বৃদ্ধাশ্রমের ইতিবাচক দিক

বুধবার, জানুয়ারী ১৭, ২০১৮ ৮:৩৪ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


সময় এসেছে বৃদ্ধাশ্রমের ইতিবাচক দিক তুলে ধরার। যৌথ পরিবার বাংলাদেশের ঐতিহ্য, আমরা এটা নিয়ে গর্ব করতে খুব পছন্দ করি। পশ্চিমা দেশগুলার দিকে আঙুল তুলে বলি- ওরা বাবামাকে শেষ বয়সে কাছে রাখে না, ওদের মধ্যে মায়া বা বাঁধন নেই,  ভালোবাসা নেই। কিন্তু কথাটা কতটুকু সত্যি? আমাদের মধ্যে খুব ভালোবাসা বাসি! 

অনেক সন্তান বাধ্য হয়ে বাবামাকে কাছে রাখেন বটে, দেখান না নূন্যতম শ্রদ্ধা। একই বাড়িতে থাকার পরও বাবা খান এক সন্তানের সাথে আর মা খান অন্য সন্তানের সাথে। দিনরাত খিটিমিটি,  ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকে। যারা সক্ষম তারা হয়তো সন্তানদের সাথে থাকেন না। নিজেদের মতো থাকেন, কিন্তু যখন একজনের মৃত্যু ঘটে অন্যজন খুব একা হয়ে যান। বাধ্য হয়ে সন্তানদের দুয়ারে দুয়ারে দাবার গুটির মতো ঘুরতে থাকেন। আহারে জীবন! ঠিক বমি গিলে রাখার অনুভূতি নিয়ে সেই একজনা জীবন পার করতে থাকেন। এর চেয়ে আশ্রম কি উত্তম নয়? 

আমরা জানি, সবার ব্যস্ততা বাড়ছে। আমাদের সন্তানেরা তাদের সংসার, বাচ্চাকাচ্চা আর ক্যারিয়ার নিয়ে ছুটছে। বৃদ্ধ  বাবা- মাকে আর তেমন করে সময় দিতে পারে না। ইচ্ছে থাকলেও পারে না। বাবা- মা গ্রামে থাকছেন, সন্তানরা শহরে বা মফঃস্বলে নিজেদের সংসার, আর ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। বাবা- মা যতদিন বেঁচে থাকেন বিশেষ দিনগুলাতে হয়তো তারা আসে বাবা- মায়ের কাছে। ওটাই বাবামায়ের পরম প্রাপ্তি। সমস্যা দেখা দেয় কেউ একজন মারা গেলে। শেষ বয়সে একা থাকা তার জন্য ভীষণ কষ্টকর হয়ে যায়।

অনেকের ছেলেমেয়ে তো বিদেশে ও থাকেন। ফলে বাবামায়েরা একা হয়ে যান। তাদের মধ্য থেকে একজনের বিয়োগে অন্যজন যারপরনাই ভেঙে পড়েন। একা থাকার নানান বিড়ম্বনা আছে। কেয়ার টেকার বা কাজের লোকের উপরই বা কতটুকুন ভরসা করা যায়। সময় এসেছে বৃদ্ধাশ্রমকে নিয়ে ভাবার। সেখানে সমবয়সীদের সাথে সুখে দুখে বাকি জীবনটা পার করা কি খুব কষ্টকর! একা থাকার চেয়েও কষ্টকর? কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ আশ্রম কি আছে আমাদের দেশে?

  

আশ্রমের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আশ্রমগুলা উন্নত  করতে হবে, চিকিৎসার সুব্যবস্থা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত জায়গা থাকতে হবে,  আর তাদের বিনোদনের ব্যবস্থা ও থাকতে হবে। আশ্রমকে আমাদের দেশে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। মিডিয়াগুলা খামোখা-ই আশ্রমে থাকা মানুষদেরকে নিয়ে খুঁচাখুঁচি করে, এর থেকে বিরত থাকতে হবে। তারা বৃদ্ধা বাবামায়ের চোখের পানি দেখাতে ভালোবাসে। পরিবারের মধ্যে থাকাকালীন কত পানি ঝরে তার খবর রাখে না।

অনেক সন্তান নানারকম সমস্যার মধ্যেও বাবা বা মাকে সাথে রাখে, অনেকটা ফাটা বাঁশের চিপায় পড়ার মতো অনুভূতি তাদের। সমাজের ভয়ে মা বা বাবাকে আশ্রমে রাখতে পারেন না। আমাদের মানসিকতা না বদলালে ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হতেই থাকবে। তাইতো সন্তান মাকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে ভার মুক্ত হতে চাইছে। আমি সেই সন্তানের প্রতি ঘৃণা জানাই, যে মাকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, আবার সমাজের ভয়ে আশ্রমেও পাঠাতে পারে না।  

খুব কাছ থেকে অনেককে দেখেছি, একটু আশ্রয় আর একমুঠো খাবারের জন্য সন্তানদের সাথে যুদ্ধ করতে। যারা সসম্মানে পরিবারে জায়গা পাবে তারা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। কিন্তু যারা পাবে না, তারা যেন সমাজের ভয়ে বমি গেলা অনুভূতি নিয়ে জীবন পার না করে।


  • ১৫৮১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ঝর্ণা আক্তার

প্রকৃতি, মানুষের সরলতা আর ভালবাসেন মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে। মানুষের, যেখানে নারী পুরুষের ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে না কোন বৈষম্য, এমন দিনের স্বপ্ন দেখেন প্রতিনিয়ত।

ফেসবুকে আমরা