বয়োসন্ধিতে মেয়েদের স্তনে ব্যথাসহ দলা/লাম্প একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া : ভয় নয় পর্যবেক্ষণ জরুরি।

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১২, ২০১৮ ৫:০৫ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


এক এগারো বছরের বাচ্চা মেয়ে তার মা-বোনের সাথে এসেছে ডাক্তার দেখাতে। সমস্যা কী জিজ্ঞেস করাতে মনে হলো একেবারে মাটির সাথে মিশে যেতে চাইছে সে -যেনো ধরণী দ্বিধা হও আমি ঢুকে যাই। 

আবার জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে বলো কী হয়েছে? উত্তর না দিয়ে নীরবে মা-বোনের দিকে তাকালো। অনেকটা আমি আর কী বলবো, কী আর বলার আছে আজ? পারলে তোমরাই বলো। তার অবস্থা বুঝে বাধ্য হয়ে মা/বোনের স্মরণাপন্ন হলাম। বললাম, তাহলে না হয় আপনারাই বলেন কী হয়েছে তার?

জানালো একটি লাম্প হয়েছে বা পাশের নিপলের নীচে।

যেহেতু একটি নিপলের নীচে ব্যথাদার এমন শক্ত বাম্প হয়েছে তাদের ধারণা হয়তোবা ব্রেষ্ট কান্সার! শুনতেই মনে মনে হাসলাম। নিজের ঐ বেলাটি মনের দুয়ারে এসে উঁকি দিলো। এমন অবস্হা আমারও হয়েছিলো -কিছুই জানতাম না। ভেবেছিলাম, প্রতিবেশীর পাইল্যান গাছের বিষ পিঁপড়া কাঁমড়ে দিয়েছে। যেমন ব্যথা তেমনি স্পর্শ কাতর। বাবার কাছে গিয়েছিলাম ছুটে যদি কোনো হোমিওপ্যাথিক ঔষধ দেন তিনি।

বাবার তখন শখের প্রাকটিস ছিলো হোমিওপ্যাথিক ঔষধ। রোগীরও অভাব ছিলো না। আমরা ভাইবোনরাই যত রকম সমস্যা হতো ছুটে যেতাম ঔষধ পেতে, বিনে পয়সায় ঔষধ খেয়ে রোগ সারাতাম। সেদিন ব্রেষ্ট সংক্রান্ত সমস্যায় ভুলেও একবার মনে হয় নি ব্রেষ্ট গ্রো করার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে। বরং পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম পিঁপড়াই কাঁমড়েছে। মাথা পুরোই ঘুরে গিয়েছিলো যখন একটি ব্রেষ্টে ব্যথা কমতে না কমতেই আরেকটি ব্রেষ্টের নিপল এরিয়া পিঁপড়া কামড়ের মতো করে ফুলে ওঠে। ভেবে পাই না কী দিয়ে কী হলো? অথচ মা বাবা কেউই বলেন নি সেদিন বিষয়টি খুলে। আন্দাজে জীবনের পথে হেঁটেছি -যা থাকে কপালে।

আজ বাচ্চা মেয়েটিকে দেখে যেমন নিজের ছেলেবেলার ঐ দ্বৈন্য দশাটির চিত্র মানসপটে ভেসে উঠলো তেমনি মনে হলো এই মেয়েটির মা/বোনও কী জানেন না এটা কী হচ্ছে? কেনই বা? 
মনে হলো কত শিশুকিশোরীই হয়তো এই অবস্থার মধ্য দিয়ে চলে। জানে না কী, কেনো, কিভাবে একটি মেয়ের শরীরে ব্রেষ্ট পূর্ণাঙ্গ আকৃতি অর্জন করে? ঐ সময়ের অভিজ্ঞতাগুলো কেমন হতে পারে?

জন্মের সময় প্রতিটি নারী বা পুরুষ শিশু সবারই শুধুমাত্র দু'টি নিপল থাকে, আর কিছুই নয়। মেয়েদের বয়স আট থেকে তেরো'র মাঝে ব্রেষ্ট গ্রো করা শুরু হয়। শুরুটি হয় নিপলের নীচে ছোট্ট শক্ত চাকার মতো একটি দলা/বাম্প/ল্যাম্প দিয়ে। যেটা স্পর্শকাতর এবং ব্যথাপূর্ণ। যেই মাত্রায় ব্যথা অনুভূত হয়, ছুঁলে স্পর্শকাতর লাগে সেই মাত্রায় চোখে দেখে অনুমান করার পথ থাকে না যে ব্রেষ্ট গ্রো হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। উপরন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাম্প/লাম্প ফুলে ওঠা বা ব্যথা শুরু হয় একটি মাত্র ব্রেষ্টে ফলে পূর্ব ধারণা না থাকলে বোঝার পথ থাকে না কী হচ্ছে? তাই দিশাহারা হতে আর সময় লাগে না।

নিপলের নীচে যে শক্ত বাম্প ওটাকে ব্রেষ্ট বাড বলে। ঐ বাডের উপরের স্কীনই বাদামী রঙ ধারণ করে। শরীরে ইসট্রোজেন প্রোজেসটরন হরমোন উৎপাদন এবং পিরিয়ড শুরু হতেই ব্রেষ্ট গ্রো শুরু হয়। যেটা পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করে কিছুটা সময় নিয়ে। ব্রেষ্ট মূলত ফ্যাটি টিস্যু, মিল্ক ডাকটস, এবং ব্লাড ভেসেল দিয়ে গঠিত। ব্রেষ্টে ব্যথা এবং স্পর্শকাতরার কারণ হলো হরমোনালজনিত কারণে ফ্লুইড রিটেনশন এবং অতি দ্রুত গতিতে ব্রেষ্ট টিস্যুর বৃদ্ধি যখন স্কীন তাল রেখে অত দ্রুততার সাথে বলতে পারে না। ফলে কখনও কখনও টিস্যু ছিড়ে যায়, লাল লাল হয়ে যায় জায়গায় জায়গায়। অনেকটা বাচ্চা পেটে এলে পেট ফেটে যাবার মতো। যদিও লাল দাগগুলো সময়ে চলে যায়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি ব্রেষ্ট কিছুটা গ্রো করে তারপর আরেকটি। এভাবেই বাড়তে থাকে। আবার দু'টি ব্রেষ্টই যে একই সমান হবে তারও কোনো কথা নেই। দু'টি ব্রেস্ট দু'রকমের হলেও ওটা স্বাভাবিক ঘটনা। সবার না হলেও কারও কারও নিপলের কাছাকাছি ওয়েল গ্লান্ড থাকে যা ওয়েল সরবরাহের মাধ্যমে নিপলকে সফট রাখতে সহায়তা করে। কারও বা নিপলের পাশে তিন/চারটি পশমও গজাতে পারে। তখন মনে হতে পারে কিরে বাবা এবার ছেলে হয়ে যাবো নাতো? সবার ক্ষেত্রে না ঘটলেও এই ঘটনাও স্বাভাবিক।

সচরাচর পিরিয়ডের সময় ব্রেষ্ট আরেকটু ভারী এবং ব্যথাময় হতে পারে। তাছাড়া বাচ্চা পেটে, ব্রেষ্ট ফিডিং, মেনপোজ, পিরিয়ড, অভুলেশন সবকিছুর সাথেই ব্রেষ্টের গতি-প্রকৃতি এবং সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে টিন বাচ্চাদের ক্ষেত্রে লাম্প বা বাম্প যাইহোক না কেনো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা ক্যান্সারাস নয়। তথাপি যদি মন না মানে, ব্যথার তীব্রতা যদি বেশী থাকে তাহলে ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হয়ে হরমোনাল বিষয়টিকে কন্ট্রোল করার ব্যবস্থা পাওয়া যেতে পারে।

অনেকের পিরিয়ডের এক/দুই বছরের মধ্যে ব্রেষ্ট পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করে, কারও বা আঠারো বছর পর্যন্ত অথবা আরও বেশী -প্রতিটি শরীরই ইউনিক। আর্লি ব্রেস্ট গ্রো হওয়া শুরু হলেই যে ব্রেষ্ট আনলিমিটেড বড় হবে অথবা দেরীতে গ্রো করা মানেই গ্রো করার সময় নেই, ছোটই থেকে যাবে তেমন নয়। বাবামায়ের বংশগতির উপর ভিওি করে ব্রেষ্ট আকৃতি পায়।

গ্রো কালীন সময়ে এবং খেলধূলা, ব্যায়ামে আরামদায়ক ফিটের ব্রা অথবা স্পোর্টস ব্রা উপকারী। ফেবরিক কটন হলে আরও ভালো। চব্বিশ ঘন্টা ব্রা না পরে স্কিনে আলোবাতাসের সরবরাহ দিতে মাঝে মাঝে শুধু জামা পরা ভালো। ব্রেষ্ট পরিণত হবার পরও কাজ থেকে যায়, নিয়মিত তদারকির কাজ। যেনো বিপদ বুঝলে সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ থাকে, যেনো এর কোনো পরিবর্তনই দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে না পারে। কেননা ব্রেষ্ট ক্যান্সার বলেও একটি বিষয় মেয়েদের জীবনে সাথে জড়িত যা নজর এড়িয়ে গেলে একেবারে ঘায়েল করে কাঁত করে ফেলতে পারে। যখন ব্রেস্ট হারানোসহ জীবনও হুমকির মুখে গিয়ে দাঁড়ায়।

ব্রেষ্ট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্র, নারীর অহঙ্কার। এই বিষয়ে অকারণ লজ্জায় অধিক লজ্জিত হলে জীবনের স্বাভাবিকতা বাঁধাগ্রস্ত হয়, জীবনের গতিতে খটকা বাঁধায়।


  • ৪১২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শিল্পী জলি

সমাজকর্মী, ইউএস প্রবাসী

ফেসবুকে আমরা