যাদের জন্য নারী দিবস : সেই শ্রমজীবী নারীরাই অনুপস্থিত উদযাপনে

শুক্রবার, মার্চ ৯, ২০১৮ ১১:১৩ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


গতকাল আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কেউ কেউ "Happy International Women's Day" লিখে স্ট্যাটাস দিয়েছে, এর অর্থ দাঁড়ায় 'আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে উপভোগ করতেছে। সারা বিশ্বে কি নারীরা সমানাধিকার লাভ করেছে? উত্তর- না, সারা বিশ্বে নারীরা এখনও পিছিয়ে পুরুষদের তুলনায়।পশ্চিমা বিশ্বের নারীরা আমাদের উপমহাদেশের মতন দেশের নারীদের থেকে এগিয়ে থাকলেও তাঁরাও পুরোপুরিভাবে সমান অধিকার লাভ করেন নি। তাঁরাও পুরুষের সমান অধিকার লাভ করেন নি। তাহলে নারী দিবসের দিনে 'Happy" শব্দটি জুড়ে দেওয়ার অর্থ কি, এই মহান দিনটা নিয়ে মজা করা! এই দিবসটা একটি আন্দোলনের দিন, সংগ্রামের দিন,লড়ায়ের দিন,এবং এই আন্দোলন,সংগ্রামতা করেছে নারী শ্রমিকেরা। এই আন্দোলন এখনও চলছে, দুনিয়ার আনাচে কানাচে চলছে, এখনও মুক্তি পায় নি নারীরা। তাই এটা কোনো উপভোগের দিন না। এই দিনটা কোনো ১৬ ডিসেম্বরের মতো দিন না। আমরা ১৬ ডিসেম্বরকে লিখতে পারি "হ্যাপি ভিক্টরি ডে", আমরা যুদ্ধে জিতে বিজয় এনেছি তাই এখন এই দিনটাকে উপভোগ করতে পারি, কিন্তু আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে উপভোগ করার সময় এখনও আসে নি।

প্রতিবছর ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষ্য বিভিন্ন সভা, সেমিনার,সমাবেশ হয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও দিবসটিকে পালন করা হয়ে থাকে আজকাল। মিডিয়ায় বিভিন্ন টকশোগুলো "সফল" নারীদের জীবনগাথা উঠে আসে, কিন্তু নারী শ্রমিকদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে কোনোভাবেই মিডিয়ায় জায়গা হয় না। অথচ এই শ্রমিক নারীদের সংগ্রামের জন্য আজকের এই নারী দিবস। 
সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, এই নারী দিবসের নানান ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজনের পেছনে মূল হোতারা হচ্ছে বিভিন্ন বহুজাতিক কস্মেটিক, প্রসাধনী বুটিক হাউজ ইত্যাদি কোম্পানিগুলো। এই কোম্পানিগুলোর স্পন্সরশিপে চলে নারী দিবসের নানান অনুষ্ঠান। ৮ই মার্চের নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রথম সারির পত্রিকা "প্রথম আলো"তে আদিবাসী নারীদের নিয়ে লেখায় স্থান পেয়েছে কেবল রাঙামাটির মেয়ে তিশা দেওয়ানের তাহসানের সাথে গান গাওয়ার গল্প, কিন্তু স্থান পায় নি কল্পনা চাকমাদের মতন সংগ্রামীদের গল্প। এই পত্রিকায় ঠায় হয় নি পাহাড়ের নারী শ্রমিকদের কথা, পাহাড় কেটে জুমের ফসল ফলানোর নারী শ্রমিকদের কথা,রোদে পুড়ে চামড়া পুড়ে যাওয়ার শ্রমিকদের গল্পকথা। ঠায় হয় নি সমতলের নারীদের কথা, যারা সারাদিন মাথায় ইট-পাথর তুলে উপার্জন করে ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা করানোর নারী শ্রমিকদের কথা। দু-বেলা, দু-মুঠো ভাতের জন্য সারাদিন পরিশ্রম করা নারীদের কথা। কোথাকার এক তিশা দেওয়ান তাহসানের সাথে দু' একবার গান করলো, অমনি তাঁকে নিয়ে কভারেজ করা হলো আদিবাসী নারীদের সাফল্য গাথার কথা। এই হলো কর্পোরেট বাণিজ্যিক নারী দিবসের প্রতিপালন বছরের পর বছর।

নারী দিবসের পেছনে ইতিহাসটি, এবং এই দিনটি কীভাবে আদায় করা হলো। সর্বপ্রথম এ ঘটনার সূত্রপাত হয় আমেরিকার নিউইয়র্কের শহরের, একটি সুতা কারখানার মহিলা শ্রমিকেরা কর্মক্ষেত্রে দৈনিক ১২ ঘণ্টা এবং মানবেতর জীবনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন ১৮৫৭ সালে ৮ই মার্চ। এর প্রতিবাদে তাঁদের উপর চলে পুলিশের অমানবিক নির্যাতন।১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়ঃ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগলো। অতঃপর ১৯৭৫ সালে খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ।

এই বছর নারী দিবসকে ‘সময় এখন নারীর: উন্নয়নে তারা বদলে যাচ্ছে গ্রাম শহরের কর্মজীবনের ধারা’- এই স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় উদযাপন শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের। ১২ ঘণ্টা কর্মদিবসের বিরুদ্ধে নারীর আন্দোলনের স্বীকৃতি হিসেবে ৮ মার্চকে স্মরণ করা হলেও এই দিবসে স্মরণ করা হয় না সেই শ্রমিক নারীদের, স্মরণ করা হয় না আমাদের দেশের পাহাড় - সমতলের নারী শ্রমিকদের। আর তাই তো নারী দিবসকে কেন্দ্র করে নেওয়া বিভিন্ন আয়োজনের বাইরে থাকেন এই নারীরা।


  • ৫৭১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

বিশ্ব চাকমা

বিশ্ব চাকমা মানবাধিকারের প্রথম শর্ত হিসেবে মনে করেন, জাত, বর্ণ, গোষ্ঠী নির্বিশেষে মানুষের প্রথম পরিচয় মানুষ।

ফেসবুকে আমরা