বাংলাদেশের বিপণন বাজার ও ব্রান্ডিং রসায়ন

বৃহস্পতিবার, মে ১৭, ২০১৮ ৬:৩০ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


আপনি যদি কোনো ব্যাংক,বীমা বা ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানীর মার্কেটিং প্রতিনিধির সাথে কথা বলেন আর তিনি যদি মোটামুটি নিশ্চিত হন আপনার আয় নিয়ে আপনি সচ্ছল তবে তিনি আপনাকে একটি একাউন্ট খুলতে, কিংবা একটি লোন নিতে বা একটি ফিক্সড ডিপোজিটের জন্য প্রলুব্ধ করবেন। এবং তা এতটা সহজ বলে আপনার কাছে মনে হবে যেন আপনি চাইলেই সেটা করতে পারেন।

বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারীকরণের পর ৯০দশকের শেষের দিকে এ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছ। অথচ এর আগে হাতে গোনা কয়েকটি সরকারী ব্যাংকে এ সুবিধা দূরের কথা ন্যূনতম ইউটিলিটি বিলগুলি পরিশোধ করতে ক্যাশ কাউন্টার থেকে রাস্তা অবধি লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হতো, একটা লোন পেতে উপরের মহলের কাছে কতদিনই না গ্রাহকের ধর্ণা ধরতে হয়েছে। আর নারী বান্ধব ব্যাংকিং? তা তো ইতিহাস। আমার মনে আছে ত্বত্তাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল রহমান  ব্রাক ব্যাংকের নারীবান্ধব প্লাটফর্ম ‘তারা’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (২০১৬সালে)বলেছিলেন, তিনিও সোনালী ব্যাংকের ব্যাংকার ছিলেন কিন্ত তা ছেড়ে যখন কোল্ড স্টোর ব্যবসা শুরু করতে চাইলেন তখন তাকে নারী বলে ব্যবসায়িক লোনটি পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো। গ্রাহকের ঘরের দরজায় সেবা পৌঁছাতে ৯০ দশকের এর শেষ দিকে মার্কেটিং ও কাস্টমার সার্ভিস চালু হয়। সে সাথে শ্রম বাজারে ভালো সংখ্যক চাকুরীর সুযোগ বাড়ে। একই সাথে বাড়তে থাকে নতুন ব্যাংক, বীমা বা ফিন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউটের সংখ্যা।

ফলে ব্যাংকিং বাজারে বাড়ে তীব্র প্রতিযোগীতা। একই পন্য- হোক তা হোম লোন, অটো লোন বা কন্স্যুমার লোন কিংবা কোনো ফিক্সড ডিপোজিট, ইসলামী ব্যাংকিং সুবিধা, নারী বান্ধব ব্যাংকিং সুবিধা, স্টুডেন্ট পলিসি ইত্যাদি তাতে ইন্টারেস্ট রেট দশমিক সামান্য কম বেশী করে গ্রাহককে প্রলুব্ধ করার বিপনন নীতিতে আটকে আছে প্রতিষ্ঠান গুলি। অথচ মজার ব্যাপার কাস্টমার সার্ভিস, প্রসেসিং ফি, গেস্টেশন পিরিয়ড নামে বিভিন্ন কর্তনের মাধ্যমে একই খরচ বা গচ্ছা গ্রাহককেই পোহাতে হয়। তার চেয়েও বড় কথা মার্কেটিং প্রতিনিধিদের এস এম এস, যখন তখন কল, বা আকস্মিক ভিজিটে আপনার মনে হতেই পারে -আমি ঠকছি নাতো! তাহলে এভাবে্ কি করে দাঁড়াবে ব্যাংকিং সেক্টরের ব্রান্ডিং?

এবার ভাবেন মিডিয়া বাজারে ব্রান্ডিং নিয়ে। এ খাতে নাটক, সিনেমা, রান্না, পোশাক, বিউটি সচেতনতা, বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে সংবাদ, টকশো পর্যন্ত সব অন্তর্ভুক্ত যা পত্রিকা, টিভি, রেডিও, অনলাইনে প্রকাশিত ও প্রচারিত হবার কথা। হচ্ছেও তাই। এতেও  ব্যবসায়িক বিনিময় বা লেনদেনেও বিপণন ও ব্রান্ডিং রসায়ন থাকে। অথচ তা যে অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে গেছে সেটি প্রচারিত বা প্রকাশিত অনুষ্ঠানাদিতে ছাঁপ পড়ে। দেখা যায় উপস্থাপিকার উচ্চারণগত সমস্যা থাকা স্ত্বেও অনুষ্ঠান সম্প্রচার, কিংবা বেসুরো গানের গায়কী নিয়ে একক সংগীতানুষ্ঠান।

আহারে রসায়নই রসায়ন! ভালো দামে পন্য বিক্রয় কখনো ব্রান্ডিং হতে পারে না। বিটিভির একক আধিপত্যের বাজারে যখন ইটিভি এসেছিলো এক বন্ধন নাটকে আউটডোর শুটিং দেখে দর্শক হয়তো প্রথম বুঝলো বিটিভির স্টুডিও ছাড়াও নাটকের শ্যুটিং হতে পারে। কি দারুণ ঘরের ইন্টারিয়ার, কি দারুণ অভিনেতাদের পোশাকের বিভিন্নতা। আমার সন্দেহ আছে ইটিভির বিপণন প্রতিনিধিদের এতটা বেগ পেতে হয় নি যতটা না ব্যাঙের ছাতার মতো গোঁজিয়ে ওঠা টিভি চ্যানেলগুলোর পেতে হয়। আর পত্রিকা! এইতো সেদিন এক নামীদামী পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রধানমন্ত্রীর অর্জনের সংবাদের পাশে রঙের বিজ্ঞাপনটি এমনভাবে ফলাও হলো যেখানে দেখা যাচ্ছে রঙের ডিব্বা থেকে রঙ ঢেলে পড়ছে। হায়রে পত্রিকা, বিজ্ঞাপনদাতাকে খুশি করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্জনকে যে রঙে ভাসিয়ে দিলো তা কে বুঝবে। হয়তো আমিই বেশী বুঝলাম। এসব নিয়ে বেশী কের্তন না করাই ভালো শেষে আমার মতন গরীব মানহানী মামলায় ফেঁসে যাবো। আমিতো ব্রান্ডিং রসায়ন নিয়ে কথা বলছি।

আসি পোশাকের ব্রান্ডিং বাজারে। কত শত ফ্যাশন হাউজ, অনলাইন করছে ফ্যাশন শো, ফেয়ার কত কি। কিন্ত পন্যের বেলায় ঘুরে ফিরে একই কাটিং, একই ফেব্রিকস, একই সুইং। তাহলে পন্যের ডাইভারসিফিকেশন বা বিভিন্নতা কি? আড়ং শুরুতে দেশীয় বাজারে বিদেশী দৌরাত্ম্য কমাতে দেশীয় ধাঁচের সেলাই, শিল্পবোধকে মূল্য দিয়েছিললো। তাদের পেছন দিয়ে এখনকার কাণ্ডারী ধরেছে রং, অঞ্জনস, বিবিয়ানা, অরন্য, যাত্রাসহ আরো অনেকে। কিন্ত পণ্যে এমন কি ডাইভারসিফিকেশন বা বিভিন্নতা বিদ্যমান যা বিপণন প্রতিনিধি আর ব্রান্ডিং কে বেগ পেতে দেবে না? অথচ এই দেশে বিদেশী পণ্য- পাকিস্তানী কাপড়, ইন্ডিয়ান কাপড় লট ধরে আমদানী হয়। রপ্তানী বাজারে গার্মেন্টস ভালো করছে অনেক যুদ্ধ করে। কিন্ত সেখানে ফ্যাশন হাউজগুলো একেবারেই নেই।

পণ্য সে যাই হোক বিপণন ও ব্রান্ডিং নিয়ে আমাদের উৎসাহ কম, এ খাতে প্রফেশনাল সেলিংয়ে ট্রেনিং কম। গ্রাহক বা কাস্টমারের সাথে চেইন অফ রিলেশনশীপ কম। আপনি বাজার থেকে রেফরিজারেটর, ওয়াশমেশিন, এসি কিনলেন। তাতে ৫ বছরের ওয়ারেন্টি দিলো। ব্যাটারী আর মোটরে দিল ২ বছরের গ্যারান্টি। কিন্ত যখন সার্ভিসিং এর জন্য আপনি কাস্টমার কেয়ারে কল দেবেন এক তিক্ত অভিজ্ঞতা হবে আপনার। নামমাত্র একটা সার্ভিসিং দিয়ে আপনাকে জানানো হবে আপনার পন্যের ওমুক পার্টস টি জ্বলে গেছে যা ঠিক করতে আপনাকে এত মূল্য পরিশোধ করতে হবে। তাতে আপনি সম্মত হলে তারা আপনার পণ্যের সারাই করণ করবে। এই দামে কোনো দর কষাকষি আবার চলে না। কারণ কোম্পানীর নির্ধারণ করা দামে তারা সেবা দিচ্ছে। এতো গোলির মোড়ের দোকান না যেখানে ভাঙ্গা লোহা লক্কর, পুরানো টিভি, কম্পিউটার বা মোটর সারাই হয়।

আর সোনা (গোল্ড) কেনার বাজারে? আপনি যখন কিনবেন তখন ওই পণ্যে কোনো খাদ পাবেন না। কিন্ত যখন বিক্রয় করবেন তা তো ১৫-২০% হ্রাসে বিক্রয় করতেই হবে তার ওপর থাকবে খাদ নিয়ে রকম ফের অভিজ্ঞতা।

তাই বাংলাদেশের বাজারে ব্রান্ডিং বরং বিক্রেতার সুবিধা। যেখানে ‘একদর’ বা ‘ফিক্সড প্রাইজ’ সাইনবোর্ড দেখে আপনি বুঝবেন আপনি দামী দোকানে ঢুকে গেছেন। আর ডিজিটাল মেশিনে পণ্যের হিসাব দেখে ভাববেন আপনার কাছ থেকে ভ্যাট বাবদ কোনো কারচুপি হচ্ছে না। একদম জিতে যাচ্ছেন আপনি পণ্যটি কিনে। এই সুখে হাসি মুখে বাজার করে বাড়ি ফিরছেন। আর ব্রান্ডিংয়ের দোহাই দিয়ে অদৃশ্য ‘তারাঁ’ বাজারে পণ্যের দামই বাড়াচ্ছেন কিন্ত মান নিয়ে নেই কোনো দর কষাকষি। বেশ ভালো রসায়নই তো বটে!

আর বিপণন বাজারে কর্মকর্তা কর্মচারীদের আয়, কমিশন, মানুষ কেমন চোখে দেখে, সব নিয়ে তাদের জীবন যাপন খুব ইতিবাচক নয় এখনো বাংলাদেশে। বিপণন কর্মীর ভালো বিয়েটাও হতে চায় না। কত দেখেছি মেয়ের বাড়ির লোক ছেলের অফিসে দেখতে এসেছে সে কেমন চাকরী করে। তাড়াতাড়ি করে বসের চেয়ারে বস বসিয়ে ভাবটা দেখালেন বড় কর্মকর্তার সাথে বিয়ে হচ্ছে আপনার মেয়ের। ছোট্ট একটা গল্প বলে বিপণন আর ব্রান্ডিংয়ের রসায়নের গল্পটি শেষ করি-

তখন আমি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে কাজ করি। বড় বড় কোম্পানীর এমডি, চেয়ারম্যানগণ আমাদের গ্রাহক। একবার কাস্টমারদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা দিতে আমার তিন বস (তারা অবশ্যই পুরুষ) আর আমি একমাত্র নারী কর্মী গেলাম। তো সারাদিন শুভেচ্ছা উপহার বিতরণে দুপুরে ক্লান্ত হয়ে আমরা হাজীর বিরিয়ানী খেতে বসলাম। খাওয়া শেষে বিল দেবার সময় তিনজনই পকেট হাতড়ে ক্রেডিট কার্ড বের করে বেয়ারাকে বললেন, এখানে কার্ডে বিল হয় তো? বেয়ারা অবাক চোখে হাসে। একমাত্র নারী হয়েও আমিই দিলাম সেদিনের বিল। অন্তত মান-সম্মান নিয়ে বিদায় তো নিতে হবে। অফিসের দামী গাড়ি করে ব্রান্ডিংয়ে নেমেছি যে আমরা! কি করে বোকা সেজে বসে থেকে শূধূ ভাবতে থাকি হাজীর বিরিয়ানীর দোকানে ক্রেডিট কার্ডে বিল নেয়!


  • ২৭৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রুমানা রশিদ রুমি

রুমানা রশীদ রুমী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ হতে স্নাতক আর স্নাতকোত্তর ড্রিগ্রি নেবার পর মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এম বিএ করেন। বর্তমানে আইন বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। ছিটকে পড়ে যোগ দেন ব্যাংকে। লেখালিখি আর কাটখোট্টা ব্যাংকিং এক সাথে তাল মেলাতে না পেরে বর্তমানে আছেন ‘দি বাংলাদেশ মনিটর’ এর ‘ফিচার রাইটার”হিসেবে। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ম্যাগাজিন ‘রংঢং’। নিয়মিত লেখেন ‘দি বাংলাদেশ অবজারভারে”। লিখছেন বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়। কাজ করছেন নারী সম্পদ নিয়ে। ‘শূন্য প্রকাশ’ প্রকাশনী থেকে ২০১৫ সালের ‘একুশে বইমেলায়’ বের হয় তাঁর প্রথম ফিউশন ‘জয়িতা’। পাঠকের উৎসাহে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে বের হচ্ছে “এ শহরের দিদিমনি “।

ফেসবুকে আমরা