নুসরাত বাবলী

লেখক

বিয়ের পরই ছেলেদের সমাজ সংসারের প্রতি প্রেম উতলে উঠে

একজন পুরুষ যতটা মূল্য তার পরিবারকে দিবে ঠিক ততোটাই মূল্য তার সঙ্গী কে দিতে হবে। আপনি এখানে একপক্ষ নিয়ে বসে থাকবেন বা কোনো পক্ষপাতীত্ব না করে মহা পুরুষ সাজার ভান করবেন সেটা তো হতে পারে না। কখনোই এমন কথা বলবেন না যে তোমাদের লড়াই তোমরা লড় আমাকে এর মধ্যে টানবে না আমার শুধু একটা কথা মরো বাঁচো এখানেই থাকবে।

এতে আপনার কিংবা আপনার পরিবারের কিছু হবে না আপনারা আপনাদের জায়গাতেই থাকবেন কিন্তু অসহায় মেয়েটা এই চাপ থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজবে, মানব মস্তিষ্ক মানসিক চাপ নিতে পারে না সে উপায় খুঁজে বের করে এই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার। এতে বিষয় গুলো বেশির ভাগই হিতে বিপরীত হয়। তাই বাধ্য করবেন না কাউকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেঁধে মানিয়ে নেবার কারণ মেনে বা মানিয়ে নেবার ব্যাপার গুলো হৃদয় থেকে আসতে হয় কাউকে বাধ্য করে নয়। একটা প্রবাদ শুনেছি ছোট বেলা থেকেই- ঘসে মেযে রূপ আর ধরে বেঁধে প্রেম কখনো হয় না। 

আপনি যতই ঘসেন মাজেন যার যেমন রুপ ঠিক তেমনি থাকবে আর ভালোবাসাও ঠিক তাই মন থেকে না আসলে যতোই জোর প্রয়োগ করেন যতটুকু সত্যিকার অর্থে আসবে ঠিক ততটুকুই এক ফোঁটা কম কিংবা বেশি হবে না, চাইলেও না। আপনি চাইলেও সবাইকে এক ছাদের নিচে রেখেও সেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কখনোই পাবেন না যা কোনো অর্থের বিনিময় ছাড়াই হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে আসে। 

যেদিন বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে আপনি যে মেয়েটার দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেদিন থেকেই ঐ মেয়েটার আত্নসন্মান ও স্বপ্নের দেখভালের দায়িত্বও আপনাকে দিয়েছিলো মেয়েটা নিজের অবচেতন মনেই। আর আপনাকেও তার যথাযথ পরিচর্যা করতে হবে বলে আমি মনে করি কারণ আপনি আপনার পরিবারের সাথে ছিলেন আছেন এবং থাকবেন কিন্তু মেয়েটা তার বন্ধু বান্ধব পরিবার ছেড়ে এসেছে সম্পূর্ণ এক নতুন পরিবেশে।

এখানে সব কিছুই তার জন্য নতুন। নতুন পরিবেশে নতুন মানুষ সব, সবই নতুন তার কাছে। যদি কখনো পক্ষপাতীত্ব করতেই হয় তাহলে ঐ অসহায় চোখে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েটার জন্য করুন। আমি বলছি না তার জন্য আপনি আপনার পরিবারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করুন কিংবা তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করুন কিন্তু যদি কেউ তাকে দু’টো কথা শোনায় তবে তার হয়ে উওরটা আপনি দিয়ে দিন। কারো সামনেই যে বলতে হবে আমি সেটাও বলছি না, আড়ালে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিন তোমরা যার সাথে খারাপ ব্যাবহার করছো সে আমার বিবাহিতা। তাদের কে বুঝিয়ে দিন তাকে অপমান করা মানে আপনার অপমান তাহলে ব্যাপার গুলো অনেকটাই কমে আসবে।

বিশ্বাস করুন যখন একটা মেয়ে শশুর বাড়ীর লোকেদের কাছে কারণে বা অকারণে কোনো বেশি কথা শুনে বা তাদের অবহেলার পাত্রী হয় তখন সে অসহায় দৃষ্টিতে সবার প্রথমে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে এই বিশ্বাস নিয়ে যে কেউ না হোক এই বাড়ীতে একজন অন্তত আছে তার জন্য, যে তার হয়ে বলবে। কিন্তু বোকা মেয়েটাকে কে বুঝাবে তোমার জন্য কেউ নেই মেয়ে, তোমার লড়াই তোমাকে নিজেকেই লড়তে হবে। এভাবে একদিন দু’দিন করে আপনি তাকে পথ দেখিয়ে দিলেন নিজের লড়াই নিজেকে লড়ার জন্য বাধ্য করলেন তাকে। কিন্তু সার সংক্ষেপে তেজি বিড়াল টাই খারাপ হবে, মানে মেয়েটাকে সবাই খারাপ বলবে কারণ একটাই সে নিজের জন্য লড়েছিলো। একটু শান্তিতে বেঁচে থাকার লড়াই লড়েছিলো। এখানে মেয়েটার দোষ দিলে ভুল করবেন। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিতে চাই এ বিষয়ে-

প্রাণীদের মধ্যে বিড়াল একটা গৃহপালিত নিরিহ প্রাণী এ কথা আমার সবাই জানি। আমারা এটাও জানি বিড়াল কখনো বিনা কারণে কাউকে কামড়/ আঁচড় দেয় না। এখন আপনি যদি কোনো বিড়াল কে ভয় দ্যাখাতে থাকেন আর সে পেছনে সরতে থাকে একটা সময় দেখা গেলো দেওয়ালে তার পিঠ ঠেকে গেছে এক প্রকার বাধ্য হয়েই সে আপনাকে কামড়/ আঁচড় কাটবে। এই সময়ে আপনি যদি বলে বেড়ান বয্যাত বিড়াল হুদাই কামড়ে/ আঁচড়ে দিয়েছে তাহলে তো হলো না। বলতেই যদি হয় স্পষ্ট করে বলুন যে ভয় দেখিয়ে কামড় খেয়েছেন। হুদাই বিড়ালের দোষ দিয়ে লাভটা কি আপনার, মানুষের কাছে ভালো সাজা? মানুষ সবই জানে শুধু মুখ খুলে না।

ঠিক এমনি ভাবেই আপনি ও মেয়েটাকে বাধ্য করছেন ব্যাবহার খারাপ করতে এবং পথটাও আপনিই দেখিয়ে দিচ্ছেন স্বীকার করেন আর নাই করেন। এখানে একজন পুরুষের যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তেমনি বাড়ীর লোকেদের ও বুঝতে হবে সে আমার ছেলে/ ভাই এরই একটা অংশ। আপনার পরিবারের সদস্য হিসেবে ছেলেটার যতটুকু অধিকার রয়েছে তার চাইতে কোনো অংশে মেয়েটার ও কম নয়। কারণ আপনি যেমন কষ্ট করে ছেলেকে লালন পালন করেছেন সুশিক্ষিত করে তুলেছেন মেয়েটার মাও ঠিক একই কষ্ট করে তাকে এই পর্যন্ত এনেছে।

আর যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ের পছন্দের বিয়ে, যদি আপনার কিংবা পরিবারের অন্যকারো কাছে বউ হিসাবে মেয়টা পছন্দ না হয় তবে দোহাই আপনারা ইচ্ছাকৃত কোনো মেয়ের জীবন নরক বানাবেন না। পছন্দ না হলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করবেন না এতে করে ছেলে মেয়ে সাময়িক কষ্ট পেলেও একটা সময় ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু যদি তার উল্টোটা করেন তাহলে সারাজীবন না হলেও যতদিন মেয়েটাকে অপছন্দের মানুষ গুলো জীবিত আছে তাঁরা মেয়েটার জীবন মৃত্যুর আগেই নরক বানিয়ে ফেলবে। এখানে মুরব্বিদের থেকে আমাদের  দায়িত্ব বেশি একটা ছেলেই পারে তার সঙ্গী কে তার হক আদায়ে সহায়তা করতে। তাকেই বুঝতে হবে বাড়ীতে তার যতটুকু সন্মান অধিকার তার থেকে এক অংশ ও কম নয় তার সঙ্গী, কারণ সে তারই একটা অংশ।

এবার আসি পুরুষের বিয়ের পর সমাজ সংসারের প্রতি প্রেম উতলে উঠার ব্যাপারে। এই কথাটা শুনে অনেকেরই রক্ত মাথায় উঠতে পারে কিন্তু কথাটা বলার পেছনে যুক্তিযুক্ত কারণ আমার কাছে আছে পড়তে থাকুন নিজেই বুঝতে পারবেন।

যে ছেলেটা রাতের পর রাত জেগে মেয়েটার ধূসর স্বপ্নে রং ঢেলেছে। দিনে কম হলেও দশ বার ফোন করে খবর নিয়েছে। খেয়েছ কিনা প্রশ্নের জবাবে মাছ শুনে দ্বিতীয় প্রশ্ন করেছে কি মাছ? কি দিয়ে রান্না করেছে?

মেয়েটার পরিবার/সহপাঠী/সহকর্মী কারো সাথে মনোমালিন্য হলে সান্ত্বনার বানী শুনিয়ে বলেছে কি হয়েছে তাতে আমি আছিতো। কোনো এক ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে বাবার অনুমতি না পেয়ে মন খারাপের সময় পাশে বসে বলেছেন কিচ্ছু হবে না আমি আছি না তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে। বিয়ের পর সেইসব বানী মিথ্যা আশ্বাস কোথায় যায়? তখন কেনো সময় হয় না ফোন করে পাঁচটা মিনিট কথা বলার?তখন শুধু মন খারাপ না সারাটা রাত পাশে শুয়ে বোবা কান্নায় বালিশ ভিজালেও তা আর শোনার বা দেখার সময় হয় না, সকালে অফিস আছে আমার তো কাজ করতে হয় বাইরে গিয়ে তোমাকে নিয়ে পড়ে থাকলে তো আর আমার চলবে না এসব শুনতে হয়। কোনো ইচ্ছারই তখন আর মূল্য থাকে না মেয়েটার। কারণ মৃত্যুর পর হৃদয়ে ইচ্ছার কোনো মূল্য থেকে না। হ্যাঁ মেয়েটা তো এখন মৃত যেদিন তার স্বপ্ন গুলোর মৃত্যু হয়েছিলো সেদিন তার আত্মার ও মৃত্যু ঘটেছিলো। শরীর থেকে আত্নাটা বেরিয়ে গেলে যদি আমার বলি মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাহলে শরীরের ভেতরে থেকে স্বপ্নের গলা টিপে হত্যা করা আত্নাটা কি মৃত নয়?  

এখন আর  আপনার সময় হয় না আপনার ভালোবাসার মানুষটি পাশে বসে তার সাথে দুদন্ড কথা বলার। স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্টে ভেঙ্গে পড়া মেয়েটাকে সান্ত্বনার বানী শোনাবার। তার ইচ্ছার মূল্য দিতে গেলে আপনার পরিবার আহত হয় তবে কেনো দেখিয়েছিলেন তাকে মিথ্যা স্বপ্ন? কেনো, কোন উদ্দেশ্যে ছিলো ঐ সব স্বান্তনার বানী? তখন তাকে পাওয়ার স্বাদ নিজেকে গ্ৰাস করছিল সেজন্য? এখন তো তাকে পাওয়া হয়ে গেছে নতুন করে পাওয়া বা হারাবার ভয় আর আপনার ভেতরে কাজ করে না তাই? 

এখন আপনার সমাজ সংসার আছে। একটা কি শেষ প্রশ্ন করতে পারি? আপনাদের সমাজে তো অনুমতি ছাড়া আবার মেয়েরা কিছু করা বা বলা মানে কবিরা গুনাহের সমতুল্য। পরিবারের প্রতি আপনার এই গভীর প্রেম ও মমতা বোধ তখন কোথায় ছিলো হে মহাপুরুষ?

2818 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।