়ে গেলেও তারা গাহ্য করে নি। তারা রানী এবং মেয়ে ভলান্টিয়ারটিকে কিল ঘুষি মেরে মেঝেতে ফেলে দেয়। মেয়ে ভলান্টিয়ারটিকে কেবল মারধোরই করা হয় নি তাকে পুরুষ হামলাকারীরা যৌন আক্রমনও করছিলো যখন তাকে নারী হামলাকারীরা ধরে রেখেছিলো এবং টেনে নিচে নামানো হচ্ছিলো। রানী এবং একমাত্র ভলান্টিয়ারটিকে এরপর নিচে টেনে হিচড়ে নামানো হয়। সেখানে আরো ছয়জন সাদা পোশাকের লোক যোগ দেয়।

রানী ইয়েন ইয়েন এবং ভলান্টিয়ারটিকে নিচে নামানোর পর আক্রমনকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে রানীকে পিছনের দরজার দিকে এবং মেয়ে ভলান্টিয়ারটিকে সামনের গেইটের করিডোরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। যখন রানীকে মারা হচ্ছিলো এবং পিছনের দরজার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তখন রানী হামলাকারীদের একথা বলতে শোনেন, খতম করতে হলে এখানে করা যাবে না, হাসপাতালের বাইরে করতে হবে…।

মাথার বাম পাশে ঘুষি মেরে রানী ইয়েন ইয়েনকে হাসপাতালের বাইরে ছুড়ে ফেলা হয়। সম্ভবত রানীকে অচৈতন্য করাই ছিলো উদ্দেশ্য। এখানে সাদা পোশাকের আরো লোকজনকে দেখা যায়। জায়গাটা ছিলো আলোকিত এবং হাসপাতালের আরো ভবনের সামনে মানুষ জড়ো হচ্ছিলো। তারা রানী এবং সাদা পোশাকধারীদের দেখছিলো। রানী এই সুযোগটি নেন এবং কাছাকাছি থাকা হাসপাতাল প্রাচীরের দিকে দৌড়ে যান এবং এটি টপকে বাইরে চলে আসেন। রাতের অন্ধকারে দশ মিনিটের মতো দৌড়ে তিনি এক সময় নিজেকে কাপ্তাই লেকের সামনে আবিস্কার করেন এবং এখানে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে লেকের জলে ডুব দিয়ে থাকেন। আধঘন্টা পর স্থানীয় একটি পরিবারের সহায়তায় রানী তার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং রানীকে তারা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যান।

একই সময় মেয়ে ভলান্টিয়ারটিকে সামনে গেইটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। সেখানে একটি সিলভার কালারের ভ্যান অপেক্ষা করে ছিলো। ভলান্টিয়ারটিকে মেঝেতে ফেলে যখন মারছিলো তখন ভিক্টিম ও তাদের বাবা-মাকে নিচে নামিয়ে আনার সময় একটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এই সময় অমনোযোগী হামলাকারীদের সুযোগ নিয়ে মেয়ে ভলান্টিয়ারটি উপরে হাসপাতালের স্টোররুমে এসে লুকিয়ে পড়ে। সেখান থেকেই সে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় ও অন্যান্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই সময় হাইকোর্ট ডিভিশনের আইনজীবী চাকমা চীফ রাজা দেবাশীষ রায় পুরো বিষয়টি মহামান্য হাই কোর্ট ডিভিশন এবং মহামান্য আপিল বিভাগের চেম্বার জজকে জানান। এরপর তিনি ঢাকা থেকে বিমানযোগে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন।

(রাণী ইয়েন ইয়েন ও তাঁর সঙ্গে হামলায় আক্রান্ত একজন নারী ভলান্টিয়ারের বর্ণনা অনুসারে লেখা হয়েছে)

রাজা দেবাশীষ রায়, চাকমা রাজা
রাণী য়েন য়েন

চাকমা সার্কেল উপদেষ্টা

(মূল ইংরেজি বিবৃতিটি নারীর ইংরেজি বিভাগে প্রকাশ করা হলো)


  • ১০৩১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সুষুপ্ত পাঠক

বাংলা অন্তর্জালে পরিচিত "সুষুপ্ত পাঠক" একজন সমাজ সচেতন অনলাইন একটিভিস্ট ও ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা