বাবা মা হতে হলেও সাধনার প্রয়োজন

মঙ্গলবার, মে ১২, ২০২০ ১:০৫ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


দীর্ঘসূত্রিতা বা কাজের আগে লম্বা প্ল্যান বাঙালির আবহমান কালের সংস্কৃতির মধ্যে একটা। লক্ষ্য করলে দেখবেন, বাঙালি সমাজে লাখ কথার কমে বিয়ে হয় না, চৌদ্দবার প্ল্যান এবং বারোবার সেই প্ল্যান ক্যানসেল করা ছাড়া একটা ট্যুর হয় না, এমনকি পাড়ার গানের জলসাও কুড়িটা রিহার্সাল ছাড়া হয় না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবেই বাঙালি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে একটা নেয় কোনোপ্রকার প্ল্যান প্রোগ্রাম ছাড়া অন্যান্য হাজাররকমের বাহ্যিক এবং সামাজিক চাপে পড়ে। সেটা হলো বাচ্চা পয়দা করা। আমি অবশ্য এখানে এভারেজ বাঙালির কথাই বলছি। সব নিয়মেরই কিছু ব্যতিক্রম তো আছেই। সেটা এখানে ধর্তব্য না।

শিশু জন্ম দেওয়ার আগে সবচেয়ে আগে দরকার মা বাবা দুজনেরই মানসিক প্রস্তুতি। সেই সাথে মা বাবার ভিতরে চমৎকার সম্পর্ক, মানসিক বোঝাপড়া এবং পারিবারিক বন্ধন, জন্মের পর শিশুর লালনপালনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, এবং সর্বোপরি শিশুপালনের সামগ্রী কেনার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আর্থিক সামর্থ্য। যদি কেউ সিঙ্গেল প্যারেন্ট হতে চান সেক্ষেত্রেও শিশুর সুষ্ঠু লালনপালনের জন্য আর্থিক এবং মানসিক সামর্থ্য একটা বড়ো নিয়ামক।

কিন্তু আমাদের দেশে আমরা সাধারণভাবে কী দেখি? শিশু জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে মা বাবার প্ল্যানিং এর বদলে এক্ষেত্রে বেশি কাজ করে সামাজিক চাপ। ছেলেদের ক্ষেত্রে নিজের পুরুষত্ব প্রমাণ করার এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের অপবাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় শিশু। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মারামারি, লাঠালাঠি বন্ধের ওষুধ হিসেবে শিশু জন্মদান প্রস্তাব করা হয়। শিশুর জন্মের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কোনো ক্ষেত্রে দাদার "নাতির মুখ দেখার আবদার" তো কোনো ক্ষেত্রে নানীর "মরার আগে নাতির মুখ" দেখার ইচ্ছা। কোনো ক্ষেত্রে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার কারণ হয় ভবিষ্যতের ইনভেস্টমেন্ট অথবা তথাকথিত "বংশ রক্ষা"। ছেলে শিশুর আশায় একটার পর একটা মেয়ে শিশুর জন্ম দিয়ে যাওয়া এই মানসিকতারই প্রতিফলন। এক কথায়, সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে বাবা মা সবকিছুই চিন্তা করে, শুধু চিন্তা করে না একটা মানবশিশু জন্ম দেওয়া এবং লালনপালনের যোগ্যতা তার আছে কিনা।

আর এভাবে বাচ্চার মা বাবার মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে আর্থিক, মানসিক সামর্থ্য বিচার করে বাচ্চা জন্ম না দেওয়ার কারণে দেখা দেয় মা বাবা এবং সন্তানের মধ্যে বিষাক্ত সম্পর্ক। যার ফলশ্রুতিতে কেউ তার জীবনের সমস্ত না পাওয়ার বোঝা সন্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে সন্তানের জীবনটাই নষ্ট করে, কেউ বা আবার নিজের সন্তানকে দায়ী করে জীবনের সমস্ত ব্যর্থতার জন্য, আবার কেউ কেউ সন্তানকে টাকার মেশিন বানিয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মগ্ন থাকে। আর যে সন্তান চারাগাছ অবস্থাতেই শেকড়ের মাধ্যমে বিষ আহরণ করে, বড়ো হয়ে তার কাছ থেকে সমাজ বিষাক্ত ফলই পায়।

একটা মানবশিশু জন্ম দেওয়া এবং তাকে লালন পালন করে বড়ো করা খুব তুচ্ছ কোনো বিষয় না। লালনপালনের সামান্য ঘাটতি, পারিবারিক সহিংসতা এবং পরিবেশের প্রভাবে শিশুটি বড়ো হয়ে সিরিয়াল কিলার হতে পারে, ধর্ষক হতে পারে, নৃশংস পশু হত্যাকারী হতে পারে, মেয়েদের ভোগের বস্তু মনে করার মাইন্ডসেট নিয়ে বড়ো হতে পারে।

মা বাবা হওয়া মুখের কথা না। জন্ম দিলেই মা বাবা হওয়া যায় না । মা বাবা হতে হলেও সাধনার প্রয়োজন হয়। আর সেই সাধনার শুরুটা হয় শিশুর জন্মের আগেই তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে। কাজেই চলুন, আমরা মা বাবা হই শুধু নিজেদের ইচ্ছায়, অন্যের প্রেশারে না, কিছু "প্রমাণ" করার জন্যে না, ভবিষ্যত ইনভেস্টমেন্ট, "ফিক্সড ডিপোজিট" এর ব্যবস্থা করার জন্যে না।

আমরা মা বাবা হওয়ার আগে ভাবি, একটা মানবশিশু পৃথিবীতে আনা এবং তাকে উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার যোগ্য তো আমরা?


  • ২৪১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

বৈশালী রহমান

রিসার্চ এসিস্টেন্ট, নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা।

ফেসবুকে আমরা