নাসরীন নঈম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং বিএড শেষে ভিকারুন্নিসা নুন স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। এ পর্যন্ত লেখকের আঠারোটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

বনবালিকা

ইঞ্জিনিয়ার মতবুল আলী তার প্রথম সন্তানের নাম রেখেছেন মনীষা। কোনো এক ভরা বর্ষার মধ্যযামে মেয়েটির জন্ম হয়েছিলো। ওর মা বলেছিলেন- ওর নাম নিশি। আমি ওকে নিশি বলেই ডাকবো। কারণ সে গভীর নিশিথে জন্মেছিলো। কেউ ওর কান্নাও শোনে নি। সবাই ঘুমে বিভোর। সেই থেকে মনীষা নিশি হয়ে গেলো। জীবনটাও অনেকটাই যেন নিশিতে পাওয়ার মতোই। বড় নাতি যখন ওকে বলে- ও নিশি দিম্মা ডাকছিতো শোনো না কানে?

তখন উনার খুব ভাল লাগে। আবার কষ্টও লাগে। ঐ নামে ডাকার মতো আর কেউ নেই তার জীবনে। সবাই গত। আসলে ডাক নাম ধরে কেউ ডাকলে মনটা শিশু হয়ে যায়। এখন উনার প্রতিদিন এক পথেই যাওয়া আসা। গৃহকর্মীর সাথে রান্নার কাজে কিছু পরামর্শ দেয়া আর নাতিদেরকে স্কুল থেকে নিয়ে আসা তার নতুন চাকরী। ভালোই লাগে গাড়িতে বসে ছুটে চলা।

জনজীবন দেখা যায়। চালক রবিউল প্রতিদিন একই জায়গায় গাড়িটা রাখে। সাত নম্বর রোডের মসজিদ ছেড়ে। বাঁয়ে গাছ তলায়। ছায়ায়। পাশে ফুটপাত দখল করে সংসার পেতেছে কয়েকটা পরিবার। তিনটা মেয়ে দারুন ব্যস্ত জামাকাপড় ভাঁজ করছে। বক বক করছে। কি যে বলছে শোনা যায় না। কিন্তু মুখে একটা বিরক্তির ঝাঁঝ লক্ষ্য করা যায়। চারটা পাঁচ ছ-বছরের শিশু মাটিতে বসে খেলা করছে। বাচ্চাগুলোর মধ্যে কোনটা মেয়ে কোনটা ছেলে ঠিক আন্দাজও করা যায় না। একটির চুল বড়। চোখ দু’টোও বেশ মায়াবী। চেহারার মধ্যে  একটি ভদ্রতার ছাপ। এটাই বোধ হয় মেয়ে। এরই মধ্যে একটা পাউরুটি দিয়ে গেলো একজন পথচারী। শুরু হয়ে গেলো কাড়াকাড়ি। মারামারি।

কোথা থেকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে একটি কুকুর এসে দাঁড়ালো ওদের সামনে। অবাক চোখে তাকালো কুকুরটা ওদের দিকে। মনে মনে বললো- আমরা না হয় কুত্তা। ময়লা থেকে খাবার খুঁজি। কাকের সাথে কাড়াকাটি করি। কিন্তু মানুষের বাচ্চাগুলো এমন করে কেনো? এরা কোনো শিক্ষা পায়নি। এটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেলে কুকুরটা ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলে গেলো।

দুটো পুরুষ চটের বস্তার ওপর বসা হাড় বের করা বুকের পাঁজর দেখিয়ে বলছে

- এ্যাই দেখ আমার মতন মাইনষেরে

পাবি কুতায়। তর কপাল বালা। জানছ তর মায় আমার কাছে নিকাবইবার চাইছিলো। আমি না কইরা দিয়া তর কাছে আইছি ...।

- চুপ হালার ব্যাটা। ওকে থামিয়ে

দিলো একটি মেয়ে। বুঝা গেলো ওরা স্বামী স্ত্রী। কিংবা নাও হতে পারে। এক সাথে থাকে। লিভ টুগেদার। ফলে সন্তান উৎপাদন হয়েই যায়। নারী স্বাধীনতাতো এই শ্রেণির জন্যই। একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধের পর মেয়ে মহিলা সব গ্রাম থেকে হুড়মুড় করে শহরে চলে আসে। প্রথমে পোশাক তৈরীর কারখানায় বোতাম লাগানো। আর ইস্ত্রি করার কাজ নেয়। ওখান থেকেই শুরু হয়। কো-এডুকেশনের মতো ফ্রি-মেলামেশা। সারাদিন পুরুষের সংস্পর্শ। মন কেমন করা দুপুর। এক বাটি থেকে ভাত রুটি ভাগাভাগি করে খাওয়া। ঘরে বউ রেখেও নতুন একজনের প্রেমে পড়া। আর প্রেমের পরিনতি বিয়ে। বাধ্য হয়ে বিয়ে করতে হয়। একটা দু’টো বাচ্চা হয়ে যায়। এগুলোর দায়িত্ব কে নেবে। পুরুষগুলো চলে যায় আগের সংসারে। বোকা মেয়েগুলো সন্তান নিয়ে রাস্তায় বসে। ফুটের ওপর সংসার গড়ে। রাতের আঁধারে নতুন অতিথি আসে। বাধ্য হয়ে দেহ বিক্রি একশো দু’শো টাকার জন্য। স্বাধীন দেশে স্বাধীন মানুষতো ওরাই। পাছে লোক কিছু বলের ভয় ওদের নেই।

মেয়েটা কোমরে ওড়না পেচিয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়- তুই কি ব্যাডা নিহি খানকির পুত। মাগীবাজ। রোজ রাইতে কই যাস আমি জানি না। পার্কের ভিতরে বুইড়া মাগীর লগে তুই হোতোস না? পঞ্চাশ ট্যাহার লোভে।

- হ ... হ হুতি তোর মায়ের লগে হুতি তুই জানস না।

- চুপ কুত্তার ছাও।

লোকটাকে দেখে মনে হয় পাগল। মুখভরা দাড়ি। হাতে কতগুলো চুড়ি বালা। গলায় হরেক রকম পুঁতির মালা। কণ্ঠস্বরটাও কেমন শ্লেষ্মা জড়ানো ঘ্যার ঘেরে।

মেয়েটা কেনো এই লোকটার সাথে সম্পর্ক তৈরি করলো কে জানে। তিনটা বাচ্চা মনে হয় এই মেয়েটারই। কিন্তু ওদের বাবা ওই লোকটা। নাও হতে পারে। লোকটা তো বেশ অসুস্থ এবং বয়স্ক।

চিন্তার সীমানা ভেঙ্গে দিয়ে আর একটি মেয়ে তখন একটি ঠেলাগাড়ি নিয়ে ওদের কাছে ভিড়ে গেলো। গাড়ির মধ্যে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে একটা পুরুষ। তার মাথার ওপর একটি ছাতা মেলে রাখা হয়েছে গাড়ির হাতলের সাথে বেঁধে। রোদ বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্য। লোকটার বয়স আন্দাজ করা যাচ্ছে না। যে মেয়েটি ওকে ঠেলে নিয়ে আসলো ওর বয়স আঠারো থেকে কুড়ির মধ্যে হবে। মেয়েটা ধপাস করে ফুটের ওপর বসে নিজের মুখের ঘাম ওড়না দিয়ে মুছতে মুছতে বললো

-কি অইছে আঙ্গুরী। এত চেইত্যা আছোস ক্যারে।

- আরে দেহনা হালার পুতে সারারাইত বুড়িগো লগে থাইক্যা সকালে আহে আমার কাছে। ট্যাহা চায়। ওর বাহের ট্যাহার সিন্দুক আমার কাছে বন্ধক রাখচে নিহি কও দেহি।

- বালা অইতাছে না আঙ্গুরী।

ঐ পাগলের মতো লোকটা চোখ বড় বড় করে তাকালো।

ঠ্যালা গাড়িতে শুয়ে থাকা লোকটা পঙ্গুত্বের বাঁধা কাটিয়ে উঠে বসলো।

- এ খানকী আমাকে, কই নিয়া আইছস?

- গাইল পাড়বা না কইয়া দিলাম।

আমি তুমার বিয়া করা বউ না। এই রইদ্দের মইধ্যে আর ঠেলতে পারুম না। আঙ্গুরীর স্বামী ঐ পাগলের মতো লোকটা এবার এই মেয়েটার পক্ষ নিলো।

- ঠিক অইতো মিয়া তুমারে আর কত ঠেলবো।

তুমিতো অহনো হ্যারে বিয়া করো নাই গাড়িতে বসা লুলা লোকটা গর্জে উঠলো

-অই তুই কতা কস ক্যা? তুই কি অর মায়রে হাঙ্গা করছস নাহি। মাকুন্দা হালা।

ওঁর মাথার ভেতর লাল পিঁপড়ার ঝাঁক এসে কামড়াতে লাগলো। ওরে বাবা। এই রবিউল গাড়িটা সরাওতো এখান থেকে। আর একটু সামনে আগাও। এমন দুর্গন্ধময় জীবন ওরা কিভাবে বহন করে। ওরা নিজেরাই নিজেদেরকে এভাবে পঙ্কিলতার ভেতরে ফেলে দেয়। কি দরকার তোর ঐ পঙ্গুটাকে ঠেলে নিয়ে পথে পথে ভিক্ষা করার? গৃহস্থ বাড়িতে কাজ করলে ওতো একটি ভদ্র জীবন পাওয়া যায়। নাহ। পুরুষের সঙ্গ লাগবে। তাও আবার পঙ্গু পুরুষ। বহুগামী পুরুষ। কর্মহীন পুরুষ। আঙ্গুরীর মতো মেয়েরা ইচ্ছে করলেই একটা ভদ্র জীবনে যেতে পারে। না তা ওদের ভালো লাগবে না। ওরা স্বাধীনতা চায়। বন-বালিকা হয়েই বেঁচে থাকতে চায়।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।