শিক্ষিত নারীদের চিন্তার অসারতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতা

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৫, ২০১৭ ১০:২২ AM | বিভাগ : পাঁচমিশালী


ফেসবুকে বিভিন্ন মেয়েদের গ্রুপের সাথে যুক্ত আমি। কিছু কিছু গ্রুপ খুব হেল্পফুল। যেমন, প্রেগন্যান্সি রিলেটেড একটা গ্রুপ আছে, যে কোনও প্রেগন্যান্সি রিলেটেড সমস্যায় এরা আন্তরিক ভাবে হেল্প করে। এইরকম নানান গ্রুপ আছে, কোনওটায় আমি ইচ্ছায় যুক্ত হয়েছি, কোনওটায় কোনও বন্ধু এ্যাড করে নিয়েছেন।

গ্রুপগুলোতে বেশিরভাগ পোস্টই থাকে নায়ক/নায়িকা, কোন নায়িকার বাচ্চা হলো, কোন নায়িকা প্লাস্টিক সার্জারি করে চেহারা নষ্ট করে ফেলছেন, কোন নায়িকার বেবিটা কিউট, কাকে তার জামাইয়ের সাথে একদম মানায় না, স্টার প্লাসের কোন সিরিয়ালে কোন নায়ক কার ক্রাশ, কোন সিরিয়ালের নায়িকাটা ক্ষেত, কোনটা খুব সেক্সি এইসব।

 কিছু থাকে রুপচর্চা বিষয়ক আর, নতুন ফ্যাশনের পোশাক আশাক বিষয়ক পোস্ট। মাঝেমধ্য কেউ প্রেম, বিয়ে বা ব্যক্তিগত সমস্যা শেয়ার করেন, সেগুলার বেশিরভাগের সমাধান বিজ্ঞ মেম্বাররা দেন, নামাজ পড়ুন আপু, আল্লাহ্‌র উপর ভরসা রাখুন। যেন নামাজ পড়লেই সকল সমস্যার সমাধান। নামাজ পড়ে না বলেই আজ আরাকানের রোহিঙ্গারা নির্যাতিত, শুধুমাত্র পাঁচওয়াক্ত নামাজটা কায়েম করলেই এই বেকুব রোহিঙ্গাদের আজ রিফিউজি হয়ে আকাশের নিচে বৃষ্টির নিচে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্ন আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে রাত্রি যাপন করতে হইতো না। বোকা রোহিঙ্গারা কবে বুঝবে এইটা। শুধু মাত্র নামাজটা পাঁচ বেলা পড়লেই তাদের সুদিন ফিরে আসবে। কিম জং উন যদি পাঁচবেলা ঠিকমত নামাজ পড়তো, তাইলে কিন্তু বেচারা আমেরিকাকে ফাঁকা হুমকি ধামকি না দিয়া আজ সত্যিকারের বাঘের মতো আক্রমণ করতে পারতো। শুধু নামাজটা না পড়ার কারণেই হিলারি আজ ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হয়ে সমস্ত আমেরিকান মুসলমানদের ঘোর দুর্দশায় ফেলে দিছে। শুধুমাত্র নামাজটা ঠিকমতো পড়লেই বিচারপতি এস কে সিনহা কে আজ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এক মাসের ছুটিতে যাইতে হয় না। আহারে বুদ্ধু হিলারি,বলদ কিম, বোকা বিচারপতি, শুধুমাত্র নামাজটা পড়তেন বুদ্ধি কইরা তাহলেই আজ এই সকল বিপদে আপনাদের পড়তে হয় না।

ও আচ্ছা আমি যেটা লিখতে চাচ্ছিলাম, সেইটা না লিখে অন্য দিকে চলে যাচ্ছি। এটা হচ্ছে আমার বেশি প্যাচাল পাড়ার রেজাল্ট। প্রায়ই কথার খেই হারিয়ে ফেলি। তো যেটা বলছিলাম, এই গ্রুপগুলোয় বেশিরভাগ পোস্টই এড়িয়ে যাই, আজ হঠাৎ করে চোখে পড়ল এক মেয়ে একটা পোস্ট করেছেন, পোস্টের বক্তব্যটা এমন যে, "কত মেয়েকেই রোজ রাতে পরিচিত বিছানায় ধর্ষিতা হতে হয়, আই থিংক মেনি ক্যান রিলেট" ইন্টারেস্টিং মনে হওয়ায় পোস্টের কমেন্টগুলা দেখতে গেলাম। হায়রে কপাল আমার! একটা কমেন্ট পাইলাম না পোস্টকারির সমর্থনে। বেশিরভাগ মেয়েই তাকে ছিঁড়ে খুড়ে ধুয়ে ফেলছে, স্বামী স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্ককে যেই মেয়ে ধর্ষনের নাম দিতে পারে তাকে নাকি জুতাপেটা করা দরকার। একজন লিখছে স্বামী আদর করবে না তো কি বয়ফ্রেন্ড করবে? এইসকল তথাকথিত আধুনিক মেয়েরাই নাকি স্বামী স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কের নাম খারাপ করে, পরকিয়ার মতো অনৈতিক সম্পর্ককে সাপোর্ট করে।

একটা কমেন্ট সব থেকে অবাক করার মতো ছিল। এক ভদ্রমহিলা লিখেছেন, স্বামী ভরণপোষণ দেন, এত ভালোবাসেন, এত কিছু করেন সংসারের জন্য, তার বিনিময়ে যদি একটু আদর সোহাগ করতে চান, এটা না দেয়াটা অন্যায়। আর এই সকল মেয়েদের স্বামীরাই নাকি বাইরে গিয়ে অন্য মেয়েদের ধর্ষন করে! আই মিন সিরিয়াসলি? একজন মহিলা কতটুকু আত্মসন্মানজ্ঞানহীন হলে এই কথা বলতে পারেন? যে কোনও যৌন সম্পর্কে যে কনসেন্টের একটা ব্যাপার আছে এটা কি এদের একজনও জানেন না? হোক সেটা বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড, স্বামী-স্ত্রী কিংবা লিভিং পার্টনার। একজনের কনসেন্ট ছাড়া তার সাথে ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক করতে চাওয়াটা ধর্ষন বলেই গণ্য হবে, হোক সেই ব্যক্তি স্বামী কিংবা স্ত্রী। ম্যারিটাল রেপ এই টার্মটা কি উনারা একজনও জানেন না? কি আশ্চর্য, অথচ এরা কেউই অশিক্ষিতা নন, প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিতা, অনেকেই ওয়ার্কিং লেডি। আমার খুব আফসোস হয়, যখন এদের বুদ্ধির দীনতা দেখি। আর যখন দেখি আমাদের দেশের মেয়েরা কতটা দুর্ভাগা যে এরা পুরুষদের থেকেও বেশি পুরুষতান্ত্রিকতাকে ধারণ করেন। একজন মেয়ে অসুস্থ থাকুক, ক্লান্ত থাকুক, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত থাকুক, স্বামী চাইলেই তার চাহিদা পূরণের জন্য দুই পা মেলে দিয়ে শুয়ে পড়তে হবে? এটার আবার নাম দিয়েছে পবিত্র সম্পর্ক, ছিঃ। অথচ বাঙলাদেশের ফেমিনিস্টরা দিনের পর দিন ম্যারিটাল রেপ নিয়ে লিখে যাচ্ছে, যেন উন্নত বিশ্বের মতো এই দেশেও আইনগত ভাবে বৈবাহিক ধর্ষণকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এখন মনে হচ্ছে সবই অরণ্যে রোদন।

বাঙলাদেশে যখন ধর্ষিতাকে ধর্ষক যেন বিয়ে করে তার জীবন রক্ষা করে, ধর্ষিতার প্রতি করুনা করে তাকে ধন্য করে এই জন্য নতুন করে বাল্যবিবাহ আইন পাশ হয়, এবং এইজ অফ কনসেন্ট ধরা হয় ষোল বছর, এর বিরুদ্ধে অনেকেই আমরা তখন লেখালেখি করেছি প্রতিবাদ করেছি। এতগুলো নারী সাংসদ থাকতে কিভাবে এই বিল পাশ হয় তা নিয়ে, এদের বুদ্ধিবৃত্তি এবং চিন্তার অসারতা নিয়ে হাসাহাসি করেছি। এখন মনে হয় ঠিকই তো আছে, জনগণের মধ্যে থেকেই তো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়, এরাও তো এই দেশেরই জনগণ, যে দেশের শিক্ষিত (একাডেমিক) নারীদের বুদ্ধিবৃত্তি, মানসিকতা এত নিম্ন স্তরের সেই দেশের অশিক্ষিত আর অর্ধশিক্ষিত সাংসদদের কাছে এর থেকে বেশি কি আশা করা যায়?

যাই হোক, একটা মজার ঘটনা বলে শেষ করি, সেদিন এমনই এক গ্রুপে কে একজন আমার কিছু ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, এই আপুটা কে চিন কেউ? উনি কি কোনও মডেল? একজন এসে কমেন্ট করেছে, চিনি। এটা (!) কুখ্যাত নাস্তিক আসিফ মহিউদ্দিনের বউ, শালি নিজেও একটা নাস্তিক। এক ছোটবোন সেই পোস্টে মেনশান করায় পোস্টটা চোখে পড়ে।

 


  • ২৯৫৮৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কানিজ ফাতেমা

প্রবাসিনী কানিজ ফাতেমা একজন সচেতন নারীবাদী, এবং অনলাইন একটিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা