বিপ্লব ভট্টাচার্য

লেখক একটিভিস্ট।

ফ্রিদা কাহলো (পর্ব-০২)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর) শিল্পী জীবনের ভিত গড়াতে আরো একজন মানুষের অবদান আছে। তিনি ফার্নান্দো ফার্নান্দেস। ফার্নান্দো ফার্নান্দেস ছিলেন ফ্রিদার বাবার বন্ধু। কমার্শিয়াল প্রিন্টমেকার হিসাবে তিনি সবার কাছে সুপরিচিত এবং শ্রদ্ধেয় ছিলেন। স্কুলের শিক্ষা শেষ করার পর তাঁর সাথে কাজ করার জন্য ফ্রিদাকে তিনি নিজের কাছে নিয়ে যান। ফ্রিদাকে ড্রইং এর কলাকৌশল শেখান এবং সুইডিশ ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী আন্দ্রেস জর্ণ-এর প্রিন্ট কপি করান। সে সময় ফ্রিদার প্রতিভায় আশ্চর্য হন ফার্নান্দেজ।
শিল্পী জীবনের শুরুতে ফ্রিদার ছবিতে নিজস্ব কোনো স্টাইল ছিলো না। ফ্রিদার প্রথম দিককার ছবিতে তাঁর পছন্দের শিল্পীদের ব্যবহৃত মোটিফ এবং স্টাইল লক্ষ্য করা যায়। ফ্রিদা প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি আঁকেন ১৯২৬ সালে ‘সেল্ফ পোর্ট্রেট ইন এ ভেলভেট ড্রেস’। ইউরোপিয়ান রেনেঁসাঁস মাস্টারদের কাজ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত উনিশ শতকের মেক্সিকান প্রতিকৃতি শিল্পীদের রীতিতে এটি আঁকা। এই আত্মপ্রতিকৃতিটি যেনো বত্তিচেল্লির ‘ভেনাসের’ ফ্রিদা সংস্করণ। অন্যান্য প্রতিকৃতি চিত্র যেমন- “পোর্ট্রেট অফ এলিসিয়া গ্যালেন্ট”, এবং তাঁর বড় বোনের প্রতিকৃতি চিত্র “পোর্ট্রেট অফ আড্রিয়ানা” তেও ফ্রিদা এই রীতিতে কাজ করেছেন। উনিশ শতকের মেক্সিকান প্রতিকৃতি চিত্রশিল্পীদের ব্যবহৃত আরো কিছু বিষয় ফ্রিদা তাঁর ছবিতে এনেছেন। যেমন, ঝুলন্ত রঙিন পর্দাসদৃশ ছবির পশ্চাদপট। তাঁর “সেল্ফ পোর্ট্রেট-টাইম ফ্লাইস’ (১৯২৬) থেকে শুরু করে পরে আঁকা “পোর্ট্রেট অফ এ উওম্যান ইন হোয়াইট” (১৯৩০), “সেল্ফ পোর্ট্রেট ডেডিকেটেড টু লিওন ট্রটস্কি” সহ আরো বেশ কিছু ছবিতে তিনি এই মোটিফ ব্যবহার করেছেন।

ফ্রিদা এবং দিয়েগো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯২৯ সালের ২১ আগস্ট। অনেকেই এই বিয়ে নিয়ে আড়ালে হেসেছেন। কেউ কেউ একে হাতির সাথে পায়রার বিয়ে বলে মন্তব্য করেছেন। এই বিয়ে যে ফ্রিদার জীবনে শান্তি এনেছিলো তা বলা যাবে না। আর এই অশান্তির কারণ বেশিরভাগ সময়ে ছিলেন দিয়েগো । ফলে বিয়ে পরবর্তীতেও এক কষ্টকর জীবন কাটিয়েছেন ফ্রিদা। ফ্রিদা ছবি আঁকলেও তখনো তাঁর ছবি তেমন একটা আলোচিত বা প্রচারিত হয়নি। আর তখন দিয়েগো ছিলেন মেক্সিকোর বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় শিল্পী। যার কারণে ফ্রিদার শিল্পী জীবনের প্রথম দিকের অনেকটা সময়ই কেটেছে তাঁর বিখ্যাত স্বামী দিয়েগো রিভেরার শৈল্পিক ছায়ায়। তবে জীবৎকালেই তাঁর কাজ শিল্পকলার জগতে আলোচনার ঢেউ তুলেছিলো। আর তারপরের কথা সবার জানা, শিল্পকলার ইতিহাসে বিংশ শতকের অন্যতম মহৎ শিল্পী হিসাবে ফ্রিদার খ্যাতি। একসময় রিভেরার খ্যাতির আড়ালে থাকলেও এখন তিনি রিভেরার মত এমনকি হয়ত তাঁর চেয়েও বেশি বিখ্যাত।

বিয়ের পর দিয়েগো মেক্সিকান জনপ্রিয়- ‘ফোকলোরিক’ ধারায় আঁকতে বললেন ফ্রিদাকে। আরো আঁকতে বললেন মেক্সিকোর আদিবাসী এবং শ্রমজীবি মানুষ, যেরকম তিনি এঁকেছেন তাঁর বিভিন্ন ম্যুরালে। এই উৎসাহের ফলস্বরূপ ফ্রিদা আঁকলেন ‘টু ওমেন’। এই ছবিটির মধ্যে রিভেরার ম্যুরালের অনেক চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে প্রকটভাবে। সেই উজ্জ্বল রঙ, সেই শৈলী, সেই একই ফিগার। এই ছবিটি যেনো রিভেরার কোনো একটি ম্যুরালের একটি অংশের ক্লোজ আপ। এই ছবির কিছু বৈশিষ্ট্য ফ্রিদার আরো অনেক ছবিতে এসেছে।

দিয়েগো যখন বিভিন্ন জায়গায় ম্যুরাল করতেন, কোনো কোনো সময় তাঁর কাজের জায়গায় তাঁকে সঙ্গ দিতেন ফ্রিদা। তাঁর ম্যুরালের একাধিক ফিগারে ফ্রিদার ছায়া দেখা যায়। দিয়াগোর ম্যুরালগুলো সাধারণত বড়ো। ১৯৪৫ সালে ফ্রিদা নিজেই একটি ম্যুরাল আঁকলেন ক্যানভাসে। তবে এটির সাইজ মাত্র ২৪ ইঞ্চি বাই ৩০ ইঞ্চি (৬১ বাই ৭৫ সেমি.)। এটির নাম ‘মোজেস’ কিংবা ‘নিউক্লিয়াস অফ ক্রিয়েশন’। এই ছবিটির অনুপ্রেরণা পান সদ্য পড়ে শেষ করা সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের বই “মোজেস দ্য ম্যান এন্ড মনোথিস্টিক রিলিজিয়ন’ থেকে। এই ছবির রীতি দিয়েগো দ্বারা অনুপ্রাণিত।

শিল্পী এডোলফো বেস্ট মোগার্ড- এর আদর্শে বিশ্বাসী মেক্সিকান শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের একটি গোষ্টীর সাথে যুক্ত ছিলেন ফ্রিদা। ১৯২৩ সালে একটি বইতে মেক্সিকান শিল্পের প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে কথা বলেন মোগার্ড। তিনি বলেন, ছবিতে উনবিংশ শতকের মেক্সিকান চিত্রশিল্পীদের ব্যবহৃত উপাদান ও ফর্ম ব্যবহার করা উচিৎ। এই গোষ্ঠী ছবির এই ‘ফোকলোরিক’ রীতিকে বলতেন ‘মেক্সিকানইজম’। চারুকলার ইতিহাসেও এটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আমেরিকানরা এই আন্দোলনের নাম দেয় ‘মেক্সিকান রেনেঁসা’। তাঁর দ্বিতীয় আত্মপ্রতিকৃতি ‘টাইম ফ্লাইস্’-এ ফ্রিদা এই ‘মেক্সিকানইজম’ রীতি প্রয়োগ করেন। এতে উজ্জ্বল বর্ণের ব্যবহার লক্ষণীয়। তাঁর পূর্ববর্তী ছবিগুলোতে ব্যবহৃত অভিজাত রেনেসাঁস ভেলভেট পোশাকের জায়গায় এসেছে তুলাচাষীর সাধারণ পোশাক। তাঁর পরিধানের অলঙ্কার প্রি-কলাম্বিয়ান এবং উপনিবেশিক সংস্কৃতির প্রভাবেরই প্রমাণ। এই ছবি দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে তাঁর রক্তে প্রবাহিত মেক্সিকান সংস্কৃতির মূলে ফিরে আসছেন ফ্রিদা। জাতীয় পরিচয়কে আরো স্পষ্ট করতে এই প্রতিকৃতিতে মেক্সিকান পতাকার রঙ- লাল, সাদা ও সবুজ রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। চিত্রশিল্পী হিসাবে ফ্রিদার নিজস্ব স্টাইল দাঁড় করানোর চেষ্টা এই আত্মপ্রতিকৃতিতে স্পষ্ট।

ফ্রিদার ছবিতে প্রি-কলাম্বিয়ান সময়কালের শিল্পকলার গভীর প্রভাব ছিল। ফ্রিদা-রিভেরার আবাসস্থলের সর্বত্র ঐ যুগের শিল্পের নমুনা দেখা যেতো। দিয়েগো সংগ্রহ করতেন ভাস্কর্য ও নানান আকৃতির দেবমূর্তি। আর ফ্রিদার ঝোঁক ছিল সে সময়কার অলঙ্কার সংগ্রহে। বিভিন্ন সময় তাঁর বিভিন্ন আত্মপ্রতিকৃতিতে যেমন- ‘সেল্ফ পোর্ট্রেট- টাইম ফ্লাইস’(১৯২৬), ‘সেল্ফ পোর্ট্রেট উইথ মাঙ্কি’ (১৯৩৮), ‘সেল্ফ পোর্ট্রেট উইথ ব্রেইড’ (১৯৪১) এবং আরো কিছু ছবিতে তাঁকে তাঁর সংগ্রহের অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। ফ্রিদার মতে তাঁর ছবিতে এইসব শিল্পের নমুনা যুক্ত করার কারণ এগুলো তাঁকে দিয়েগোর কথা মনে করিয়ে দেয়।

তাঁর অনেক ছবিতে দিয়েগোর সংগ্রহের আরো কিছু জিনিসও দেখা যায়। এগুলো কোন কোন ছবির মডেল অথবা প্রেরণা হিসেবেও এসেছে। ১৯৩২ সালে আঁকা তাঁর ‘মাই বার্থ’ ছবিতে তিনি নিজের কল্পনায় তাঁর জন্মদৃশ্য এঁকেছেন। সম্ভবত আজটেক দেবী তাজোল্টিওল্ট এই ছবির মডেল। ১৯৩৭- এর ‘মাই নার্স এন্ড আই’ ছবিতে তিওতিহুয়াকান মুখোশ পরে আছে নার্স এবং ‘ম্যাডোনা এন্ড চাইল্ড’ ছবিটি সম্ভবত একটি প্রি-কলাম্বিয়ান ভাস্কর্যের অনুসরণে আঁকা। তাঁর আরো কিছু ছবি যেমন, ‘দ্য ফোর ইনহ্যাবিটেন্টস্ অফ মেক্সিকো সিটি’ (১৯৩৮), ‘গার্ল উইথ ডেথ মাস্ক’(১৯৩৮), এবং ‘সেল্ফ পোর্ট্রেট উইথ স্মল মাঙ্কি’ তে (১৯৪৫) প্রি-কলাম্বিয়ান যুগের শিল্প-নমুনা দেখতে পাওয়া যায়। ১৯৪৯-এ আঁকা একটি ছবিতে বিষয় হিসেবে ব্যবহার করেছেন মেক্সিকান পৌরাণিক বিষয়কে।

535 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।